১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণ অভ্যুত্থান, ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ, ’৯০-এর ছাত্র গণ আন্দোলন এবং সর্বশেষ জুলাই ’২৪-এর গণ অভ্যুত্থানে অগণিত শহীদের আত্মত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশ বর্তমান অবস্থানে পৌঁছেছে। এ আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেশি। জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস রক্ষা করা রাষ্ট্র এবং সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। নৈতিক মূল্যবোধ, গণমানুষের আস্থা, সততা এবং জবাবদিহির ভিত্তিতেই একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়।
সব রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে আন্তরিক থাকতে হবে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কর্তব্য পালনে অবহেলার কোনো সুযোগ থাকা উচিত নয়। প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে জবাবদিহির আওতায় আসতে হবে এবং প্রয়োজনে স্বেচ্ছায় দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। দেশ কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; সরকার, জনপ্রতিনিধি, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং রাজনৈতিক কর্মী-সবাই জনগণের সেবক। যাঁরা জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের প্রত্যয় নিয়ে রাজনীতিতে আসবেন, তাঁদের সর্বাগ্রে সততা, নৈতিকতা ও আচরণে পরিবর্তন আনতে হবে। রাষ্ট্র ও রাজনীতির সব স্তরে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সততা, নিষ্ঠা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের উপযোগী পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।
স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা : সরকার জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো সত্তা নয়; জনগণের কল্যাণে কাজ করাই সরকারের প্রধান দায়িত্ব। তাই রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব খাটিয়ে কেউ জনগণের কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে বাধা সৃষ্টি করলে তার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করতে হবে।
গরিব মানুষের জন্য বরাদ্দকৃত কাবিখা, কাবিটা, টিআর, জিআর, এডিবি এবং অন্যান্য উন্নয়ন কর্মসূচি সততা ও ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করতে হবে। সব সরকারি উন্নয়নকাজ ও টেন্ডার অনুমোদিত নকশা, শিডিউল এবং নির্ধারিত গুণগত মান অনুযায়ী বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে। ঠিকাদার, বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট তদারকি কর্তৃপক্ষকে চুক্তির শর্ত, অনুমোদিত নকশা, শিডিউল ও নির্ধারিত গুণগত মান যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে। সরকারি অর্থে নির্মিত স্কুল, কলেজ, মসজিদ, মাদ্রাসা, মন্দির, গির্জা, গোরস্থান, অজুখানা, ক্লাব, পাঠাগার, হাসপাতাল, রাস্তাঘাটসহ সব উন্নয়নকাজে নির্ধারিত গুণগত মান বজায় রাখতে হবে। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, অনিয়ম, অস্বচ্ছতা কিংবা দুর্নীতি কোনো অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য নয়।
সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার ও প্রকল্প বাস্তবায়ন : সরকারি অর্থ জনগণের আমানত। তাই সরকারি অর্থে বাস্তবায়িত প্রতিটি প্রকল্পে সর্বোচ্চ সততা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং নির্ধারিত গুণগত মান নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্ব। বরাদ্দকৃত প্রতিটি টাকা নির্ধারিত উন্নয়নকাজেই ব্যয় করতে হবে। সরকারি অর্থের তছরুপ, অপব্যবহার, নয়ছয় কিংবা নীতিমালা লঙ্ঘন কঠোরভাবে প্রতিরোধ করতে হবে। বরাদ্দের অর্থ অন্যত্র ব্যবহার কোনো অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য নয়। আর্থিক অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেলে তা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রচলিত আইন অনুযায়ী দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং প্রয়োজনে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করতে হবে। সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক উন্নয়নব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। উন্নয়ন হবে জনগণের কল্যাণে।
জনগণের প্রতিটি টাকার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নৈতিক, সামাজিক, প্রশাসনিক ও আইনগতভাবে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
দুর্নীতি, মাদক ও সামাজিক অপরাধ প্রতিরোধ : মাদক শুধু একটি পরিবারকে নয়, পুরো সমাজকে ধ্বংস করে। একইভাবে দুর্নীতি, অর্থ পাচার ও ক্ষমতার অপব্যবহার রাষ্ট্রকে দুর্বল করে এবং জনগণের নিরাপত্তাহীনতা একটি দেশকে অস্থিতিশীল করে তোলে। তাই মাদক উৎপাদন, বিতরণ, পাচার, বিক্রয় ও সেবনের বিরুদ্ধে কঠোর সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে ঘুষ, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, দখলদারিত্ব, জুয়া এবং সব ধরনের সামাজিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি ও ঐক্যবদ্ধ জনমত গড়ে তুলতে হবে। মাদক, দুর্নীতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থানই একটি সুশাসিত, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের পূর্বশর্ত।
শিক্ষা, নৈতিকতা ও আগামী প্রজন্ম : শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, পরিবার এবং সামাজিক সংগঠনগুলোতে নৈতিক শিক্ষা, মানবিক মূল্যবোধ, দেশপ্রেম ও সামাজিক দায়িত্ববোধ জাগ্রত করতে হবে। তরুণ-তরুণীদের মাদক, অপরাধ ও অপসংস্কৃতি থেকে দূরে রেখে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, খেলাধুলা, সংস্কৃতি এবং সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার জন্য পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। একটি আদর্শ জাতি গঠনের ভিত্তি হলো সুশিক্ষা, নৈতিক মূল্যবোধ এবং দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরি করা। তাই আগামী প্রজন্মকে সৎ, দক্ষ, দেশপ্রেমিক ও মানবিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
আইনের শাসন, ন্যায়বিচার ও জাতীয় ঐক্য : আইনের শাসন, ন্যায়বিচার ও সুশাসন নিশ্চিত না করে একটি সভ্য, মানবিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। অপরাধ, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ পাওয়া গেলে তা গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও কার্যকর বিচার নিশ্চিত করতে হবে এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। দুর্নীতি, মাদক, সন্ত্রাস ও আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। জনগণ, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষক, অভিভাবক, ধর্মীয় নেতা এবং সর্বস্তরের সচেতন নাগরিকের সম্মিলিত প্রচেষ্টা, পারস্পরিক সহযোগিতা ও আন্তরিকতার মাধ্যমেই আমরা একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক, ন্যায়ভিত্তিক, মাদকমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত, বৈষম্যহীন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব, ইনশাআল্লাহ।
♦ লেখক : সংসদ সদস্য ও প্রধান সমন্বয়ক, জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল