বাংলাদেশে অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি-জাইকা। ঋণের সুদ হার নমনীয় করার কথাও জানিয়েছেন সফররত জাইকা প্রেসিডেন্ট আকিহিতো তানাকা। এদিকে বৈশ্বিক বাজার থেকে জাপান প্রতি বছর প্রায় ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের তৈরি পোশাক আমদানি করে। বাংলাদেশ থেকে আমদানি করে (২০২৪-২৫ অর্থবছরের হিসাব) ১ হাজার ৪১১ দশমিক ৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের তৈরি পোশাক। জাপানের বাজারে পোশাক রপ্তানির ধারা বাড়াতে চায় সরকার। জাইকার প্রেডিডেন্টের সম্মানে গতকাল নৈশভোজের আয়োজন করেছিল অর্থমন্ত্রণালয়। সেখানে জাইকা ও বাংলাদেশ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন। বাংলাদেশে যেসব জাপানি কোম্পানি ব্যবসা পরিচালনা করছে তারা চায় অবাধ সুযোগসুবিধা। যদিও জাপানকে আলাদাভাবে ইকোনমিক জোন দেওয়া হয়েছে। এরপরও দেশটির বড় কোম্পানিগুলো অবকাঠামো ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে অবাধে বিনিয়োগ করতে চায়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে জাইকা প্রেসিডেন্ট আকিহিতো তানাকার বৈঠকে এসব বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সম্প্রতি জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তি (ইপিএ) সম্পাদিত হয়েছে। যা বাংলাদেশের বাণিজ্য অর্থনৈতিক কূটনীতিতে যুগান্তকারী পদক্ষেপ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। এটি বাংলাদেশের প্রথম ইপিএ। জানা গেছে, একক বাজার বিবেচনায় জাপান যুক্তরাষ্ট্রের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক আমদানিকারক দেশ। এত বড় বাজার হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির মাত্র প্রায় ৩ শতাংশ জাপানে যায়। ২০৩৫ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে ইপিএ কার্যকর হলে জাপানের এই শেয়ার অন্তত ১০ শতাংশে উন্নীত করাকে সুস্পষ্ট কৌশলগত লক্ষ্য হিসেবে দেখা উচিত। জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রায় ৪৫৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। বাংলাদেশি রপ্তানিকারকরা মনে করেন ইপিএ এই ব্যবধান কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এটি পোশাকের বাইরে রপ্তানি বৈচিত্র্য আনার সুযোগ তৈরি করবে এবং জাপানি পোশাক আমদানিকারক, খুচরা বিক্রেতা, যন্ত্রপাতি সরবরাহকারী ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের সম্পৃক্ততা বাড়াতে সহায়তা করবে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জাইকা প্রেসিডেন্টের ঢাকার সফরের বিষয়টিও। ঢাকার মেট্রোরেল লাইন-৬ জাইকার নির্মিত। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে আকিহিতো একান্ত বৈঠক করেছেন। সেখানে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনা, চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, রেলখাতের উন্নয়নসহ অন্যান্য অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর কথা জানিয়েছেন তানাকা। জানা গেছে, বর্তমানে বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগের সিংহভাগ এসেছে রাসায়নিক সেক্টরে (৫৭ শতাংশ)। এরপর টেক্সটাইল সেক্টরের (১৬ শতাংশ) স্থান। তারপর মেটাল প্রডাক্টস (১৩ শতাংশ), ইলেকট্রনিকস (১১ শতাংশ) এবং অন্যান্য (৩ শতাংশ)। বাংলাদেশের প্রাগ্রসরমান গার্মেন্ট শিল্পের পশ্চাৎ সংযোগ হিসেবে টেক্সটাইল সেক্টরে জাপানি বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তার প্রেক্ষাপটে জাপানের নিশিমেন, টয়োবো করপোরেশন এবং বাংলাদেশের এ কে খান গ্রুপ ইন্টারন্যাশনাল মিলস প্রজেক্ট স্থাপনের একটি উদ্যোগ এবং ১৫০ মিলিয়নের মারুবেনি-এসারের আরেকটি বড় প্রকল্প (কোল্ড রোল স্টিল মিলস লিমিটেড) দীর্ঘদিন ধরে বাস্তবায়নের অপেক্ষায় ছিল। সেগুলো নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এদিকে নারায়ণগঞ্জে জাপানি ইকোনমিক জোনে দেশটির তৈরি গাড়ি প্রস্তুত করা হচ্ছে। সেসব কারখানা আরও বিস্তৃত করতে চায় দেশটি। জানা গেছে, জাপান বাংলাদেশের বড় উন্নয়ন সহযোগী। বিদেশি ঋণ ও সহায়তা বিষয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) প্রতিবেদন (২০২৪-২৫) বলছে, ২০২৫ সালের ৩০ জুন বাংলাদেশের বিদেশি ঋণের পরিমাণ (স্থিতি) ছিল ৭ হাজার ৭২৮ কোটি মার্কিন ডলার। এর ১৮ শতাংশই দিয়েছে জাপান। সহজ শর্তে জাপানি ঋণ পাওয়া যায়। এই প্রবাহ আরও বাড়াতে অনুরোধ করা হয়েছে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে। জাইকার মাধ্যমে বাংলাদেশের মেট্রোরেল, মহেশখালীর মাতারবাড়ীর বিদ্যুৎকেন্দ্র, ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল, যমুনা নদীর ওপর নির্মিত রেলওয়ে সেতুসহ বিভিন্ন প্রকল্পে সাম্প্রতিককালে ঋণ দিয়েছে। তবে কোনো কোনো প্রকল্পে উচ্চ ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
সেগুলো নিয়েও আলাপ-আলোচনা হয়েছে। ভবিষ্যতে নির্মাণ ব্যয় কীভাবে কমিয়ে আনা যায় এ ব্যাপারে সুচারুভাবে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জাইকা।
বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের জন্য ঋণের সুদের হার বাড়িয়েছে জাপান। নতুন সুদের হার গত ১ এপ্রিল কার্যকর হয়েছে। সাধারণ জাপানি ঋণের ক্ষেত্রে গত বছরের অক্টোবরে সুদের হার ছিল ২ দশমিক ৯ শতাংশ। ১ এপ্রিল থেকে সেটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৬ শতাংশে। সুদের হার বেড়েছে শূন্য দশমিক ৭ শতাংশীয় বিন্দু। এসব ঋণের সুদ কীভাবে সহনশীল ও নমনীয় করা যায় সে বিষয়েও আকিহিতো তাকানার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়।