মানব ইতিহাসে কিছু উন্মাদনা আছে, যেগুলোকে কেবল খেলা বলে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। সেগুলো মানুষের সমষ্টিগত মনস্তত্ত্ব, ভয়, অহং, স্বপ্ন, প্রতিশোধ, প্রেম আর পরাজয়ের গোপন ব্যাকরণ হয়ে ওঠে। বিশ্বকাপ ফুটবল তেমনই এক মহাযজ্ঞ; চার বছর পরপর পৃথিবী যেন নিজের ভিতরে জমে থাকা কোনো আদিম চিৎকারকে নতুন করে জাগিয়ে তোলে। পতাকা ওঠে, মুখে রং লাগে, রাত জাগে শহর, সম্পর্কের মধ্যে ছোটখাটো শীতল যুদ্ধ শুরু হয়-আর মানুষ ভুলে যায় সে কোন পেশার, কোন শ্রেণির, কোন মতের। গোলপোস্টের দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকে কেবল আবেগ।
ফুটবলের জন্ম ব্রিটেনের শিল্পবিপ্লব-পরবর্তী শ্রমঘন সমাজে। কলকারখানার ধোঁয়া, ক্লান্ত শরীর, একঘেয়ে রসহীন যান্ত্রিক জীবনের মধ্যে শ্রমিকরা খুঁজেছিল শরীরের এক বিস্ফোরণ, সম্মিলিত উত্তেজনার এক নিরীহ যুদ্ধ। সেই খেলা ধীরে ধীরে বন্দরের জাহাজ, উপনিবেশ, নাবিক আর ব্যবসায়ীদের হাত ধরে পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার, ফুটবল কেবল ছড়ায়নি; এটি মানুষের সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে। কেউ এটিকে ধর্ম বানিয়েছে, কেউ প্রতিবাদের ভাষা, কেউ জাতীয় অহংকারের আয়না। এটাকে কেন্দ্র করে জন্ম নিয়েছে অনেক কিছু। বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার পর ফুটবল আর কেবল মাঠের মধ্যে থাকেনি। এটি রাষ্ট্রের, জাতির, এমনকি রাজনৈতিক মানচিত্রেরও ভাষা হয়ে ওঠে। একেকটি ম্যাচ যেন ছোট আকারের কূটনীতি, একেকটি গোল কখনো ইতিহাসের জমে থাকা অভিমান। মানুষ টেলিভিশনের সামনে বসে থাকে, অথচ তার ভিতরে জেগে ওঠে অ™ভুুত ব্যক্তিগত আবেগ যেন মাঠে দৌড়ানো খেলোয়াড়টি তার নিজের প্রতিনিধি।
একসময় পৃথিবীর শিশুদের কাছে ফুটবলের রাজা ছিলেন কালোমানিক পেলে। দরিদ্র কৃষ্ণাঙ্গ এক কিশোর, যাঁর পায়ের জাদু ব্রাজিলকে দিয়েছিল এক নতুন পৌরাণিক মর্যাদা। পেলে কেবল ফুটবলার ছিলেন না; তিনি ছিলেন উপনিবেশ-উত্তর পৃথিবীর আত্মবিশ্বাসের এক রূপক। দরিদ্র দেশও বিশ্বকে মুগ্ধ করতে পারে, এ কথা বহু জাতি যেন প্রথম বিশ্বাস করতে শিখেছিল তাঁর মধ্য দিয়ে। তারপর এলেন দিয়েগো ম্যারাডোনা একজন ফুটবলার নন, প্রায় বিদ্রোহী কবি। তাঁর পায়ের মধ্যে ছিল রাস্তাঘাটের ধুলো, গরিব মানুষের রাগ, অসম পৃথিবীর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এক দুষ্টু হাসি। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তাঁর ‘হ্যান্ড অব গড’ আজও নৈতিক বিতর্কের বিষয়; অথচ লাখো মানুষ সেটিকে নিছক প্রতারণা নয়, ইতিহাসের এক গোপন প্রতিশোধ হিসেবেও পড়তে চেয়েছে।
আজকের পৃথিবী আবার অন্যরকম। পেলের জাদু কিংবা দিয়েগোর বিদ্রোহী কবিতার পর ফুটবল এসে দাঁড়িয়েছে আরও বিস্তৃত, আরও দৃশ্যমান এক মহাবিশ্বে। মেসির নীরব জাদু, রোনালদোর প্রায় যান্ত্রিক শৃঙ্খলা, নেইমারের শিল্পময় দৌড়, সুয়ারেজের বিতর্কমিশ্রিত উন্মাদনা কিংবা মডরিচের নীরব অথচ অনমনীয় নেতৃত্ব সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ এখন বহু চরিত্রের এক মহাকাব্য। কেউ গোল করে কিংবদন্তি হন, কেউ পরাজয়ের মধ্যেও হয়ে ওঠেন স্মরণীয়। কখনো একটি ট্রফি না জিতেও একজন খেলোয়াড় কোটি মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী ঠিকানা বানিয়ে নেন। ফলে প্রশ্ন উঠেছে উন্মাদনা কি সত্যিই কমেছে? নাকি বদলে গেছে কেবল তার ভাষা, তার মঞ্চ, তার শরীর?
অনেকেই বলেন, আগের মতো আর বিশ্বকাপের জ্বর নেই। সাদা-কালো টেলিভিশনের যুগে বিশ্বকাপ ছিল অপেক্ষার উৎসব। এক বাড়িতে টিভি, পাড়ার দশ বাড়ির মানুষ সেখানে গাদাগাদি করে বসে খেলা দেখছে এই দৃশ্য ছিল সামাজিকতারও এক মহড়া। গোল হলে অচেনা মানুষ জড়িয়ে ধরত অচেনাকে। এখন প্রযুক্তি আছে, বড় স্ক্রিন আছে, শত চ্যানেল আছে; কিন্তু অনেক সময় সম্মিলিত বিস্ময় যেন খানিক ভেঙে গিয়ে ব্যক্তিগত পর্দায় আটকে পড়ে। তবু এটাও সত্য, উন্মাদনা মরে যায়নি; তার সামাজিক শরীর বদলেছে মাত্র। আগে চায়ের দোকানে তর্ক হতো, এখন তা হয় টাইমলাইনে।
বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান কিংবা নেপালের মতো দেশগুলোতে বিশ্বকাপের উন্মাদনা আরও অদ্ভুত। যেসব দেশের দল বিশ্বকাপে নেই, সেসব দেশের মানুষই কখনো কখনো সবচেয়ে বেশি কাঁদে, সবচেয়ে বেশি ঝগড়া করে। ছাদের ওপর পতাকা ওঠে, বন্ধুত্বে ফাটল ধরে, কেউ ব্রাজিল, কেউ আর্জেন্টিনা হয়ে ওঠে। কেন? হয়তো নিজের না-পারা স্বপ্নকে মানুষ অন্যের সাফল্যে আশ্রয় দেয়। বিশ্বকাপ তখন নিছক দর্শন নয়, একধরনের কল্পিত নাগরিকত্ব। কিন্তু ফুটবলের এই রঙিন উন্মাদনার পেছনে আরেকটি মুখও আছে বাজারের মুখ। ফুটবল এখন আর নিছক খেলা নয়; এটি বহুজাতিক অর্থনীতির এক সুবিশাল মঞ্চ। খেলোয়াড়রা ব্র্যান্ড, জার্সি বিজ্ঞাপন, সম্প্রচারস্বত্ব, স্পনসরশিপ, ডিজিটাল অ্যালগরিদম সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ এখন বিলিয়ন ডলারের এক সাম্রাজ্য। একসময় গলির ছেলেরা বল মারত স্বপ্ন দেখে; এখন সেই স্বপ্নের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে এজেন্ট, বাজার, প্রচারণা আর পুঁজির বিশাল হিসাবখাতা। দর্শকের আবেগও এখানে একধরনের পণ্য; যাকে নিঃশব্দে কিনে নেয় করপোরেট পৃথিবী। তার সঙ্গে এসেছে বেটিংয়ের অন্ধকার করিডর। খেলা যেখানে উত্তেজনা, সেখানে ভবিষ্যৎ অনুমানের লোভও জন্ম নেয়। প্রযুক্তির যুগে এই প্রবণতা আরও দ্রুত ছড়িয়েছে। অনেকে খেলার আনন্দে নয়, টাকার অঙ্কে গোল গোনে। ফলে কখনো কখনো বিশ্বকাপের বিশুদ্ধ আবেগের পাশে দাঁড়িয়ে পড়ে অর্থের ঠান্ডা হিসাব। খেলার সৌন্দর্য আর বাজারের কৌশল-দুইয়ের এক অদ্ভুত সহাবস্থান। বিশ্বকাপের গোলপোস্ট অনেক সময় রাষ্ট্রের মানচিত্রেরও প্রান্তরেখা হয়ে ওঠে। যখন ইরান ও আমেরিকা মুখোমুখি হয়, সেটি কেবল ফুটবল থাকে না। মাঠের এগারোজনের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে নিষেধাজ্ঞা, যুদ্ধস্মৃতি, আদর্শগত সংঘাত, মিডিয়ার নির্মিত শত্রুতা। খেলোয়াড়রা বল ছোঁন, কিন্তু দর্শকের মস্তিষ্কে চলে আরেক খেলা-কে কাকে প্রতীকীভাবে হারাল? কে কার আধিপত্যে সামান্য চিড় ফেলল?
তবু বিস্ময় জাগে পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল দুই রাষ্ট্র চীন ও ভারতকে দেখে। অর্থ আছে, মানুষ আছে, বাজার আছে, দর্শকও অগণিত; কিন্তু বিশ্বকাপের কেন্দ্রীয় নাটকে তারা এখনো প্রায় নিষ্পাপ দর্শক। কেন? এর উত্তর শুধু খেলায় নয়, সংস্কৃতিতেও। কোথাও ক্রিকেট ইতিহাসের জায়গা দখল করেছে, কোথাও রাষ্ট্রীয় কৌশল অন্য খেলাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। কোথাও অবকাঠামো, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও প্রতিযোগিতামূলক সংস্কৃতি যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে ওঠেনি। ফলে তারা বিশ্বকাপকে ভালোবাসে, বাজার তৈরি করে, উত্তেজনা ছড়ায় কিন্তু কেন্দ্রীয় নাটকের প্রধান চরিত্র হয়ে উঠতে পারে না।
শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ ফুটবল কেবল একটি খেলা নয়; এটি মানুষের সভ্যতার আয়নায় নিজের মুখ দেখার এক অদ্ভুত আয়োজন। এখানে একদিকে থাকে নিষ্পাপ শৈশব পাড়ার ছাদে উড়তে থাকা পতাকা, রাতজাগা চোখ, হেরে গিয়ে অকারণ বিষণ্নতা; অন্যদিকে থাকে করপোরেট অর্থ, রাষ্ট্রের কূটনীতি, মিডিয়ার অদৃশ্য মগজধোলাই, বেটিংয়ের নিঃশব্দ অন্ধকার। বলটি মাঠে গড়ায়, অথচ কাঁপতে থাকে মানুষের ভিতরের বহু পুরোনো ইতিহাস। তবু আশ্চর্য, এত হিসাব, এত বাণিজ্য, এত প্রভাবের খেলাও বিশ্বকাপকে পুরোপুরি দখল করতে পারে না। কারণ মানুষের আবেগ এখনো বাজারের চেয়ে পুরোনো। কোনো এক শিশু আজও প্রথমবারের মতো এক ফুটবল-জাদুকরকে দেখে মুগ্ধ হয়; কোনো বৃদ্ধ আজও পেলের দিন কিংবা দিয়েগোর বাঁ-পায়ের স্মৃতি আঁকড়ে বসে থাকেন। পৃথিবী যতই ডিজিটাল হোক, অ্যালগরিদম যতই মানুষের পছন্দ বানিয়ে দিতে শিখুক চার বছর পরপর বিশ্বকাপ এসে মনে করিয়ে দেয়, মানুষ শেষ পর্যন্ত যুক্তির প্রাণী নয়, গল্পের প্রাণী।
সম্ভবত এ কারণেই বিশ্বকাপের উন্মাদনার ঘাটতি নেই; আছে কেবল রূপান্তর। আগেকার উঠোন বদলে গেছে পর্দায়, চায়ের দোকান বদলে গেছে টাইমলাইনে, কিন্তু মানুষের বুকের ভিতর সেই পুরোনো ঢাক এখনো বাজে। শেষ বাঁশি বাজার পরও তাই বিশ্বকাপ শেষ হয় না-থেকে যায় মানুষের স্মৃতিতে, তর্কে, ব্যক্তিগত পক্ষপাতের নিঃশব্দ গুহায়; পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অসমাপ্ত গল্পের মতো, যার পরের অধ্যায়ের জন্য মানুষ আবারও অপেক্ষা করে চারটি দীর্ঘ বছর। বিশ্বকাপের ইতিহাস আসলে কেবল ট্রফির ইতিহাস নয়; এটি বিচিত্র মানবিক নাটকেরও এক চলমান আর্কাইভ। কোথাও এক রেফারির বিতর্কিত বাঁশি একটি দেশের বহু বছরের ক্ষোভ হয়ে থাকে, কোথাও একটি ভুল অফসাইড সিদ্ধান্ত প্রজন্মের তর্কের জ্বালানি। কেউ মনে রাখে মাথা দিয়ে দেওয়া এক অদ্ভুত গোল, কেউ কামড়ে ধরা এক খেলোয়াড়ের হঠকারিতা, কেউ আবার ভুলতে পারে না এক কিংবদন্তি কোচের সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে অস্থির হাঁটা। কখনো এক গোলকিপারের অপ্রত্যাশিত ভুল গোটা জাতিকে স্তব্ধ করেছে, কখনো কোনো অখ্যাত বদলি খেলোয়াড় ইতিহাসের শেষ মুহূর্তে হয়ে উঠেছে জাতির নায়ক। বিশ্বকাপের এই সৌন্দর্যই আলাদা এখানে কেবল সেরা দল নয়, ক্ষণিকের ভুল, হঠাৎ দীপ্তি, রেফারির চোখ এড়িয়ে যাওয়া মুহূর্ত কিংবা বেঞ্চে বসে থাকা এক কোচের নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাসও ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়। শুধু তা-ই নয় আছে আরও অনেক কিছু। এই অনেক কিছুর সঙ্গে এবারও যোগ হবে আরও অনেক কিছু! বিজয়ী দলকে নিয়ে মেতে উঠবে গোটা বিশে^র তাবৎ ফুটবল প্রেমিক, আবার অল্পের জন্য হেরে বিদায় নেওয়ার আক্ষেপেও তাড়িত হবে অনেকেই। মনে কিন্তু রাখতেই হবে ‘বিশ্বকাপ কখনো কেবল বিজয়ীদের নয়; অনেক সময় মানুষ পরাজিতদেরও বেশি মনে রাখে।’
♦ লেখক : চেয়ারম্যান, ঢাকা সাংস্কৃতিক পর্ষদ