নায়ক নয় বরং গায়কই হতে চেয়েছিলেন জাফর ইকবাল। কিন্তু একসময় খ্যাতিমান চলচ্চিত্রকার খান আতাউর রহমান তাঁকে অনেকটা জোর করেই সিনেমায় নিয়ে আসেন। জাফর ইকবাল অভিনীত প্রথম সিনেমা ছিল ‘আপন পর’। এ নির্মাতার বিশ্বাস ছিল, ছেলেটি একদিন নামকরা অভিনয় শিল্পী হবে। পরবর্তীতে হলোও তাই। খান আতা নিবেদিত ‘আপন পর’ সিনেমাটি মুক্তি পেয়েছিল ১৯৬৯ সালের গণ অভ্যুত্থানের সময়। জাফর ইকবালের নায়িকা ছিলেন কবরী। সিনেমাটি দারুণ ব্যবসা সফল হয় তখন। এ সিনেমায় জাফর ইকবালের ঠোঁট মিলানো প্রখ্যাত গায়ক বশির আহমদের গাওয়া ‘যারে যাবি যদি যা, পিঞ্জর খুলে দিয়েছে, যা কিছু বলার ছিল বলে দিয়েছি’, দারুণ শ্রোতাপ্রিয় হয়। তবে এর আগের গল্পটা ১৯৬৬ সালের। পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায় চার তরুণ তোতা, মাহমুদ, ফারুক ও জাফর ইকবাল ‘র্যাম্বলিং স্টোন’ নামে একটি ব্যান্ড দল গঠন করেন। ঢাকার বিভিন্ন অভিজাত হোটেল ও ক্লাবগুলোতে এই শৌখিন ব্যান্ড দলের সদস্যরা ইংরেজি গান পরিবেশন করতেন। এ চারজনই মোটামুটি উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান ছিলেন এবং পরিবারের অন্য সদস্যরাও দেশে শিল্পসাহিত্যে ভূমিকা রেখে চলেছিলেন। এই চার তরুণের মধ্যে সবচেয়ে সুদর্শন, স্মার্ট আর স্টাইলিস্ট ছিলেন জাফর ইকবাল। এলভিস প্রিসলির ফ্যাশন দারুণভাবে প্রভাবিত করেছিল এ তরুণকে।
চোখে সানগ্লাস, স্টাইল করা চুল, হাতাকাটা গেঞ্জি পরে তিনি হয়ে উঠেছিলেন ইয়ং জেনারেশনের কাছে রীতিমতো ক্রেজ।
জাফর ইকবালের বড় ভাই আনোয়ার পারভেজ এবং ছোট বোন শাহনাজ রহমতুল্লাহ দুজনেই ছিলেন দেশবরেণ্য সংগীতশিল্পী। জাফর ইকবালের প্রথম প্লেব্যাক করা গান ছিল বদনাম ছবিতে। তাঁর ভাই আনোয়ার পারভেজ ছবিটির সুরকার ছিলেন। ছবিটির বিখ্যাত গান ছিল ‘হয় যদি বদনাম হোক আরও, আমি তো এখন আর নই কারও।’ গানটি সুপারহিট হয়েছিল। পরবর্তীতে সংগীতশিল্পী আলিফ আলাউদ্দিনের বাবা সুরকার আলাউদ্দিন আলী তাঁকে দিয়ে অসংখ্য চলচ্চিত্রে গান করিয়েছিলেন। তাঁর গাওয়া গানগুলোর মধ্যে সুখে থেকো ও আমার নন্দিনী হয়ে কারও ঘরনি, তুমি আমার জীবন আমি তোমার জীবন, এক হৃদয়হীনার কাছে হৃদয়ের দাম কী আছে, বিদেশ ঘুরে দেশে এলে সবাই বলে, ইত্যাদি তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। এ ছাড়া চলচ্চিত্রে তাঁর প্লেব্যাক করা আরেকটি কালজয়ী গান হচ্ছে- ‘ফকির মজনু শাহ’ চলচ্চিত্রের ‘পিরিতি পিরিতি আজও শিখলাম না সজনীগো পিরিতি আজও শিখলাম না’, দ্বৈত এই গানটিতে জাফর ইকবালের সঙ্গে কণ্ঠ দেন রুনা লায়লা। বাংলাদেশ টেলিভিশনের ২৫তম জন্মদিন উদ্যাপনের প্রধান আকর্ষণই ছিল-এক হৃদয়হীনার কাছে হৃদয়ের দাম কী আছে গানটি। আশির দশকের মাঝামাঝি জাফর ইকবালের একটি একক অডিও অ্যালবাম বের হয় ‘কেন তুমি কাঁদালে’ শিরোনামে।
তাঁর গানের প্রশংসা করে চিত্রনায়িকা ববিতা বলেছিলেন, ‘জাফর খুব ভালো ইংরেজি গান গাইতে পারতেন। গিটার বাজিয়ে তাঁর কণ্ঠে ইংরেজি গান শোনাটা আমাদের সময়কার যে কোনো মেয়ের জন্য স্বপ্নের একটি মুহূর্ত।’ সত্তর দশকের মাঝামাঝি ‘সূর্য সংগ্রাম’ ছবিতে ববিতার বিপরীতে প্রথম অভিনয় করেন তিনি। ছবিটির সিক্যুয়াল ‘সূর্যগ্রহণ’ চলচ্চিত্রেও ববিতার বিপরীতে অভিনয় করেন তিনি। ১৯৭৫ সালে মুক্তি পাওয়া ‘মাস্তান’ ছবির বদৌলতে ‘ড্যাশিং’ নায়কের পরিচিতি পান জাফর ইকবাল। তবে তিনি রোমান্টিক নায়ক হিসেবে পরিচিতি পান ‘নয়নের আলো’ সিনেমার মাধ্যমে।
স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ের রাগী, রোমান্টিক, জীবন-যন্ত্রণায় পীড়িত কিংবা হতাশা থেকে বিপথগামী তরুণের চরিত্রে তিনি ছিলেন পরিচালকদের অন্যতম পছন্দ। প্রায় ১৫০টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন জাফর ইকবাল। জাফর ইকবালের সঙ্গে নায়িকা ববিতার বন্ধুত্ব কিংবা প্রেম বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগৎকে সমৃদ্ধ করেছে। ববিতা নিজেই বলেছেন, ‘তাঁকে আমি ভালোবাসতাম। সেও আমাকে ভালোবাসতো।’ ববিতা আরও বলেন, ‘কিছু শিল্পীর অভিনয় খুব ভালো থাকে, কিছু অভিনয়শিল্পীর আবার অন্য গুণ থাকে কিন্তু ইকবালকে আমার সব কিছু মিলিয়ে ভালো লাগত। কমপ্লিট প্যাকেজ ছিল।’ উল্লেখ্য, তাঁরা দুজনেই জহির রায়হানের মতো বিখ্যাত পরিচালকের মাধ্যমে চলচ্চিত্রের শুরুটা করতে পেরেছিলেন। ১৯৯২ সালের ৮ জানুয়ারি মারা যান প্রতিভাবান শিল্পী জাফর ইকবাল।