দাবা বিশ্বের একটি জনপ্রিয় খেলা। কথিত আছে দাবা খেলার সর্বপ্রথম সূচনা হয় ভারতবর্ষে। যিনি দাবা খেলেন তাঁকে বলা হয় দাবাড়ু। আর চাল দিয়ে যখন বিপক্ষের রাজাকে কোণঠাসা করা হয় তখন একে দাবার পরিভাষায় বলে কিস্তিমাত। বাংলাদেশের দাবার ইতিহাস ঘাঁটলে আমরা দেখতে পাই এক সোনালি অতীতের। বেশ কয়েকজন এই খেলায় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পান। নিয়াজ মোর্শেদ বাংলাদেশের প্রথম গ্র্যান্ড মাস্টার। পরে আরও কয়েকজন গ্র্যান্ড মাস্টার হন। অপরদিকে বাংলাদেশের সেরা মহিলা দাবাড়ু রানী হামিদ। তাঁকে কে না চেনে! যিনি গৃহিণী থেকে দাবার রানি হয়ে ওঠেন?
২. মানুষ মাত্রই স্মৃতিকাতর। তার এই ছোট্ট জীবনে কত স্মৃতিই না জমে থাকে। আমিও তার ব্যতিক্রম নই। নিজের দেশের গণ্ডি পেরিয়ে যখনই বাইরের কোনো দেশে গিয়েছি সেখানকার চমকপ্রদ জিনিসগুলো আমাকে মুগ্ধ করেছে, মনের মণিকোঠায় জায়গা করে নিয়েছে। আজ এমনই দুইটি দেশের নাম বলব, যা বিশ্বব্যাপী দাবা খেলার পথিকৃৎ হিসেবে স্বীকৃত। একটি হলো ইউরোপের আর্মেনিয়া, যেখানে দাবা খেলা স্কুল থেকেই বাধ্যতামূলক। দাবাড়ুরাই সে দেশের সবচেয়ে বড় তারকা। তার আগে আর্মেনিয়া দেশটি সম্পর্কে কিছু ধারণা নিয়ে নিই।
৩. আর্মেনিয়া পূর্ব ইউরোপের একটি রাষ্ট্র। আগে সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত থাকলেও পরবর্তী সময়ে দেশটি স্বাধীনতা লাভ করে। লোকসংখ্যা মাত্র ৩০ লাখ, যার বেশির ভাগই খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী। উল্লেখ্য জাতিগতভাবে আর্মেনিয়রা নিজেদের ‘হায়’ বলে ডাকে এবং ৯০ শতাংশ মানুষই হায় গোষ্ঠীভুক্ত।
৪. মজার বিষয় হলো, আর্মেনিয়ায় বাংলাদেশ নামে একটি জেলা আছে। জেলাটির প্রকৃত নাম ‘মালাতিয়া সেবাস্তিয়া’। অফিশিয়াল নাম যা-ই হোক, স্থানীয়দের কাছে এটি বাংলাদেশ নামেই বেশি পরিচিত। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পর বিশ্ব মানচিত্রে নতুন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশের সম্মানে স্থানীয় বাসিন্দারা ওই এলাকার নতুন নামকরণ করেন ‘বাংলাদেশ’। ওই সময়টায় বাংলাদেশের স্বাধীনতার খবর ছড়িয়ে পড়লে তাদের এলাকায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। যার ফলে স্থানীয় বাসিন্দারা এই নতুন এলাকাটিকে বাংলাদেশ নামে ডাকতে শুরু করেন। অর্থাৎ আর্মেনিয়ার এ এলাকাটি এখন বাংলাদেশ হিসেবে সুপরিচিত। এটি তুলনামূলকভাবে নিচু স্থানে অবস্থিত। বাংলাদেশের মতো কিছুটা সবুজ গাছগাছালি ও অরণ্যে ঘেরা বিধায় জায়গাটির নাম বাংলাদেশ নামকরণ করা হয়। আর্মেনিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কও বহু পুরোনো। সেই মধ্যযুগে সে দেশের লোকেরা এ দেশে আসতেন ব্যবসার সূত্রে। পুরান ঢাকার আরমানিটোলা সে স্মৃতি বহন করছে।
৫. দেশটির মুদ্রার নাম আর্মেনিয়ান ড্রাম। তবে বাংলাদেশের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে ওই দেশটির মুদ্রার মান অনেক কম। বাংলাদেশি ১ টাকার বিনিময়ে ৬ আর্মেনিয়ান ড্রাম পাওয়া যায়। এটি একটি প্রাচীন সভ্যতার দেশ। সবাই আর্মেনীয় ভাষায় কথা বলে। ইদানীং ইংরেজি ভাষার প্রচলনও বেড়েছে। ইয়েরেবান দেশটির রাজধানী ও বৃহত্তম শহর। জাতীয় খেলা দাবা। এটি তাদের জাতীয় সংস্কৃতি ও মর্যাদার প্রতীক। স্কুল পর্যায়ে দাবা খেলা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যা বিশ্বের খুব কম দেশেই আছে। দাবা খেলার পেছনে তারা প্রতি বছর লাখ লাখ ডলার খরচ করে থাকে।
৬. দাবা একদিকে যেমন কৌশলী হতে শেখায় অন্যদিকে মেধার বিকাশ ঘটায়। তাই তো দেশটির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মনে করে, ছোটবেলা থেকে দাবা খেললে শিশুরা একটি ‘বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের’ মধ্য দিয়ে যাবে, যা ভবিষ্যতে চিন্তাভাবনার ক্ষেত্রে কাজে দেবে। যেকোনো বিষয়ে বিশ্লেষণ করতে শিশুটি একটা ভাবনার স্তর পার হবে, যা তাকে স্পষ্ট ধারণা পেতে সাহায্য করবে। আর্মেনিয়ায় এখন ৩ হাজারেরও বেশি প্রশিক্ষিত দাবা শিক্ষক রয়েছেন।
৭. এই দেশের দাবাড়ুরা আক্ষরিক অর্থেই বড় তারকা, গ্র্যান্ড মাস্টারদের জন্য বাড়তি সম্মান এবং শহরের বড় বড় স্ক্রিনে চ্যাম্পিয়নশিপের ম্যাচগুলো দেখানো হয়, সাধারণ মানুষ ট্রাফিকে বসে বা কেবল দাবা খেলা দেখার উদ্দেশ্যেই সেসব স্ক্রিনের দিকে হা হয়ে তাকিয়ে থাকে, উত্তেজিত হয়, প্রতিপক্ষকে হারাতে পারলে আনন্দ প্রকাশ করে, বড় করে উদ্যাপন করে সব জয়। সাধারণত যা দেখা যায়, ফুটবল খেলা নিয়ে তা দাবার ক্ষেত্রেও ঘটে আর্মেনিয়ায়।
৮. দেশটির জনসংখ্যা খুবই কম তারপরও এই দেশ থেকে যেসব দাবাড়ু উঠে আসছেন তাঁরা রাশিয়া, চীন, যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশের দাবাড়ুদের প্রায়ই হারাচ্ছেন। এমনকি তাদের জাতীয় দাবাড়ু দল ইন্টারন্যাশনাল চেস অলিম্পিয়াডে তিন তিনবার চ্যাম্পিয়ন হয়। বিশ্বমঞ্চে আর্মেনিয়ার দাবাড়ুরা অত্যন্ত সফল।
৯. এবার আরেকটি দেশের কথা বলব, যে দেশে এক অদ্ভুত ধরনের দাবা খেলা হয়ে থাকে। জীবন্ত মানুষকেই দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ইতালির ভেনিস নগরীর নিকটবর্তী ছোট্ট একটি শহর নাম মারোসটিসা। এই শহরে প্রতি দুই বছর অন্তর অন্তর সেপ্টেম্বর মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে মানব দাবা খেলা প্রদর্শিত হয়। এটি একটি ব্যতিক্রমধর্মী দাবা খেলা। কেউ কেউ একে চলনশীল দাবা অথবা জীবন্ত দাবাও বলে থাকে। যেখানে মানুষ দাবার ঘুঁটির ভূমিকা পালন করে। মানব দাবা খেলাটি সাধারণত বহিরাঙ্গনে কোনো বড় মাঠে কৃত্রিম দাবা বোর্ডে হয়ে থাকে। এই মানব দাবা খেলার মাধ্যমে কিংবদন্তিতুল্য দাবা খেলার ঘটনাকে স্মরণ করা হয়। তিন দিনব্যাপী এই মানব দাবার অনুষ্ঠান চলে। খেলার অংশগ্রহণকারীরা বিশেষ ধরনের ঐতিহাসিক পোশাক পরিধান করে থাকেন। এই খেলার জন্য দাবা কমিটির কিছু ধরাবাঁধা নিয়ম রয়েছে, যা মেনে চলতে হয়।
১০. ওই সময়টায় ছোট্ট শহর মারোসটিসায় এক উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। মানব দাবার প্রদর্শনীতে পর্যটকদের ঢল নামে। উপচে পড়া ভিড়, যেন বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস। গোটা শহরটা এক নতুন সাজে সজ্জিত হয়। জীবন একটাই, তাই তারা প্রাণভরে উপভোগ করে।
১১. সামারের উজ্জ্বল ঝকঝকে দিনে ইউরোপের বিভিন্ন শহরে যখন ছুটির এক হালকা মেজাজ চলে, আবহাওয়ায় থাকে এক ফুরফুরে আরামদায়ক উত্তাপ, ঠিক সেই সময়ে ইউরোপের নানান শহরের পার্কে, স্কোয়ারে, খোলা জায়গায় প্রায়ই অতিপরিচিত এক দৃশ্য দেখা যায়, তাহলো দাবা খেলার মারপ্যাঁচ, চাল আর কুটবুদ্ধির কৌশল। পৃথিবীর নামি মানুষ- নেপোলিয়ন, রানি ভিক্টোরিয়া থেকে শুরু করে চার্চিল এঁরা সবাই অবসর সময়ে নিজের বুদ্ধিকে শানিয়ে নিতে কাজে মনোযোগ ও একাগ্রতা বাড়াতে দাবা নিয়ে বসে যেতেন।
১২. দাবা একটি বৈশ্বিক খেলা, যা সব পর্যায়েই খেলা যায়। মাত্র চার বছর বয়সি যে কেউ ১০৪ বছরের বয়স্ক মানুষের বিপক্ষে খেলতে পারে। কেউ একজন হয়তো হাঁটতে পারেন না, তিনি শারীরিকভাবে শক্তিশালী কাউকে হারাতে পারেন। এর জন্য কোনো অতিরিক্ত পয়সাও খরচ করতে হয় না।
১৩. ব্রিটেনের খ্যাতনামা অধ্যাপক পিটার ডরভার্ন, যিনি একজন দাবাড়ুও বটে, তাঁর গবেষণাতে উঠে এসেছে দাবা খেললে আই-কিউ স্কোর বাড়ে এবং এটা শুধু চিন্তার গভীরতাই বৃদ্ধি করে না, স্মৃতিশক্তিও বৃদ্ধি করে। নাইজেরিয়ান বিজ্ঞানী অনাকোয়া মনে করেন, দাবা খেলা তাঁকে স্বাবলম্বী হতে সাহায্য করেছে। তিনি আরও মনে করেন, দাবা খেলাটি অনেক সস্তা, তাই যেকোনো জায়গায় যেকোনো আয়ের মানুষ দাবা খেলতে পারে। একটি গল্প দিয়ে লেখাটি শেষ করছি।
১৪. একটি কোম্পানির ইন্টারভিউ চলছিল। বস সামনের টেবিলে বসা মহিলার সিভি দেখে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এই চাকরির জন্য আপনি কত বেতন আশা করছেন?’ মহিলা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বললেন, ‘অন্তত ৯০ হাজার টাকা।’
বস তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন,
‘আপনার কি কোনো খেলার প্রতি আগ্রহ আছে?’
মহিলা উত্তর দিলেন, ‘জি, হ্যাঁ, আমি দাবা খেলতে খুব ভালোবাসি।’
বস হাসিমুখে বললেন, ‘দাবা তো খুব মজার খেলা। বলুন তো, দাবার কোন ঘুঁটিটি আপনার সবচেয়ে প্রিয়?’
মহিলা হাসি দিয়ে বললেন, ‘উজির’।
বস বললেন, ‘কেন? আমার তো মনে হয় ঘোড়ার চাল সবচেয়ে আকর্ষণীয়।’
মহিলা গম্ভীরভাবে বললেন, ‘হ্যাঁ, ঘোড়ার চাল আকর্ষণীয় বটে তবে উজিরের মধ্যে সব গুণ রয়েছে। সে তির্যকভাবে চলতে পারে, সরাসরি এগোতে পারে এবং প্রয়োজনে রাজার ঢাল হয়ে তাকে রক্ষা করতে পারে।’
বস মুগ্ধ হয়ে আবার জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তাহলে রাজাকে আপনি কেমন দেখেন?’
মহিলা বললেন, ‘দাবা খেলায় আমি রাজাকে সবচেয়ে দুর্বল মনে করি। সে নিজেকে রক্ষা করার জন্য মাত্র একটি পদক্ষেপ নিতে পারে, যখন উজির তার চারপাশে থেকে তাকে রক্ষা করে।’
বস তার উত্তরে মুগ্ধ হয়ে আরও জানতে চাইলেন,
‘তাহলে আপনি নিজেকে দাবার কোন ঘুঁটির সঙ্গে তুলনা করবেন?’
মহিলা নির্দ্বিধায় বললেন, ‘রাজা’।
বস কিছুটা অবাক হয়ে বললেন, ‘কিন্তু আপনি তো রাজাকে দুর্বল বলেছিলেন। তাহলে নিজেকে কেন রাজা বলছেন?’
মহিলা হালকা হাসি দিয়ে বললেন, ‘কারণ আমি একজন রাজা, আর উজির ছিলেন আমার স্বামী। তিনি আমাকে সব সময় রক্ষা করতেন। কিন্তু এখন তিনি আর আমাদের মাঝে নেই।’
বস স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তিনি ধীরে ধীরে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তাহলে আপনি এই চাকরি কেন করতে চান?’ মহিলা চোখের কোণে জল নিয়ে বললেন, ‘কারণ আমার উজির চলে যাওয়ার পর, এখন আমাকে নিজেই উজির হয়ে আমার সন্তান ও পরিবারের দায়িত্ব নিতে হবে।’
ঘরের মধ্যে গভীর নীরবতা নেমে এলো। বস হাততালি দিয়ে বললেন, ‘আপনি নিঃসন্দেহে একজন সাহসী নারী। আপনার জন্য রইল অনেক অনেক শুভকামনা।’
১৫. দাবা খেলার চর্চা শুধু মানুষের মস্তিষ্কের কার্যকারিতাই বাড়ায় না, মানুষের বিশ্লেষণাত্মক ক্ষমতা, বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতা ও দূরদর্শিতাও বাড়ায়। এটি মানুষকে ধীরস্থিরভাবে চিন্তা করতে সাহায্য করে। সত্যি কথা বলতে কী, মানুষের জীবন দাবার চালের চেয়েও অনেক বড়, অনেক বিস্তৃত, দাবা খেলা মানুষকে জীবনের অসীম সম্ভাবনার জায়গায় নিয়ে যেতে সাহায্য করে, ভাবতে সাহায্য করে; আর তাই, এই সাদাকালো ছককাটা নকশা ও বত্রিশটা ঘুঁটি, হাজার বছরের পথ অতিক্রম করে আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়, ভাবায় ও গন্তব্যস্থলের পথ বাতলে দেয়।
♦ লেখক : গবেষক ও প্রাবন্ধিক