পাহাড়ের এই ভাঁজটায় বৃষ্টি নামলে জগৎ সংসার বড় পর মনে হয়। চুনট পাহাড়ের চূড়ায় জীর্ণ ডাকবাংলোটা নোনা ধরা দেয়াল আর কালচে শ্যাওলার প্রলেপ নিয়ে একাকী দাঁড়িয়ে। রেহান বারান্দার ইজিচেয়ারে শরীর এলিয়ে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে আছে। সন্ধ্যার সেই ধূসর আলো এখন নিকষকালো অন্ধকার। পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে যাওয়া ঝড়ো বাতাস পাইন আর ইউক্যালিপটাস গাছের পাতায় মাতম তুলছে। হাতের কাছে খাদের গভীর থেকে তুলে আনা এক খণ্ড বিরল চুনাপাথর। পাথরটা স্পর্শ করলে এক আদিম শীতলতা আঙুলের ডগা দিয়ে মগজে গিয়ে পৌঁছে। নির্জন এই প্রহরে পাথরের চেয়েও এক ভারী নীরবতা তার বুকে চেপে বসেছে। বাতাসের তোড়ে বুনো লতার সেই শোঁ শোঁ শব্দ রেহানের কানে কোনো এক কামাতুর প্রেতাত্মার আর্তনাদ হয়ে বাজছে। মানুষের একাকিত্ব ঘন হলে চারপাশের জড় বস্তু বুঝি প্রাণ পায়। রেহানের মনে হলো এই ডাকবাংলোর প্রতিটি ইট আর কাঠ এক একটি জ্যান্ত সাক্ষী হয়ে তাকে বিদ্রুপ করছে। হঠাৎ এক প্রচণ্ড শব্দে বাজ পড়ল। মনে হলো আকাশ দুই ভাগ হয়ে ধরণির ওপর ভেঙে পড়ছে। ঠিক সেই মুহূর্তেই বারান্দার দরজায় একটি ছায়া স্থির। রেহান চমকে দেখল এক আশ্চর্য মানবী। গায়ের রং মেঘের কোলঘেঁষা মায়াবী অন্ধকার। পরনে পাতলা নীল শাড়ি। বৃষ্টির জলে ভেজা শাড়িটি দেহের প্রতিটি খাঁজে লেপ্টে আছে। মনে হচ্ছে ওটা শাড়ি নয়, তার শরীরেরই অবিচ্ছেদ্য এক চামড়া। চুল থেকে বৃষ্টির জল গড়িয়ে পড়ছে উন্নত বক্ষ বিভাজিকায়। রেহানের মনে হলো মেয়েটি পাহাড়ের কোনো আদিম গুহা থেকে উঠে আসা এক রহস্যময়ী জলকন্যা। তার চোখের মণি দুটো কোনো অতল দিঘির জল, যেখানে তাকালে তল খুঁজে পাওয়া দায়।
রেহান কাঁপা স্বরে শুধাল, আপনি কে? মেয়েটি হাসল। সেই হাসিতে বিদ্যুতের ঝিলিক ছিল কি না রেহান জানে না, তবে তার শিরদাঁড়া দিয়ে এক আদিম শীতল স্রোত বয়ে গেল। মেয়েটি এগিয়ে এলো। প্রতিটি পদক্ষেপে এক অমোঘ ছন্দ, যা পাহাড়ের মাটির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। তার পায়ে নূপুর নেই, তবুও প্রতিটি চলায় এক অলৌকিক ধ্বনি অনুরণিত হচ্ছে। সে নিচু ও গম্ভীর স্বরে বলল, আমি মেঘবতী। এই পাহাড় দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাষ্প হয়ে আকাশ ছুঁতে চাইলে আমি নিচে নেমে আসি। আপনি বুঝি পাথর খুঁজছেন? রেহান কথা হারাল। তার পুরুষ দৃষ্টি মেঘবতীর ভিজে যাওয়া শরীরে স্থির। ভিতরের সুপ্ত ক্ষুধার অবাধ্য পশুটি দীর্ঘ ১০ বছর পর আজ হঠাৎ জেগে উঠেছে। মেঘবতীর শরীরের ভাঁজে জমে থাকা জলকণাগুলো আগুনের স্ফুলিঙ্গ হয়ে রেহানের তৃষ্ণাকে উসকে দিচ্ছে। রেহান অনুভব করল তার বুকের ভিতরটা পুড়ছে। মেঘবতীর কপালে মাটির এক তিলক। রেহান বুঝল এই নারী সাধারণ কোনো পথিক নয়; সে কাম আর মায়ার এক নিবিড় সংমিশ্রণ। ঘরের ভিতর ধূপের ধোঁয়া আর মেঘবতীর শরীরের বুনো ঘ্রাণ মিলেমিশে এক অদ্ভুত মাদকতা তৈরি করেছে। মেঘবতী ঘরের কোণে জ্বলতে থাকা চিমনিটার পাশে বসল। আগুনের লকলকে শিখা তার মুখে যে ছায়া ফেলছে, তাতে তাকে একবার দেবী আর পরক্ষণেই এক দানবী বলে ভ্রম হচ্ছে। আগুনের আলোয় তার উন্মুক্ত ঘাড় আর কানের লতি অলৌকিক কোনো কবিতার মতো কথা বলছে। রেহান পাশে গিয়ে দাঁড়াল। হাতের আঙুলগুলো অবশ হয়ে আসছে। মেঘবতী মুখ তুলে তাকাল। চোখের মণি দুটো সাগরের অতল অন্ধকার। সে ফিসফিস করে বলল, মানুষ ভাবে শরীর মানেই সব। শরীরের ভিতরে যে কামনার মেদ জমে, সেই মেদ কি ছুঁয়েছেন কোনো দিন? শরীরের মেদ চর্মচক্ষু দিয়ে দেখা যায়, কিন্তু আত্মার মেদ কেবল অনুভবে ধরা দেয়।
রেহান হাত বাড়াল। মেঘবতীর ভিজে শাড়ির ওপর দিয়ে আঙুলগুলো আলগোছে স্পর্শ করতেই মনে হলো কোনো তপ্ত অগ্নিকুণ্ডে হাত দিয়েছে। মেঘবতী সরল না। শরীরটাকে আরও একটু এলিয়ে দিল রেহানের দিকে। রেহান অনুভব করল মেঘবতীর ঊরুর খাঁজে এক প্রবল উষ্ণতা। এটি কেবল জৈবিক মিলন নয়, প্রকৃতির এক রুদ্র আহ্বান। রেহান দুহাতে মেঘবতীর মুখটা তুলে ধরল। ঠোঁট দুটো বর্ষার কদমের মতো ভিজে এবং টকটকে লাল। রেহান বিড়বিড় করে বলল, তোমার শরীরটা মেঘের মতো নরম। ভিতরে এত তাপ কেন মেঘবতী? মেঘবতী রেহানের গায়ের ওপর ঢলে পড়ল। স্তনের দৃঢ়তা রেহানের পাঁজরে এক যন্ত্রণাদায়ক সুখের অনুভূতি দিচ্ছে। সে রেহানের কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, মেঘ গর্ভবতী হলে তার ভিতর মেঘমেদ জন্মায়। সেই মেদ ঝরিয়ে দেওয়ার জন্যই আপনার কাছে আসা। পারবেন আমার এই বাষ্প শরীরটাকে জল করে দিতে? রেহান আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। প্রবল আক্রোশে তাকে জাপটে ধরল। বিছানায় লুটিয়ে পড়ার মুহূর্তে বাইরে বাতাসের গর্জন বাড়ল। ঝড়ো হাওয়া জানালার কপাটগুলো যেন ভেঙে ফেলতে চাইছে। মেঘবতীর শাড়ির আঁচল কখন মেঝেতে খসে পড়েছে রেহান তা টের পায়নি। চোখের সামনে এক অবারিত দিগন্ত। নগ্ন শরীর আগুনের আলোয় রুপোলি মাছের মতো ঝিলিক দিচ্ছে। রেহানের প্রতিটি স্পর্শে মেঘবতী কুঁকড়ে উঠছে। এক অবাধ্য মেঘের খণ্ড বুঝি বজ্রপাতের অপেক্ষায় আছে। রেহান তার ঠোঁট ডুবিয়ে দিল মেঘবতীর কণ্ঠনালিতে। মেঘবতী এক আদিম আর্তনাদ করে উঠল। নখগুলো রেহানের পিঠে বসিয়ে দিল। পাহাড়ের মাটি খুঁড়ে সে আজ কোনো গুপ্তধনের সন্ধান করছে। রেহান অনুভব করল মেঘবতীর শরীরের প্রতিটি ছিদ্র থেকে এক ধরনের নোনা জল বেরোচ্ছে। কামের আগুন তাতে বহুগুণ বাড়ল। শরীরের ঘর্ষণ থেকে তৈরি উত্তাপে ঘরের অন্ধকার বাষ্প হয়ে উড়ছে। রেহান দেখল মেঘবতীর পেটের ওপর জমে থাকা ঘামের বিন্দুগুলো ছোট ছোট হীরের মতো জ্বলছে। সে সেই বিন্দুগুলো নিজের জিভ দিয়ে চুষে নিল। মেঘবতী এক মরণপণ উন্মাদনায় রেহানকে নিজের ভিতর গ্রহণ করছে। মনে হলো দুটি বিচ্ছিন্ন মেঘের খণ্ড আজ একে অন্যের অস্তিত্ব বিলীন করে দিতে চাইছে। সেই মিলনের ভিতরে কোনো শব্দ নেই, কেবল দুই জোড়া ফুসফুসের হাঁপানির মতো আওয়াজ আর পাহাড়ের বুক চিরে নামা বৃষ্টির ঝমঝম ধ্বনি।
ঘর অন্ধকার। আগুনের শিখা নিভে গিয়ে এখন নীল বর্ণ ধারণ করেছে। রেহান আর মেঘবতী তখনো দুজনের বাহুবন্দি। রেহান হাতের তালু বুলিয়ে দিচ্ছিল মেঘবতীর মসৃণ ঊরুর ওপর। মনে হচ্ছিল ওটা রক্তমাংসের নারী নয়, মেঘের এক দলা নরম তুলা। মেঘবতী তখনো চোখ বুজে আছে। তার শরীর থেকে এক ধরনের ভিজে মাটির সোঁদা গন্ধ বেরোচ্ছে। শ্বাস-প্রশ্বাস এখন সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের মতো ধীরে ধীরে শান্ত। রেহান কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, তোমার এই শরীরের মেদ কি আমার স্পর্শে গলল মেঘবতী? তুমি কি শান্ত হয়েছ? মেঘবতী চোখ খুলল। চোখে কামনার রেশ নেই, আছে এক অনন্ত ও ধূসর শূন্যতা। সেই শূন্যতা এতটাই গভীর যে রেহান সেখানে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখতে পেল না। সে রেহানের হাতটা নিজের নাভির ঠিক নিচে চেপে ধরল। রেহান অনুভব করল মেঘবতীর শরীর বাইরে থেকে শীতল হয়ে এলেও ভিতরে এক লুকানো স্পন্দন এখনো রয়ে গেছে। মেঘবতী বিড়বিড় করে বলল, আমার মেদ শরীর দিয়ে ঝরে না রেহান। এই মেদ আত্মায় জমে থাকে। মেঘেরা হাজার কোটি ফোঁটা জল ঝরিয়েও নিজেদের অস্তিত্বের তৃষ্ণা মেটাতে পারে না, আমিও তেমনি। আপনি আমাকে নগ্ন করতে পেরেছেন, আমার একাকিত্ব কি স্পর্শ করতে পেরেছেন? রেহানের মনে হলো শরীরে কেউ এক বালতি বরফ জল ঢেলে দিয়েছে। তার পৌরুষের অহংকার মুহূর্তেই ধুলোয় মিশে গেল। মেঘবতীর চোখের দিকে তাকিয়ে সে দেখল সেই পাথরের মতো কঠিন শূন্যতা, যা সে সারা জীবন পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে খুঁজে ফিরেছে। মেঘবতী শরীর সরিয়ে নিল। জানালার দিকে তাকিয়ে রইল। সেখানে বৃষ্টির ঝাপটা এসে পড়ছে। নগ্ন শরীরের রেখাগুলো অন্ধকারে এক অচেনা ছবির মতো দেখাচ্ছিল। রেহান নিজের হাতের দিকে তাকাল। তার মনে হলো আঙুলগুলো আজ কলঙ্কিত নয়, এক পবিত্র বিষাদে সিক্ত। এই বিষাদ কোনো পরাজয়ের নয়, বরং এক পরম প্রাপ্তির।
মেঘবতী বলল, মানুষভাবে শরীরই সব। শরীরের বাইরেও এক বিশাল জগৎ আছে। আপনি যে পাথর খুঁজে বেড়ান রেহান, ওগুলোও এক সময় আকাশ ছিল। মেঘ জমে জমে অতিভারী হয়ে উঠলে পাথর হয়ে মাটিতে আছড়ে পড়ে। কামনা জমাট বাঁধলে তা মেদ হয়। সেই মেদ কি আজ আমার ভিতর থেকে টেনে বের করতে পেরেছেন? নাকি কেবল শরীরটাকে নিংড়ে দিলেন? রেহান নিরুত্তর। মাথা ভন ভন করে ঘুরছে। বাইরে বৃষ্টি থামেনি, বরং তার গতি আরও বেড়েছে। পাহাড়ের গা বেয়ে কাদা জলের স্রোত নামছে। রেহান উঠে বসল। দেখল বিছানায় মেঘবতীর সেই নীল শাড়িটা অগোছালো পড়ে আছে। শাড়িটা যেন মেঘবতী নিজেই তার শরীরের খোলস ফেলে রেখে গেছে। রেহান শাড়িটা হাতে নিল। ওটা অদ্ভুুতভাবে উষ্ণ। ভিতরে মেঘবতীর শরীরের ঘ্রাণ আর উত্তাপ এখনো লুকানো। ভোর হওয়ার আগের মুহূর্ত। আকাশ পরিষ্কার হয়নি, রহস্যময় কুয়াশায় ঢাকা চারপাশ। ডাকবাংলোর ভিতরটা এখন এক হাহাকার করা গহ্বর। রেহান বাইরে এলো। পা দুটো ভারী। পাহাড়ের গায়ে সাদা মেঘের খণ্ডগুলো লেপ্টে আছে। রেহানের মনে কোনো স্নিগ্ধতা নেই, আছে এক তীব্র আধ্যাত্মিক দহন। সে গতরাতে কেবল এক নারীর সঙ্গে শয়ন করেনি, প্রকৃতির এক রুদ্র খণ্ডের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচে নামার পথে গহ্বরগুলো এখন আর গর্ত নয়, এক একটি তৃষ্ণার্ত মুখ। প্রতিটি ঝোপ আর পাথর যেন তাকে কিছু একটা বলতে চাইছে। ছোট এক ঝরনার পাশে বসে আছে বৃদ্ধ করম আলী। হাতে পুরোনো তামাকের কল্কে। তামাকের ধোঁয়া কুয়াশার সঙ্গে মিশে একাকার। করম আলী হাসিমুখে রেহানের দিকে তাকালেন।
করম আলী বললেন, কী রেহান সাহেব, পাথর কি মিলল? নাকি অন্য কিছু নিয়ে ফিরছেন? রেহান জবাব দিল না। করম আলীর বয়স্ক চোখের মণি দুটো ব্রহ্মাণ্ডের সব রহস্যের খোঁজ জানেন। এই লোকটা বোধহয় জন্ম থেকেই এই পাহাড়ের বুক চিরে বের হওয়া ঘাস আর পাথরের ভাষা বোঝেন। রেহান কান্ত স্বরে বলল, করম আলী, মেঘের মেদ কি কোনো দিন গলে? নাকি জমে জমে পাথর হয়ে যায়? করম আলী হো হো করে হাসলেন। দাঁতগুলো পানের রসে রক্তবর্ণ। তিনি বললেন, মেঘমেদ? ওরে পাগল, মেঘ প্রেমে পড়লে ভারী হয়। সেই ভারী হওয়াটাই তো মেদ। সেই মেদ ঝরিয়ে না দিলে আকাশ নীল হয় না। কাল সারা রাত মেঘবতীর সঙ্গে মেদ গলানোর খেলা খেললেন। কিন্তু দেখুন তো, নিজের ভিতরের পাথরটা কি হালকা হয়েছে? রেহান চমকে উঠল। পকেটে হাত দিয়ে দেখল গতকালকের সেই চুনাপাথরটা নেই। পাথরটা কোথায় গেল? পাহাড়ের কোনো খাঁজে পড়ে গেছে নাকি ডাকবাংলোর বিছানায়? নাকি পাথরটাই মেঘবতী হয়ে এসেছিল? করম আলী লাঠি দিয়ে মাটির ওপর একটা বৃত্ত আঁকলেন। বললেন, মেঘের মেদ শরীর দিয়ে ঝরে না রেহান সাহেব। মেদ আত্মার গভীরে পাথরের মতো জমাট বাঁধে। পাথর গলাতে হলে শরীর ছুঁলে হয় না, মায়ার জগৎকে অতিক্রম করতে হয়। শরীরী মিলনে যে সুখ খুঁজেছেন, ওটা কেবল এক মুহূর্তের ভ্রম। কিন্তু মেঘবতী আপনাকে যে রিক্ততা দিয়ে গেল, ওটাই জীবনের আসল সম্পদ। মানুষ পূর্ণতার চেয়ে শূন্যতায় বেশি শিখতে পারে।
রেহান পাহাড়ের পাদদেশে পৌঁছাল। মনে হলো সে এক জনহীন মরুভূমিতে দাঁড়িয়ে। চারদিকে সবুজের সমারোহ, তবুও তার চোখে সব কিছু ধূসর। ডাকবাংলোর দিকে শেষবারের মতো পেছন ফিরে দেখল ওটা ঘন মেঘের আড়ালে বিলীন। ডাকবাংলোটা যেন এক অলীক স্বপ্ন ছিল। মেঘবতী সেই বাষ্পের সঙ্গে মিশে ফিরে গেছে আপন ঠিকানায়। রেহান ব্যাগ থেকে একটি পুরোনো ডায়েরি বের করল। সে চিরকালই এই ডায়েরিতে তার পাওয়া আর না পাওয়ার হিসাব লিখে এসেছে। শেষ পাতায় কাপালিকের মতো দৃঢ়তায় লিখল পাওয়ার নাম শরীর হলে, না পাওয়ার নাম মেঘমেদ। যা আত্মাকে পাথর করে দেয়, আবার সেই পাথর থেকেই একদিন বৃষ্টির জন্ম হয়। সে ডায়েরিটা বন্ধ করল। সেদিন থেকে রেহান আর পাথর খুঁড়তে পাহাড়ে যায় না। নদীর ঘাটে বসে থাকে। গঙ্গার ঘোলা জলের স্রোত দেখে। দেখে মেঘেরা কীভাবে নিজেদের ভার বহন করে কান্ত হয়ে পড়ে। প্রতিটি মিলনের শেষে এক বিশাল বিচ্ছেদ লুকিয়ে থাকে। সেই বিচ্ছেদই মানুষকে পূর্ণতা দেয়। রেহান এখন আর মেঘবতীকে ফিরে পাওয়ার জন্য আকুল নয়। মেঘবতী তার নিঃশ্বাসে, ঘামে আর প্রতিটি নিঃসঙ্গ রাতের দহনে মিশে আছে। জীবন এখন শরীরী আকাক্সক্ষা নয়, এক মরমি প্রতীক্ষার নাম। প্রতিটি বর্ষায় রেহান আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। সে জানে একদিন আকাশ আবার ভারী হবে, মেঘেরা গর্ভবতী হবে। সেদিন হয়তো অন্য কোনো রেহান মেঘবতীর মায়াবী মেদ গলানোর নেশায় মগ্ন হবে। কিন্তু রেহান আজ মুক্ত। শরীর কেবল এক ছায়ার পতিতা, আসল রূপ লুকিয়ে থাকে অদৃশ্য মেঘেদের ভাঁজে ভাঁজে। রেহান একা হাসল। চোখের কোণে এক ফোঁটা জল চিকচিক করে উঠল। জলটি কি মেঘবতীর দেওয়া স্মৃতি? নাকি নিজের আত্মার গলে যাওয়া মেঘমেদ? রেহান জানে না। এই নীলিমার নিচে শরীরী তৃষ্ণা একদিন ফুরিয়ে যাবে, মেঘেদের অবিনশ্বর মায়া চিরকাল বেঁচে থাকবে মানুষের হাহাকারে। প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস আকাশ ছোঁবে, আর সেই বাষ্প আবার কোনো এক মেঘবতী হয়ে পৃথিবীতে নেমে আসবে। মায়ার এই চক্র কোনো দিন শেষ হওয়ার নয়।