ইসলামের ইতিহাসে এমন কিছু বিষয় রয়েছে, যেগুলো শুধু তাত্ত্বিক বিতর্ক নয়; বরং ইমান, আদব ও উম্মাহর ঐক্যের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। ইসমতে আম্বিয়া (নবীগণের নিষ্পাপতা) এবং সাহাবায়ে কেরাম মিয়ারে হক (সাহাবাদের মর্যাদা ও সত্যের মানদণ্ড হিসেবে তাঁদের অবস্থান)-এ দুটি বিষয় এর অন্যতম। সাম্প্রতিক সময়ে এ নিয়ে বিভিন্ন অঙ্গনে বিতর্ক দেখা দিলেও একজন মুসলিমের জন্য আবেগ নয়, বরং কোরআন ও সহিহ সুন্নাহর নির্দেশনাই হওয়া উচিত চূড়ান্ত পথনির্দেশ। আল্লাহতায়ালা মানবজাতির হেদায়াতের জন্য নবীগণকে মনোনীত করেছেন। তাঁদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহই সর্বাধিক জানেন, কোথায় তিনি তাঁর রিসালাত অর্পণ করবেন।’ (সুরা আল-আনআম : ১২৪)।
নবীগণ ওহি পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে আল্লাহর বিশেষ হেফাজতের অধীন। আল্লাহ বলেন, ‘তিনি প্রবৃত্তির বশে কথা বলেন না; এটি তো কেবল প্রত্যাদেশকৃত ওহি।’ (সুরা আন-নাজম : ৩, ৪)। এ কারণে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের সর্বসম্মত আকিদা হলো নবীগণ ওহি পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নিষ্পাপ (মাসুম)। নিষ্পাপ তাঁরা জীবনের সব ক্ষেত্রে। কোরআনে যেসব স্থানে কিছু নবীর উত্তম কাজের পরিবর্তে তুলনামূলক কম উত্তম কাজ নির্বাচন উল্লেখ রয়েছে, সেগুলো কোনোভাবেই তাঁদের মর্যাদা বা নবুওয়াতের পরিপন্থি নয়। বরং আল্লাহ নিজেই তাঁদের সংশোধন করেছেন, যাতে উম্মত শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। নবীগণের পর মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব হলেন সাহাবায়ে কেরাম (রা.)। তাঁরা সেই সৌভাগ্যবান প্রজন্ম, যাঁরা রসুলুল্লাহ (স.)-এর সান্নিধ্যে থেকে ইমান গ্রহণ করেছেন এবং ইমানের ওপর মৃত্যুবরণ করেছেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আমি তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছি এবং তাঁরাও আমার প্রতি সন্তুষ্ট।’ (সুরা আত-তাওবা : ১০০)। অন্যত্র আল্লাহ বলেন, ‘মুহাম্মদ আমার রাসুল, আর যারা তাঁর সঙ্গে রয়েছেন, তারা কাফেরদের বিরুদ্ধে দৃঢ় এবং নিজেদের মধ্যে পরস্পর দয়ালু।’ (সুরা আল-ফাতহ : ২৯)।
রসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবাদের মর্যাদা সম্পর্কে বলেছেন, ‘সর্বোত্তম মানুষ আমার যুগের মানুষ, তারপর তাদের পরবর্তী যুগের মানুষ, তারপর তাদের পরবর্তী যুগের মানুষ।’ (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)। আরও বলেছেন, ‘তোমরা আমার সাহাবাদের গালি দিও না।’ (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)।
এই হাদিসগুলো প্রমাণ করে যে সাহাবাদের সম্মান রক্ষা করা ইমানি আদবের অংশ। তবে সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে যে ইজতিহাদি মতভেদ বা রাজনৈতিক ঘটনাবলি সংঘটিত হয়েছে, সেগুলো বিদ্বেষ, গালি বা অপমানের উপকরণ বানানো কখনোই বৈধ নয়। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের নীতি হলো-তাঁদের প্রতি সুধারণা রাখা এবং যে বিষয়গুলো আল্লাহ নিষ্পত্তি করেছেন, তা নিয়ে অযথা বিতর্কে না জড়ানো। কোরআন আমাদের শিক্ষা দেয়, ‘হে আমাদের রব! আমাদের এবং আমাদের পূর্ববর্তী মুমিন ভাইদের ক্ষমা করুন এবং মুমিনদের প্রতি আমাদের অন্তরে কোনো বিদ্বেষ রাখবেন না।’ (সুরা আল-হাশর : ১০)।
আরেক আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘আর যখন তাদের বলা হয়, ‘তোমরা ইমান আনো, যেমন মানুষ (সাহাবাগণ) ইমান এনেছে’, তখন তারা বলে, ‘আমরাও কি নির্বোধদের মতো ইমান আনব?’ জেনে রাখো, প্রকৃতপক্ষে তারাই নির্বোধ; কিন্তু তারা তা জানে না।’ (সুরা আল-বাকারা : ১৩)। এই আয়াতে আল্লাহ সাহাবায়ে কেরামের ইমানকে হেদায়াতের আদর্শ ও মানদণ্ড হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। মুনাফিকদের নিন্দা করা হয়েছে, যারা সাহাবাদের ইমানকে তুচ্ছজ্ঞান করত। আল্লাহ ঘোষণা করেছেন যে নির্বোধ তারা নয়; বরং যারা সাহাবাদের অনুসরণ করতে অস্বীকার করে, প্রকৃত নির্বোধ তারাই। তিনি অন্য আয়াতে ঘোষণা করেণ, ‘অতঃপর তারা যদি সে বিষয়ের ওপর ইমান আনে, যার ওপর তোমরা ইমান এনেছ, তবে তারা অবশ্যই সঠিক পথপ্রাপ্ত হবে। আর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে তারা কেবল বিরোধিতায় লিপ্ত। সুতরাং আল্লাহই তাদের মোকাবিলায় আপনার জন্য যথেষ্ট, আর তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।’ (সুরা আল-বাকারা : ১৩৭)। এই আয়াতে আরও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে-‘তারা যদি তোমাদের (হে সাহাবাগণ) মতো ইমান আনে, তবে তারা হিদায়াতপ্রাপ্ত হবে।’ কোরআন নিজেই সাহাবাদের ইমান, আকিদা ও দীনের উপলব্ধিকে হেদায়াতের মাপকাঠি হিসেবে ঘোষণা করেছে। এ কারণেই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাত বলেন, সাহাবায়ে কেরামের বুঝ, বিশ্বাস ও অনুসরণ সত্যের অন্যতম মানদণ্ড।
অতএব নবীগণের মর্যাদা রক্ষা এবং সাহাবায়ে কেরামের সম্মান অক্ষুণ্ন রাখা-উভয়ই কোরআনের শিক্ষা। নবীগণ আল্লাহর মনোনীত ও মাসুম রাসুল, আর সাহাবাগণ সেই রসুলের সর্বোত্তম ছাত্র ও দীনের বিশ্বস্ত বাহক। তাই তাঁদের সম্পর্কে শালীনতা, সম্মান ও সুধারণা বজায় রাখা ইমানের দাবি এবং কোরআন-সুন্নাহর নির্দেশ। নবীগণের মর্যাদা রক্ষা যেমন ইমানের অপরিহার্য দাবি, তেমনি সাহাবায়ে কেরামের সম্মান সংরক্ষণও ইসলামি আকিদা ও আদবের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
♦ লেখক : গবেষক, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বসুন্ধরা, ঢাকা