প্রত্যাশা মাফিক দুই সহ-স্বাগতিকের পাশাপাশি স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র রাউন্ড অব সিক্সটিনে পৌঁছে গেছে। এদের মধ্যে মরক্কোর বিপক্ষে জয়ী হয়ে কানাডা কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে যাবে সেটা বিশ্বাস করার মতো লোক খুঁজে পাওয়া যাবে হয়তো হাতেগোনা কজন। অপর দুই দেশ যুক্তরাষ্ট্র এবং মেক্সিকো এই রাউন্ডে যথাক্রমে বেলজিয়াম এবং ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হবে। রাউন্ড অব-৩২-এর খেলায় পিছিয়ে পড়েও হতোদ্যম না হয়ে দুই ইউরোপিয়ান টিম যেভাবে খেলায় ফিরেছে তা এক কথায় অসাধারণ। তাদের এ লড়াকু মানসিকতাই স্বাগতিক দুটি দেশের কপালে দুঃশ্চিন্তার ভাঁজ ফেলার জন্য যথেষ্ট। ১৯৮৬ সালের ঘরের মাঠের বিশ্বকাপে শেষ ষোলোর সেই জয়ের পর দীর্ঘ ৪০ বছরের ব্যাপ্তিকালে সাতটি নকআউটের টানা ব্যর্থতায় এবারই প্রথম জয় পেল মেক্সিকানরা। জয়ের বদ্ধ দুয়ার যেহেতু খুলেছে তারই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে চাইবে দেশটি। খেলাটি অনুষ্ঠিত হবে আজটেকাতে যেখানে বিশ্বকাপের সর্বশেষ ১০ ম্যাচের কোনোটিই হারেনি স্বাগতিকরা। এ পর্যন্ত অন্য যারা রাউন্ড অব সিক্সটিনে গেছে তাদের মধ্যে ফ্রান্সের কোয়ার্টার ফাইনালে খেলা নিয়ে কারও কোনো সংশয় আছে বলে মনে হয় না। প্যারাগুয়ে বিনা প্রতিরোধেই আত্মসমর্পণ করতে পারে ফ্রান্সের কাছে। আরলিং হল্যান্ডের নরওয়ে এই রাউন্ডে মুখোমুখি হচ্ছে ব্রাজিলের। শুরুতে কিছুটা অগোছালো মনে হলেও অভিজ্ঞ কোচ আনচেলত্তির অধীনে ব্রাজিল ধীরে ধীরে তাদের চেনা ছন্দে ফিরছে। নির্দিষ্ট কারও ওপর নির্ভর করতে না হওয়াটাই দলটির ইতিবাচক দিক। নরওয়ে তাদের সামর্থ্যরে পরীক্ষা নিতে সক্ষম হলেও কোচের ধীরস্থিরতা আর প্রয়োজনীয় মুহূর্তে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতায় সেলেসাওরা ম্যাচটি নিজেদের করে নিতে পারবে। বিশ্বকাপ তার উজ্জ্বলতার রং হারাবে যদি এমনটা না ঘটে।
আপনারা যখন এ লেখা পড়েছেন তখন ইতোমধ্যেই দুই বন্ধু রোনাল্ডোর পর্তুগাল এবং মডরিচের ক্রোয়েশিয়া কিংবা আসরের অন্যতম ফেবারিট টানা ৩৪ ম্যাচে অপরাজিত স্পেনের রাউন্ড অব সিক্সটিনের ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে গেছে। আর কাল ভোরে কাগজেকলমের শক্তি এবং সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সে অনেক এগিয়ে থাকা ফুটবলের বরপুত্র মেসির আর্জেন্টিনা খেলতে নামছে নামে-ভারে যোজন যোজন পিছিয়ে থাকা চমক জাগানিয়া ছোট্ট কেপ ভার্দের বিপক্ষে। প্রথমবার খেলতে এলেও কেপ ভার্দেকে সাধারণ প্রতিপক্ষ ভাবার কোনো অবকাশ নেই। প্রথম রাউন্ডেই তারা তাদের সামর্থ্যরে প্রমাণ দিয়ে অপরাজিত থেকেই নকআউট রাউন্ডে উঠে এসেছে। অবশ্য আর্জেন্টিনা শুরু থেকেই দুর্দান্ত ছন্দে আছে। শিশু-কিশোর, আর টগবগে তারুণ্যের ধ্বজাধারী জেন-জি প্রজন্মসহ আপামর ফুটবলপ্রেমীরা উৎসুক থাকবে এ খেলাতে মহাতারকা মেসি কি তার স্বাভাবিক নৈপুণ্যের মাধ্যমেই নিজেকে আরও উঁচুতে তুলে ধরবেন? নাকি সব আলো কেড়ে ইতিহাসের নায়ক হয়ে যাবেন চীনের প্রাচীরসম কেপ ভার্দের ৪০ বছর বয়সি অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ভোজিনিও। যিনি দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে গ্রুপ পর্বের অন্যতম সেরা গোলকিপারের স্বীকৃতি পেয়েছেন ফুটবল বোদ্ধাদের কাছ থেকে। এ বাধা টপকাতে সক্ষম হলে কোয়ার্টার ফাইনালে তুলনামূলক সহজ প্রতিপক্ষের সম্মুখীন হবে আর্জেন্টিনা। কেপ ভার্দের বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য। দুই দলই তাই এ সুযোগ নিজেদের করে নিতে চাইবে সামর্থ্যরে সবটুকু দিয়ে হলেও। মোদ্দাকথা, এবারের আসরে অন্যতম আকর্ষণীয় এবং উপভোগ্য একটা ম্যাচ দেখতে চলেছি আমরা। তবে আর্জেন্টিনার সমর্থকরা ঘরের কোণে অমঙ্গলের কালো ছায়ার আশঙ্কা করতেই পারে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটার সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখে।
কেপ ভার্দের ন্যায় ১৯৮২ বিশ্বকাপে গ্রুপের তিনটি খেলাতে ড্র করেও ইতালি পরের রাউন্ডে চলে যায়। পরের চার খেলা জিতে শিরোপা নিজেদের করে নেয়। প্রথম পর্বে ২ গোলের বিপরীতে ২ গোল হজম করে ইতালি, যা এবারের কেপ ভার্দের অনুরূপ। দ্বিতীয় পর্বের প্রথম খেলায় ইতালি মুখোমুখি হয়েছিল তৎকালীন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার। আর এবার কেপ ভার্দে নকআউট পর্বের প্রথম খেলায় মুখোমুখি হচ্ছে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন সেই আর্জেন্টিনার সঙ্গেই। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে মেসিদের বিশ্বকাপ মিশনের সমাপ্তি কি তবে এখানেই? ১৯৮২ সালের ইতালি কি তবে ২০২৬-এর কেপ ভার্দে হয়ে ফিরে আসছে?