শুক্রবার, ৮ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ টা

এ প্রশ্ন তোলার অধিকার শেখ হাসিনার আছে

নূরে আলম সিদ্দিকী

এ প্রশ্ন তোলার অধিকার শেখ হাসিনার আছে

যার অতীতে যে অর্জন তাকে অস্বীকার করা, অবমূল্যায়ন করা বা ছোট করে দেখার প্রবৃত্তি আমার নেই। স্বাধীনতার দীর্ঘ পথপরিক্রমণে এ দেশের প্রবঞ্চিত, শোষিত ও নিষ্পেষিত জনগোষ্ঠীকে রাজনৈতিকভাবে উজ্জীবিত করে তাদের চেতনাকে শানিত করা, বাঙালি চেতনার বোধকে জাগ্রত করে উদ্যত, উদ্গত, উদ্ধত সত্তাকে ভাস্বর ও দীপ্তিমান সূর্যালোকে স্নাত করার মহান ব্রতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিল ছাত্রলীগ। সেই ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি জন্মের ঊষালগ্নেই এ মহান ব্রতে ছাত্রলীগের পথপরিক্রমণের শুরু। এ বিস্তীর্ণ এবং কণ্টকাকীর্ণ দুর্গম পথচলায় ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের নানাবিধ বিপত্তি ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়। কিন্তু তার সঙ্গে সঙ্গে ছাত্রলীগের জীবনের রোজনামচায় অনেক ঐতিহাসিক বিজয়ের গৌরবগাথা লিখিত ও সন্নিবিষ্ট হয়েছে। বাঙালির হৃদয়ের হীরা-মুক্তা, মণিমাণিক্য খচিত সিংহাসনে প্রতিস্থাপিত হয়েছে ছাত্রলীগের আসন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে কালজয়ী বিজয়, ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের অবিস্মরণীয় জয়, শেরেবাংলা, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মওলানা ভাসানীকে ঐক্যের রাখিবন্ধনে বেঁধে মুসলিম লীগের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে বিপুল জনগোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ, সরব ও মুখরিত করার গৌরবও ছাত্রলীগের। বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনার উন্মেষের শুভলগ্নে তাদের সামনে প্রতিভাত হয়ে ছয় দফার কর্মসূচি অন্ধকার অমানিশার বুক চিরে প্রদীপ্ত সূর্যরশ্মির বিকীর্ণ অগ্নিকণায় বাঙালির হৃদয়কে প্রজ্বালিত করে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে লাহোরে গোলটেবিল বৈঠকের প্রাক্কালে এ ঐতিহাসিক ছয় দফা প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। গোলটেবিল বৈঠকে সমবেত নেতারা এমনকি নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি নবাবজাদা নসরুল্লাহ খান, প্রথিতযশা আওয়ামী লীগ নেতা বাকি বেলুচসহ কোনো কেন্দ্রীয় নেতাই ছয় দফাকে মুক্তমনে এবং উন্মুক্ত হৃদয়ে গ্রহণ করেননি।

বঙ্গবন্ধুর নিজস্ব সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের নেতৃত্বও সংশয়-বিমুক্ত হৃদয়ে ছয় দফাকে গ্রহণ করতে পারেনি। বঙ্গবন্ধু তখন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। আর সভাপতি ছিলেন মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ। তখন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের দিগন্ত-বিস্তৃত আকাশ ছিল একঝাঁক উজ্জ্বল নক্ষত্রে ভরা।

আগেই বলেছি, স্বাধীনতা-যুদ্ধের পথপরিক্রমণে যার যেটুকু অবদান আছে, তা অস্বীকার করা অথবা বিন্দুমাত্র খাটো করে দেখার ধৃষ্টতা আমার নেই। এই দীর্ঘ পথচলায় আমারও দৃপ্ত পদচারণ ছিল। আমার প্রাণের মুুজিব ভাই, যাকে আজও আমি হৃদয় নিংড়ানো শ্রদ্ধার স্রোতধারায় সিক্ত করে রাখি। ১৫ আগস্টে দুরাচারের কাপুরুষোচিত নিষ্ঠুর গুলিবর্ষণে যে মহতী প্রাণের জীবনাবসান হয়, তা আজও আমার সমস্ত অনুভূতিকে কুঁকড়ে কাঁদায়। একটি অব্যক্ত যন্ত্রণা যখন আমার হৃদয়কে কুরে কুরে খায়, তীব্র যন্ত্রণায় যখন আমি ছটফট করতে থাকি, তখন একটি প্রশ্নই বারবার আমার মানসপটে ভেসে ওঠে। সেই ভয়াল ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শহীদ হওয়ার আগে হত্যাকারীদের দ্বারা নিজগৃহে অবরুদ্ধ অবস্থায় মৃত্যুর ভয়াল চিত্র তাঁর দৃশ্যপটে ভেসে ওঠার পর তিনি ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে ভেঙে পড়েননি। বরং যাদের হাতে ক্ষমতা ছিল, যাদের নিয়ন্ত্রণে রক্ষীবাহিনী ছিল তারা কেন এগিয়ে এলেন না? অস্ত্র জমা দিলেও বিপুল অস্ত্র স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর হাতেও ছিল। বঙ্গবন্ধু সেনাবাহিনী প্রধান, স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর দায়িত্বে থাকা নেতৃত্ব ও রক্ষীবাহিনীর দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব যার হাতে ছিল, তাদের সঙ্গে টেলিফোনে তিনি নিজেই বারবার যোগাযোগ করেছেন। বিপৎকালীন সাহায্যে এগিয়ে আসার জন্য তিনি তাদের নির্দেশ দিয়েছেন, আবেদন জানিয়েছেন, অনুরোধ করেছেন। কিন্তু যাদের হাতে বঙ্গবন্ধু সংগঠনের দায়িত্ব ও রক্ষীবাহিনী নিয়ন্ত্রণের কর্তৃত্ব তুলে দিয়েছিলেন, সেদিন সংগঠন ও রক্ষীবাহিনীর প্রচন্ড ক্ষমতাধর সেই ব্যক্তিরা বঙ্গবন্ধুর কোনো প্রয়োজনেই আসেননি। ঘাতকের নিষ্ঠুর বুলেটে বঙ্গবন্ধুকে অসহায়ের মতো অকালে শাহাদাতবরণ করতে হয়েছে। এই বেদনাদায়ক স্মৃতি যখন আমার মানসপটে ভেসে ওঠে তখন সমস্ত হৃদয় কুঁকড়ে কেঁদে ওঠে। বুকের পাঁজরগুলো অসহ্য যন্ত্রণায় টনটন করে। আমার বিবেক আমাকেও আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে জানতে চায়, আমার সেদিন কী করণীয় ছিল, কী কর্তব্য ছিল? সেদিন অস্ত্র ছাড়া সৈনিকের মতো আমাকে শক্তিহীন করা হয়েছিল। এক বছরের মাথায় প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের মহারথীরা বঙ্গবন্ধুকে ভুল বুঝিয়ে আমাকে যুবলীগের মহাসচিবের পদ থেকে কূটকৌশলে সরিয়ে দেন। মণি ভাই তো শহীদ হলেন। সরিয়ে দেওয়ায় আমার স্থলাভিষিক্ত ময়মনসিংহের সৈয়দ আহমদের কোনো শিকড় যুবলীগের মধ্যে গ্রথিত ছিল না। তিনি নিজে ছাত্রলীগের কোনো সাবেক নেতাও ছিলেন না। কিন্তু যারা প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের কুশীলব, যাদের রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের নিষ্ঠুর কশাঘাতে আমি জর্জরিত ছিলাম, তাদের কুটিল নীলনকশার ফলেই আমার যুবলীগের মহাসচিবের পদটি হারাতে হয়। পদশূন্য আমার অবস্থা নিরস্ত্র সৈনিকের চেয়েও ছিল অসহায়। প্রতিবাদ গড়ে তোলার আমার তীব্র মানসিকতা প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের কুশীলবদের কাছে পরাভূত হয়। ক্লান্ত-শ্রান্ত অসহায় একজন মানুষের মতো আমার জীবন কাটছিল। একদিকে গণবাহিনী, অন্যদিকে প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের কুশীলবদের আক্রোশের শিকার হওয়ার আতঙ্ক আমাকে তাড়া করে ফিরছিল। আমার হাতে কোনো সংগঠন নেই, কোনো রাজনৈতিক উত্তাল কর্মতৎপরতার সঙ্গেও আমার কোনোরূপ সম্পৃক্ততা রাখা হয়নি। এমনই একটি গুমোট ও অসহায় শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশে আমার জীবন কাটছিল।

প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের কুশীলবরা বঙ্গবন্ধুর জীবিতকালে এই হিমাচলের মতো সুউচ্চ পর্বতমালার মতো ব্যক্তিত্বকে রাহুর মতো গ্রাস করেছিলেন এবং তাঁর সূর্যের মতো প্রখর, প্রোজ্জ্বল ও দীপ্তিমান শিখাটিকে শুধু নিষ্প্রভই করতে চাননি, জনবিচ্ছিন্নতার অমানিশার অন্ধকারে বিলীন করার ষড়যন্ত্রের খেলায় উন্মত্ত হয়ে উঠেছিলেন। কমিউনিস্টদের করাল গ্রাস এবং এ ষড়যন্ত্রের উন্মত্ততা সূর্যের মতো প্রখর ব্যক্তিত্ব বঙ্গবন্ধুকে সম্পূর্ণ নিষ্প্র্রভ করতে না পারলেও অনেকটাই গণবিচ্ছিন্ন করতে সক্ষম হয়েছিল। ১৫ আগস্টের দুরাচারদের উদ্ধত প্রতিহিংসাকে সংগঠন ও বিভিন্ন বাহিনীর দায়িত্বপ্রাপ্ত থাকা সত্ত্বেও তারা তো প্রতিবাদ গড়ে তোলেনইনি, বরং একদলীয় শাসনব্যবস্থার অভিশাপে জর্জরিত জাতিও বজ্রনির্ঘোষে গর্জে ওঠেনি। ১৯৭০-এর নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত করা এবং ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের উপক্রমণিকা সৃষ্টিতে ছাত্রলীগের ভূমিকা ছিল মুখ্য। আমি তখন ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলাম। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ১৯৭০-এর নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও তার অবশ্যম্ভাবী সফলতাকে তুলে আনার দায়িত্বকালে সারা বাংলাদেশে আমরা ছাত্রলীগের কর্মীরা চারণের মতো ঘুরে বেড়িয়েছি। বাংলার পথে-ঘাটে-মাঠে প্রতিটি মানুষের হৃদয়কে আগ্নেয়গিরির গলিত লাভার মতো প্রজ্বালিত করেছি। সারা বাংলাদেশে আওয়াজ উঠেছে- ‘আঘাতের আর কোনো প্রতিবাদ নয়, আঘাত আসলে প্রত্যাঘাত করতে হবে। প্রতিটি বাঙালির উদ্বেলিত চিত্তকে আগ্নেয়গিরি এবং হাতকে প্রজ্বালিত মশাল বানিয়ে পাকিস্তানিদের আক্রমণের বিরুদ্ধে উত্তোলিত রাখতে হবে।’ ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধু মঞ্চে আসার আগে তাঁরই নির্দেশে স্বাধীন বাংলা ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের নেতৃ-চতুষ্টয়ের নিয়ন্ত্রণে রেসকোর্সের মাইক ছিল। সেখান থেকে আমরা লাখ লাখ মানুষের উদ্বেলিত সত্তাকে এমন প্রখরভাবে জাগ্রত করেছিলাম, যেটিকে দক্ষ সেনাপতির মতো স্বাধীনতার মেরুকরণ নির্ধারণে বঙ্গবন্ধু কাজে লাগিয়েছিলেন। স্বাধীনতা অর্জনে পরাধীনতার বক্ষ বিদীর্ণ করার সাহসী সৈনিক হিসেবে আমরা মুজিব ভাইয়ের পথ বিনির্মাণ করেছিলাম আমাদের বুকের পাঁজর দিয়ে। ছাত্রলীগের লাখ লাখ কর্মীর উদ্দীপ্ত চেতনায় বঙ্গবন্ধু সফলতার সঙ্গে তাঁর স্বপ্নের স্বাধীনতার তরণিকে সাফল্যের সৈকতে পৌঁছে দিয়েছেন। এই জীবনসায়াহ্নে এসে ১৫ আগস্টের নির্মমতা এবং সেই নির্মমতার বিরুদ্ধে বাংলার গণদেবতা কেন ’৭১-এর মতো গর্জে উঠল না- সেটি আমাদের প্রজন্মের কাছে একটি কঠিন প্রশ্ন। এ প্রশ্নের যৌক্তিকতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমার আত্মসান্ত¡নার একটি দিক হলো, ’৭১-এ আমার কাছে ছাত্রলীগের দায়িত্ব ছিল। আর সেই ছাত্রলীগই ’৭০-এর নির্বাচনের বিজয়ের পুষ্পমাল্য বঙ্গবন্ধুকে পরিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল। ’৭০-এর নির্বাচন ও ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে ছাত্রলীগই মূলশক্তি হিসেবে পথ বিনির্মাণ করেছিল। উদ্যত-উদ্গত-উদ্ধত চিত্তে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার প্রদীপ্ত সূর্যকে আলিঙ্গন করেছেন এবং তারই বিকীর্ণ অগ্নিকণায় সারা জাতি প্রজ্বালিত হয়েছে।

পাকিস্তানের ঔদ্ধত্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ থেকে প্রতিরোধ, প্রতিরোধ থেকে প্রতিশোধের আক্রোশে ফেটে পড়া সাড়ে ৭ কোটি বাঙালি তথা বাংলা মায়ের দামাল ছেলেরা স্বাধীনতার প্রদীপ্ত সূর্যকে অসীম সাহসিকতায় ছিনিয়ে আনতে পেরেছে। এখানে উল্লেখ করলে অত্যুক্তি হবে না, সেদিন সারা বাংলাদেশের নিভৃত কন্দরেও ছাত্রলীগের কর্মীদের হাতের প্রজ্বালিত মশাল ছিল। যার বিচূর্ণ অগ্নিকণায় স্নাত বাঙালিরা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে শুধু প্রজ্বালিতই হয়নি, পাকিস্তানের বর্বর নৃশংসতাকে সুদৃঢ় প্রত্যয়ে পরাভূত করেছে। শুধু কি তাই? ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানের পাশবিক সামরিক শক্তির আত্মসমর্পণের পর বিমুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশেও আন্দোলন থেমে যায়নি। বাংলার প্রাণপুরুষ শেখ মুজিবের মুক্তির দাবিতে আবার বাংলা গর্জে উঠল। এটি শুধু বাংলাদেশেই নয়। পৃথিবীর যে কোনো স্থানে যেখানে একটি বাঙালিরও অবস্থান ছিল, সেখান থেকেই বজ্রনির্ঘোষে ঘোষিত হলো- বঙ্গবন্ধুর নিঃশর্ত মুক্তি চাই। বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি জল্লাদের কারাগার থেকে বেরিয়ে এলেন। লন্ডন, সেখান থেকে দিল্লি হয়ে বঙ্গবন্ধু ১০ জানুয়ারি বাংলাদেশের এই মায়াভরা মাটিতে দাঁড়িয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে বেদনাপ্লুত কণ্ঠে বলেছিলেন- দেশের স্বাধীনতার জন্য, আমার মুক্তির জন্য তোমরা যে সংগ্রাম করেছ, আমার জীবন দিয়ে হলেও সে ঋণ আমি পরিশোধ করে যাব। ১৫ আগস্ট জীবন বিসর্জনের মধ্য দিয়েই বঙ্গবন্ধু এই ঋণ শোধ করে গেছেন। কিন্তু আফসোস, ’৭০-এর নির্বাচনে যে বাংলা ১৬৭টি আসনের মধ্যে ১৬৫টি তাঁকে উপহার দিল, তাঁর বিজয়কে অস্বীকার করা ইয়াহিয়া খানের বাংলা ১ মার্চের ঘোষণার বিরুদ্ধে শুধু প্রতিবাদই নয়, সফল প্রতিরোধ গড়ে তোলে, যে নিরস্ত্র বাঙালি কালজয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে পরাধীনতার বক্ষ বিদীর্ণ করে স্বাধীনতার সূর্যকে ছিনিয়ে আনল- সেই জাতি ১৫ আগস্টের পর কেন নীরব, নিথর, নিস্তব্ধ হয়ে রইল, ইতিহাস আমাদের কাছে এই প্রশ্ন করবেই। আর সেদিন যারা সংগঠন ও প্রশাসনের দায়িত্বে ছিলেন, যাদের বারবার ফোন করে বঙ্গবন্ধু কোনো উত্তর ও সহযোগিতা পাননি, এর জবাব দেওয়ার কোনো দায়িত্বই কি তাদের নেই?

প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের কুশীলবরা যুবলীগের মহাসচিবের দায়িত্ব থেকে আমাকে কৌশলে সরিয়ে না দিলে হয়তো মণি ভাইয়ের মতো আমাকেও শাহাদাতবরণ করতে হতো। নতুবা হয়তো সারা বাংলাদেশকে আমি দাবানলের মতো জ্বালিয়ে তুলতে পারতাম। অথচ অস্ত্রবিমুক্ত সৈনিকের মতো নিজগৃহে বিলাপ করা ছাড়া আমার আর কীই-বা করার ছিল। এই বিক্ষুব্ধ হৃদয়ের প্রবোধ এটুকুই, ১৫ আগস্টের পর ১৯ মাসের কারারুদ্ধ জীবনের নির্যাতন, নির্বাসন ও নিগ্রহের জ্বালা কিছুটা হলেও বঙ্গবন্ধুর ভালোবাসার ঋণ পরিশোধের সান্ত¡না আমাকে দেয়। আমার কাছে যেহেতু সংগঠনের নেতৃত্ব ছিল না, সে ক্ষেত্রে এই প্রবোধটুকু আমার কাছে কম কিছু নয়। যাদের পক্ষে কিছু করার সুযোগ ছিল, সংগঠন ও প্রশাসন এবং রক্ষীবাহিনীর দায়িত্ব বঙ্গবন্ধু পরম বিশ্বাসে যাদের ওপর ন্যস্ত করেছিলেন, তারা কেন সে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন- এ প্রশ্নের জবাব ইতিহাস তাদের কাছ থেকে চাইবেই। সাংগঠনিক দায়িত্ব-বিচ্যুত থেকে প্রতিরোধ গড়ে তোলার কোনো সুযোগ আমার ছিল না কিন্তু প্রতিশোধহীন ১৫ আগস্ট দীপ্তিহীন আগুনের নির্দয় দহনে আজও আমাকে দগ্ধীভূত করে।

বাকশাল বঙ্গবন্ধুকে অনেকটাই গণবিচ্ছিন্ন করেছে, এটা ঐতিহাসিক সত্য। বাম রাজনীতির কুটিল ষড়যন্ত্রের স্রোতধারা বাকশাল গঠনে বঙ্গবন্ধুকে উদ্বুদ্ধ করলেও ১৫ আগস্টের পৈশাচিক দুর্ঘটনার পর বাম রাজনীতির কীর্তিমান অনেকেই নিষ্ক্রিয় ও নীরব ছিলেন। এমনকি অনেকেই উল্লাস প্রকাশ করেছেন।

মওলানা ভাসানী তো খন্দকার মোশতাককে ওইদিনই অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। আর যারা তাদের ষড়যন্ত্রের কুটিল প্রয়াসে সংগঠন থেকে আত্মত্যাগী কর্মীদের দূরে সরিয়ে দিতে পেরেছিলেন, ইতিহাসের কাছে উত্তর দেওয়ার কোনো দায় কি তাদের নেই? সেদিন বঙ্গবন্ধুর পাশে যারা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন, বঙ্গবন্ধুর ঔরসজাত কন্যা তাদের দিকে আজ সেই প্রশ্ন তুলেছেন। আওয়ামী লীগের রথী-মহারথীরা ১৫ আগস্টের নির্মম হত্যাকান্ডের পর কেন প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারলেন না, কেনই-বা তারা চুপিসারে সটকে পড়লেন- বঙ্গবন্ধুতনয়া শেখ হাসিনা আজকে এ প্রশ্ন তো করতেই পারেন। এটা তাঁর নৈতিক অধিকার।

লেখক : স্বাধীন বাংলা ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের অন্যতম নেতা।

সর্বশেষ খবর