দেশের চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্ত নেই। সাধারণ অভিযোগ, চিকিৎসকরা রোগী ও রোগীর স্বজনদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেন না। কম সময় দেন। প্রশ্নের জবাব দিতে অনীহা প্রকাশ করেন। দ্বিতীয়বার প্রশ্ন করলে বিরক্ত হন। অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষানিরীক্ষার পরামর্শ দেন। ব্যবস্থাপত্র ঠিকমতো বুঝিয়ে দেন না ইত্যাদি। এসব অভিযোগ অমূলক নয়।
দেশে চিকিৎসক-রোগী সম্পর্ক বহু ক্ষেত্রেই কার্যত তলানিতে। আস্থার সংকট। রোগীর স্বজনদের সঙ্গে চিকিৎসকদের বচসা প্রায় নিত্যনৈমত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভুল চিকিৎসা বা চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ এনে কর্তব্যরত চিকিৎসক, নার্স বা হাসপাতাল কর্মীদের ওপর হামলা করা হয়। হাসপাতালের আসবাব ও চিকিৎসা সরঞ্জাম ভাঙচুর করা হয়। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগেই তাৎক্ষণিক বিচার ও শাস্তি কোনো সভ্য সমাজের আচরণ হতে পারে না। এতে ডাক্তাররা কর্মোদ্যোগ হারিয়ে ফেলছেন। কথিত অপরাধের পাল্টা আরেকটি অপরাধ করলে সেটা কোনো যুক্তিতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কিছু লোক আছেন, যারা কোনো কিছুতেই খুশি নন। অনেকে আবার বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে বীরত্ব দেখান। প্রচারের আলোয় আসার চেষ্টা করেন। কিছু লোক ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকেও এটা করে থাকেন।
ডাক্তার নিগ্রহের ঘটনার প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ ডাক্তাররা অনেক সময় কর্মবিরতি পালন করেন। ঘটনার সঙ্গে কোনোভাবেই সম্পৃক্ত নন এমন নিরীহ মানুষজন এতে ভোগান্তিতে পড়েন। ডাক্তারদের দাবি যতই সংগত হোক না কেন, চিকিৎসাসেবা প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত সমর্থনযোগ্য নয়। হামলার ঘটনায় মামলা হয়। কিন্তু শাস্তির দৃষ্টান্ত বিরল। ভুল চিকিৎসা বা চিকিৎসকের অবহেলায় মৃত্যুর অভিযোগে চিকিৎসক বা নার্সদেরই সব ক্ষেত্রে দায়ী করা হয়। এ অভিযোগের ভিত্তি কী? বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিয়ে প্যানেল গঠন করে তদন্তের পর জানা যাবে চিকিৎসায় কোনো ভুল বা গাফিলতি ছিল কি না। এর সঙ্গে অনেক প্রশ্ন জড়িত। ভুল যদি হয়েও থাকে তবে তা কী ইচ্ছাকৃত না অনিচ্ছাকৃত? অজ্ঞতাপ্রসূত না অবহেলাজনিত?
চিকিৎসা একটি মহৎ পেশা। দেশে অনেক স্বনামধন্য চিকিৎসক আছেন যাঁদের চিকিৎসায় হাজার হাজার রোগী সুস্থ হয়ে উঠছেন। কিডনি ও হার্টের চিকিৎসা এখন দেশেই হচ্ছে। অন্যান্য বিভাগেও দেশে মানসম্মত চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। সিংহভাগ চিকিৎসকই নিবেদিতপ্রাণ। অনেকে গরিবের ডাক্তার হিসেবে প্রশংসা কুড়াচ্ছেন। সাধারণভাবে রোগীরা ডাক্তারদের অনেক সম্মান করে। ডাক্তারদের সেবার শপথ নিতে হয়। কিন্তু রোগীর চাপে সেই শপথের কথা হয়তোবা ভুলে যান কেউ কেউ। মনে রাখতে হবে, এটি আঠারো কোটি মানুষের দেশ।
সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা নিয়ে অনেক কথা শোনা যায়। অভিযোগ কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকে অন্যত্র প্রাইভেট প্র্যাকটিসে ব্যস্ত থাকছে ডাক্তারদের একাংশ। সরকারি হাসপাতাল লোকে লোকারণ্য। নেই বসার তেমন ব্যবস্থা। আছে দালাল চক্র। ওষুধ কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিদের ভিড়ে চিকিৎসাসেবা বিঘ্নিত হওয়ার উপক্রম। হাসপাতালের যন্ত্রপাতির অধিকাংশ অকেজো। এই পরিবেশে রোগীদের উপযুক্ত চিকিৎসাসেবা দেওয়া সম্ভব নয়। ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে ডায়াগনস্টিক সেন্টার। ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধে সয়লাব বাজার। এ অবস্থায় রোগীর মৃত্যুর জন্য দায়ী কে? দায়দায়িত্ব নিরূপণ করতে পারে একমাত্র বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের প্যানেল। একটা কথা মাথায় রাখতে হবে, সব রোগ নিরাময়যোগ্য নয়। আয়ু ফুরালে মৃত্যুর হাত থেকে বিশ্বের কোনো ডাক্তারই রোগীকে বাঁচাতে পারবেন না। বিষয়টি রোগী ও রোগীর স্বজনদের উপলব্ধি করতে হবে। পক্ষান্তরে যেকোনো মৃত্যুই দুঃখজনক। বিশেষত যে মৃত্যু আকস্মিক অর্থাৎ বিনা নোটিসে এসে হানা দেয়। স্বজন হারানোর বেদনা যে কত গভীর, তা ভুক্তভোগীমাত্রই জানেন। এ অবস্থায় রোগীর স্বজনদের মানসিক অবস্থা উপলব্ধি করে আচরণ করা অতীব গুরুত্বপূর্ণ।
হাজার হোক চিকিৎসকরাও মানুষ। চিকিৎসকদেরও ভুল হতে পারে। সব দেশেই চিকিৎসকদের কমবেশি ভুল হয়। আমাদের দেশে ডাক্তারদের সম্পর্কে নেতিবাচক প্রচারণাই বেশি হয়। ডাক্তার ও ডাকাত সমার্থক-এমন মন্তব্যও শোনা যায়। কসাইয়ের সঙ্গে ডাক্তারের তুলনা করা হয়। যে যা=ই বলুন না কেন, দেশে রোগী-অন্তঃপ্রাণ চিকিৎসক এবং নিষ্ঠাবান চিকিৎসাকর্মীর সংখ্যাও কম নয়। আবার সব ডাক্তারই ধোয়া তুলসীপাতা নন। সবার নৈতিক মান এক রকম নয়। কিছুসংখ্যক ডাক্তারের কারণে এই মহান পেশার সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে। এমন কিছু পেশা আছে, যে পেশার মানুষের কাছে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা একটু বেশিই। বাতাসে কান পাতলে অনেক কথা শোনা যায়। ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সঙ্গে যোগসাজশে কমিশন বাণিজ্য বা ওষুধ কোম্পানির কাছ থেকে দামি উপহার গ্রহণের যে কালচার গড়ে উঠেছে, তা বন্ধ হওয়া দরকার। এতে ডাক্তারদের মানমর্যাদা বাড়ে না। কিছু চিকিৎসকের কারণে পুরো চিকিৎসক সমাজের মুখে কালিমা লেপন হচ্ছে। সমাজে চিকিৎসকদের মর্যাদার স্থান অনেক উঁচুতে। এই স্থান নিজেদেরই ধরে রাখতে হবে।
দেশের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের অনেকেই মধ্যরাত পর্যন্ত নিজ চেম্বারে রোগী দেখেন। এটাকে অনেকে অন্য চোখে দেখেন। কিন্তু সেবার বিনিময়ে সৎ উপার্জনে দোষের কী আছে? ব্যক্তিগত আরাম-আয়েশ বিসর্জন দিয়ে দিনরাত এক করে চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। সূর্যাস্ত দেখার সুযোগ হয় না। স্ত্রী-সন্তানদের সময় দিতে পারেন না। সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করা হয়ে ওঠে না। চিকিৎসকদের এই ত্যাগ খাটো করে দেখা যাবে না। আমরা বিশ্বাস করি, শুধু অর্থোপার্জনই লক্ষ্য নয়; সমাজের কাছে দায়বদ্ধতা থেকে তাঁরা এটা করেন। আঠারো কোটি মানুষের দেশে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যা কত?
ডাক্তারদের গায়ে হাত তুলে বা হাসপাতাল ভাঙচুর করে কি কোনো সমাধান হয়? চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকতে পারে। অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য দেশে আইন আছে, আদালত আছে। সবার আগে অভিযোগের তদন্ত হবে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক প্যানেলের মতামত নিতে হবে। মারধর-ভাঙচুর হবে কেন? তাৎক্ষণিক বিচার কেন? আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কোনো সভ্য সমাজের আচরণ নয়। মানবিকতা, সহনশীলতা ও পারস্পরিক সম্মানই হোক চিকিৎসক-রোগীর সম্পর্ক।
♦ লেখক : প্রাবন্ধিক