প্রযুক্তিগত উন্নয়নের কারণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন শিক্ষার্থীদের হাতের মুঠোয়। কোনো তথ্য জানতে, সহজ কিংবা জটিল প্রশ্নের উত্তর বের করার মতো বিভিন্ন কাজে ‘চ্যাটজিপিটি, জেমিনি, ডিপসিক, গ্রকের মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে শিক্ষার্থীরা। সহজে উত্তর পেয়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থীরা প্রবন্ধ না পড়েই শুধু সারসংক্ষেপ কিংবা গাণিতিক সমস্যা সমাধানের পদ্ধতি না বুঝে উত্তর মুখস্থ করছে। এতে দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার্থীরা শেখার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার কারণে তাদের চিন্তাশক্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের একদল গবেষকের ‘এআই অ্যাসিস্ট্যান্স রিডিউসেস পারসিস্টেন্স অ্যান্ড হার্টস ইন্ডিপেনডেন্ট পারফরম্যান্স’ শীর্ষক গবেষণায় এমন তথ্যই উঠে এসেছে। গবেষকদের মতে, মাত্র ১০ মিনিট এআই ব্যবহারে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে প্রযুক্তিনির্ভরতা তৈরি হয়। আর এআই সহায়তা বন্ধ করে দিলে তাদের সঠিক উত্তর দেওয়ার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। একই সঙ্গে অনেকেই সমস্যার সমাধানের চেষ্টা ছেড়ে দেন। গবেষণার সহ-লেখক এবং ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেসের সহকারী অধ্যাপক রচিত দুবের মতে, শিক্ষা খাতে দ্রুত এআইনির্ভরতা তৈরি হলে নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা নিজেদের সক্ষমতা সম্পর্কে সচেতনই হবে না। এতে মানবিক উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এআই ব্যবহারে দেশের শিক্ষার্থীরা কতটা নির্ভরশীল জানতে কয়েকজন বিশ^বিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অ্যাসাইনমেন্ট, কুইজ, কোনো গাণিতিক সমস্যা, কোনো বইয়ের শুধু সারসংক্ষেপ জানতে, ইতিহাসের কোনো ঘটনা সহজে জানতে ও বুঝতে, সহজে যেকোনো জটিল প্রশ্নের উত্তর জানতে এআই ব্যবহার করছেন তারা। বই পড়ার কথা জানতে চাইলে শিক্ষার্থীরা বলেন, বই থেকে কোনো তথ্য সহজে পাওয়া যায় না। অনেক সময় ব্যয় করতে হয়। তাই বইয়ের বদলে বিভিন্ন এআই ব্যবহার করেন। পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা রিসার্চের কাজেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করছেন। এ ছাড়া অল্প কয়েকজন শিক্ষার্থী বলেন, শুধু উত্তর বের করার জন্য তারা এআই ব্যবহার করেন না। কোনো জটিল সমস্যার সমাধান বের করতে কিংবা সমাধান বের করার প্রক্রিয়া জানতে তারা বিস্তারিত পড়ে থাকেন। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ড. বিজয় লাল বসু বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, শিক্ষার্থীদের মাঝে বই কিংবা দীর্ঘ প্রবন্ধ পড়তে অনীহা রয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় নির্ভরতা বাড়ার কারণে শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে তেমন মনোযোগ দেয় না। যেখানে তাদের সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা করা দরকার সেটা তারা করতে পারছে না। অ্যাসাইনমেন্ট কিংবা রিসার্চের কাজগুলো নিজেরা চিন্তাভাবনা না করে এআই দিয়ে লিখিয়ে নিচ্ছে। তিনি বলেন, সব শিক্ষার্থীই যে এআইয়ের ওপর অতিনির্ভরশীল এমন নয়, অনেক শিক্ষার্থী আছে যারা এআই-কে টুল বা সহকারী হিসেবে ব্যবহার করে। তাদের এআই ব্যবহারে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা নেই। তবে যারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় অতিনির্ভরশীল তাদের জন্য ক্ষতিকর। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স ও ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টের (সিএসি) অধ্যাপক ড. মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিপুল তথ্যের জোগান দেয়। তবে তা কখনোই প্রকৃত শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক যৌক্তিক চিন্তাভাবনা এবং মানুষের নিজস্ব প্রচেষ্টার বিকল্প হতে পারে না। তিনি বলেন, শিক্ষা ক্ষেত্রে এআই দ্বিমুখী প্রভাব ফেলছে। প্রচলিত পাঠ্যক্রমের বাইরে গিয়ে উন্নত জ্ঞান অর্জনের একটি শক্তিশালী মাধ্যম এআই।