মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, টেলিভিশন, ফ্রিজ, এসি, ব্যাটারি, চার্জার কিংবা সোলার প্যানেল- প্রতিদিন ব্যবহৃত এসব ইলেকট্রনিক পণ্য নষ্ট হওয়ার পর কোথায় যাচ্ছে, সে প্রশ্নের উত্তরই এখন বড় উদ্বেগের কারণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে অনিয়ন্ত্রিতভাবে ছড়িয়ে পড়া এসব ই-বর্জ্য (ইলেকট্রনিক পণ্য থেকে সৃষ্ট বর্জ্য) নীরবে বিষাক্ত করে তুলছে মাটি, পানি ও বাতাস। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এ দূষণের প্রভাব থেকে রক্ষা পাচ্ছে না গর্ভের শিশুও। জন্ম নিচ্ছে বিকলাঙ্গ ও অটিস্টিক শিশু, বাড়ছে গর্ভপাত, কমে যাচ্ছে বুদ্ধিমত্তা (আইকিউ)। শরীরের নানান অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকল হয়ে বাড়ছে অসংক্রামক রোগ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্যানুযায়ী, ই-বর্জ্যে থাকা সিসা, পারদ, ক্যাডমিয়াম, নিকেল, ক্রোমিয়াম এবং ব্রোমিনযুক্ত ফ্লেম রিটার্ডেন্টের মতো বিষাক্ত উপাদান পরিবেশে ছড়িয়ে দীর্ঘদিন সক্রিয় থাকে। এসব ভারী ধাতু বাতাস, ধুলাবালি, পানি ও খাদ্যের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করে। গর্ভবতী নারী এসব দূষকের সংস্পর্শে এলে তা প্লাসেন্টা অতিক্রম করে ভ্রƒণের শরীরেও পৌঁছাতে পারে। এতে শিশুর মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি আইকিউ কমে যাওয়া, শেখার সক্ষমতা হ্রাস এবং আচরণগত সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
সংস্থাটির দেওয়া তথ্যানুযায়ী, অনানুষ্ঠানিক ই-বর্জ্য পুনর্ব্যবহার কেন্দ্রের আশপাশে বসবাসকারী শিশু ও গর্ভবতী নারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। কারণ, বিষাক্ত ধাতু ও রাসায়নিক শুধু বাতাসে নয়, মাটি, পানীয় জল ও খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমেও মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। বাতাস, নদী, খাল ও বৃষ্টির পানির মাধ্যমে এটা ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। এসব ভারী ধাতু ও বিষাক্ত উপাদান দীর্ঘমেয়াদে কিডনি ও লিভারের ক্ষতি, শ্বাসতন্ত্রের রোগ, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা হ্রাস এবং ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়ায়।
বাংলাদেশে ই-বর্জ্য পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক পর্যায়ে যাচ্ছে। মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, টেলিভিশন, ফ্রিজ, এসি ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক পণ্যের ব্যবহার দ্রুত বাড়ার পাশাপাশি কম দামের নিম্নমানের ইলেকট্রনিক পণ্য আমদানিও বাড়ছে। অল্প সময়ের ব্যবধানে এসব পণ্য ই-বর্জ্যে পরিণত হচ্ছে। জরিপের তথ্যানুযায়ী, প্রতি বছর বাংলাদেশে নষ্ট হচ্ছে তিন লক্ষাধিক টেলিভিশন। আগে একটি টেলিভিশন এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্ম পর্যন্ত ভালো থাকলেও বর্তমানে দুই-তিন বছরের মধ্যেই নষ্ট হচ্ছে। এ ছাড়া নষ্ট ও মডেল পরিবর্তনের নামে বছরে বাতিল হচ্ছে কয়েক কোটি মোবাইল ফোন। কিন্তু এসব বর্র্জ্য সংগ্রহ ও পরিবেশসম্মতভাবে পুনর্ব্যবহারের কার্যকর ব্যবস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি। ই-বর্জ্যরে ঝুঁকি কমাতে সরকার ২০২১ সালে ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা করলেও তা কাগজে কলমেই সীমাবদ্ধ রয়েছে, আলোর মুখ দেখেনি বাস্তবায়ন।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট পরিবেশ অধিদপ্তরের জন্য পরিচালিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশে উৎপন্ন ই-বর্জ্যরে বড় অংশই নিরাপদ ব্যবস্থাপনার বাইরে থেকে যাচ্ছে। গবেষকদের মতে, অনিরাপদভাবে ই-বর্জ্য ভাঙা, পোড়ানো কিংবা অ্যাসিড ব্যবহার করে মূল্যবান ধাতু আলাদা করার সময় সিসা, পারদ, ক্যাডমিয়াম ও নিকেলের মতো বিষাক্ত উপাদান পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে। বৃষ্টির পানিতে সেগুলো নদী, খাল ও ভূগর্ভস্থ পানিতে পৌঁছে দীর্ঘমেয়াদি দূষণ সৃষ্টি করে।
২০২১ সালে প্রকাশিত বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ভয়েস ও এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (এসডো) গবেষণা অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ৩০ লাখ মেট্রিক টন ই-বর্জ্য উৎপন্ন হয় এবং এর পরিমাণ প্রতি বছর ২০ থেকে ৩০ শতাংশ হারে বাড়ছে। সেই হিসাবে বর্তমানে বার্ষিক ই-বর্জ্য উৎপাদন ৬০ লাখ মেট্রিক টন ছাড়িয়ে যাওয়ার কথা। অথচ ২০২১ সালে প্রণীত ‘ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য (ই-বর্জ্য) ব্যবস্থাপনা বিধিমালা’ অনুযায়ী উৎপাদক, আমদানিকারক ও ব্র্যান্ড মালিকদের পুরোনো পণ্য সংগ্রহ ও পরিবেশসম্মতভাবে নিষ্পত্তির বাধ্যবাধকতা থাকলেও কেউ তা করছে না।
গত মে মাসে প্রকাশিত ভয়েসের এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে উৎপাদিত ই-বর্জ্যরে ১০ শতাংশেরও কম আনুষ্ঠানিকভাবে পুনর্ব্যবহার করা হয়। জরিপে অংশ নেওয়া ১৫টি প্রতিষ্ঠানের সব পরিবেশ অধিদপ্তরে নিবন্ধিত হলেও গত অর্থবছরে কোনো প্রতিষ্ঠানই একটি মেয়াদোত্তীর্ণ ইলেকট্রনিক পণ্যও সংগ্রহ করেনি। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের টেক-ব্যাক ব্যবস্থা নেই এবং বিপজ্জনক বর্জ্য সংরক্ষণেরও কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।
ভয়েসের নির্বাহী পরিচালক আহমেদ স্বপন মাহমুদ বলেন, আইন প্রণয়ন করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; বাস্তবায়ন না হলে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য রক্ষা করা সম্ভব নয়। ই-বর্জ্যরে বিষাক্ত উপাদান নীরবে মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। পরিবেশকর্মী মো. আমিনুর রসুল বলেন, নিম্নমানের ইলেকট্রনিক পণ্যের অনিয়ন্ত্রিত আমদানি এবং মেয়াদ শেষ হওয়া পণ্য ফেরত নেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় ই-বর্জ্যরে পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে। প্রতিটি ইলেকট্রনিক পণ্যের জীবনচক্র উল্লেখ এবং উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের বাধ্যতামূলক টেক-ব্যাক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ই-বর্জ্য বাংলাদেশের জন্য বড় পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হবে। এ দূষণের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে আজকের শিশু এবং আগামী প্রজন্মকে, যাদের অনেকেই জন্মের আগেই বিষাক্ত ভারী ধাতুর সংস্পর্শে চলে আসছে।