দাম্পত্য সম্পর্ক মানব জীবনের অত্যন্ত সুদৃঢ় ও পবিত্র বন্ধন। এই বন্ধনের মাধ্যমে গড়ে ওঠে একটি সুন্দর, সুখময় পরিবার ও সমাজ। এই বন্ধনকে মানবসভ্যতার সূতিকাগারও বলা হয়। পৃথিবীর সূচনালগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত মানবসভ্যতা যে ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, তার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো পারিবারিক ব্যবস্থা।
পরিবার ও দাম্পত্য সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে পারস্পরিক অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা, শ্রদ্ধা, ধৈর্য এবং একে অপরকে আগলে রাখার বিকল্প নেই। মহান আল্লাহ স্বামী-স্ত্রীকে একে অপরের পোশাক হিসেবে অভিহিত করেছেন। আল্লাহ বলেছেন, ‘তারা তোমাদের পোশাক এবং তোমরা তাদের পোশাক।’ (সুরা বাকারা-১৮৭)
পোশাক যেমন মানুষের শরীরকে রোদ-ঝড়-বৃষ্টি, গরম-ঠান্ডায় আগলে রাখে, তেমনই স্বামী-স্ত্রীও জীবনের সব পরিস্থিতিতে একে অপরের আশ্রয় ও নিরাপত্তা হয়ে থাকবে। জীবনে যত কঠিন পরিস্থিতিই আসুক, একে অপরের পরিপূরক হয়ে জীবনকে এগিয়ে নেবে।
নবী করিম (সা.)-এর দাম্পত্য জীবন হলো আমাদের জন্য আদর্শ। তিনি তাঁর স্ত্রীদের কাছে ছিলেন সবচেয়ে প্রিয়। এক হাদিসে নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম। আর আমি আমার পরিবারের কাছে তোমাদের মধ্যে বেশি উত্তম।’ (তিরমিজি, ৩৮৯৫)
দাম্পত্যজীবনে মান-অভিমান, ভুলবোঝাবুঝি, মতপার্থক্য হওয়া স্বাভাবিক। শুধু আমরা কেন স্বয়ং নবীজি (সা.)-এর জীবনেও মনোমালিন্য হয়েছে। এমনকি স্ত্রীদের ওপর অভিমান করে তিনি ভিন্ন স্থানে রাত পর্যন্তও কাটিয়েছেন। কিন্তু কখনো তিনি এই মনোমালিন্য দীর্ঘদিন পুষে রাখেননি, পরক্ষণেই সবকিছু ভুলে ভালোবাসার সম্পর্ক গড়েছেন।
দুঃখের বিষয় হলো, কিছু হতে না-হতেই আজ আমরা বিচ্ছেদের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি। যার মাশুল আমাদের সারা জীবন দিতে হয়। শুধু আমরা নই, এর সঙ্গে সন্তানসন্ততি, পরিবারপরিজন সবাইকে এক অস্থিরময় জীবন কাটাতে হয়। বর্তমান সময়ে এই ধরনের ঘটনা ব্যাপক হারে হচ্ছে। অসংখ্য পরিবার এর যাতনা ভোগ করছে। ২০২৩ সালে একটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, কেবল রাজধানী ঢাকাতেই প্রতিদিন গড়ে ৩৭টি দাম্পত্য সম্পর্কের বিচ্ছেদ ঘটে। মিনিটের হিসাবে যা প্রায় প্রতি ৪০ মিনিটে একটি করে তালাকের ঘটনা ঘটে। অথচ আজ থেকে বিশ বছর আগে একটি তালাকের ঘটনা ঘটলে পুরো এলাকা নড়ে উঠত। আর এখন এমন একটা দিন যায় না, যেদিন দেশের কোথাও না কোথাও পরিবার ভাঙনের ঘটনা ঘটে না। এর অন্যতম কারণ হলো সোশ্যাল মিডিয়ার অপব্যবহার, পশ্চিমা সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ এবং শয়তানের প্ররোচনার অনুসরণ।
স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানো শয়তানের বড় সাফল্য। জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুল (সা.) বলেছেন, ইবলিশ পানির ওপর তার আসন স্থাপন করে। এরপর সে তার বাহিনীকে (মানুষকে বিপথগামী করতে) প্রেরণ করে। তাদের মধ্যে যে সবচেয়ে বড় ফেতনা সৃষ্টি করতে পারে, সে-ই ইবলিশের কাছে সবচেয়ে মর্যাদাপ্রাপ্ত। একজন এসে বলে, আমি অমুক কাজ করেছি। ইবলিশ বলে, তুমি তেমন কিছুই করোনি। তারপর আরেকজন এসে বলে, আমি একজন ব্যক্তিকে ছাড়িনি, যতক্ষণ না তার ও তার স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটিয়েছি। তখন ইবলিশ তাকে নিজের কাছে টেনে নেয় এবং বলে-হ্যাঁ, তুমি একটি বড় কাজ করেছ। (মুসলিম-২৮১৩)
দাম্পত্য কলহে শয়তানের ফাঁদ থেকে বেঁচে থাকা জরুরি। যত মনোমালিন্যই হোক, সহজে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলা উচিত নয়। হতে পারে এমন যে আপনি যে বিষয়টি অপছন্দ করছেন, কিন্তু আল্লাহ তাতে মঙ্গল রেখেছেন। আল্লাহ কোরআনেও এ কথা বলেছেন, ‘যদি তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) অপছন্দ করো, তবে হয়তো তোমরা এমন কিছু অপছন্দ করছো যাতে আল্লাহ অশেষ কল্যাণ নিহিত রেখেছেন।’ (সুরা নিসা-১৯)
যদি একান্ত বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিতেই হয় তাহলে শুধু একবার নয়, বারবার ভাবুন, চিন্তা করুন, এরপর সিদ্ধান্ত নিন। তবু এমনভাবে সিদ্ধান্ত নিন, যাতে ফেরার পথ চিরতরে রুদ্ধ না হয়। আমাদের মনে রাখতে হবে, বিচ্ছেদের বিধান ইসলাম বৈধ রেখেছে বটে, কিন্তু এটি কেবল চরম অনিবার্য পরিস্থিতিতে একটি গ্রহণযোগ্য শেষ অবলম্বন হিসেবে। সম্পর্ক রক্ষার সব পথ বন্ধ হয়ে গেলে, একসঙ্গে বসবাস সত্যিই অসম্ভব হয়ে পড়লে ইসলাম তখন একটি সুন্দর ইতি টানার সুযোগ রেখেছে কেবল। সুতরাং সামান্য রাগ, অভিমান কিংবা ভুলবোঝাবুঝির জের ধরে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া কারও জন্য কল্যাণকর নয়।
দাম্পত্য সম্পর্ককে আগলে রাখা মানে একটি প্রজন্মকে আগলে রাখা। যে ঘরে মায়া, মমতা ও ত্যাগের চর্চা হয়, সেই ঘর থেকে সুস্থ প্রজন্মের জন্ম হয়। আসুন, আমরা পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, ভালোবাসা আর বিশ্বাস দিয়ে আমাদের দাম্পত্য সম্পর্ককে আজীবন আগলে রাখি। কারণ সংশোধনেই সমাধান, বিচ্ছেদে নয়।
♦ জুমার মিম্বর থেকে
গ্রন্থনা : নুরুল ইসলাম তানঈম