সুন্দরবনের গভীরে অসহায় আর্তনাদই বাঁচিয়ে দিল একটি চিত্রা হরিণকে। শিকারিদের পাতা ছিটকা ফাঁদে আটকে দীর্ঘ সময় ধরে ছটফট করছিল প্রাণীটি। সেই শব্দ অনুসরণ করে ঘটনাস্থলে পৌঁছে বনকর্মীরা হরিণটিকে উদ্ধার করেন। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে আবারও বনের গভীরে অবমুক্ত করা হয় সেটিকে।
বৃহস্পতিবার বিকেলে সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের খুলনা রেঞ্জের কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশনের আওতাধীন সত্যপীর খাল এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। একই অভিযানে আশপাশ থেকে আরও ১২টি শিকারি ফাঁদ উদ্ধার করা হয়। তবে কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি। শুক্রবার কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশনের কর্মকর্তা নাসির উদ্দীন উদ্ধার অভিযানের ছবি নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে প্রকাশ করলে বিষয়টি সামনে আসে।
নাসির উদ্দীন বলেন, শব্দ অনুসরণ করে গিয়ে দেখি শিকারিদের পাতা ছিটকা ফাঁদে একটি হরিণ ঝুলছে। অনেকক্ষণ ধরে ছটফট করতে করতে প্রাণীটি প্রায় নিস্তেজ হয়ে পড়েছিল। দ্রুত ফাঁদ কেটে উদ্ধার করি। প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর অবমুক্ত করতেই সেটি দৌড়ে বনের ভেতরে চলে যায়।
তিনি জানান, প্যারালাল লাইন সার্চিং পদ্ধতিতে প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকাজুড়ে টহল ও তল্লাশি চালানো হয়। এ সময় হরিণটি উদ্ধারের পাশাপাশি আরও ১২টি ছিটকা ফাঁদ উদ্ধার করা হয়।
বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, সুন্দরবনে হরিণ শিকারে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় ছিটকা ফাঁদ। শক্ত দড়ি ও গাছের বাঁকানো ডাল দিয়ে এমনভাবে এই ফাঁদ তৈরি করা হয়, যাতে হরিণের পা আটকে গেলেই সেটি ওপরে ঝুলে যায়। প্রাণীটি যত বেশি মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করে, ফাঁস তত শক্ত হয়ে ওঠে।
এ ছাড়া শিকারিরা মালা ফাঁদও ব্যবহার করে। চিকন কিন্তু মজবুত দড়ির গোলাকার ফাঁস হরিণ চলাচলের পথে বসিয়ে রাখা হয়। দৌড়ে যাওয়ার সময় হরিণ সেই ফাঁদে আটকে পড়ে। বন কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এসব ফাঁদে শুধু হরিণ নয়, সুন্দরবনের অন্যান্য বন্য প্রাণীও শিকার হয়।
কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশনসংলগ্ন কয়রা উপজেলার মঠবাড়ি ও ৪ নম্বর কয়রা গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দা জানান, লোকালয় থেকে শাকবাড়িয়া নদী পার হলেই শুরু হয় গহিন সুন্দরবন। বনরক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে শিকারিরা দড়ি নিয়ে বনের ভেতরে প্রবেশ করে ফাঁদ পেতে রাখে। পরে ফাঁদে আটকে পড়া হরিণ জবাই করে বনের ভেতরেই মাংস টুকরা করা হয় এবং বিভিন্ন পথে লোকালয়ে এনে বিক্রি করা হয়।
সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা হাছানুর রহমান বলেন, শিকারিরা শুধু হরিণ নয়, সুন্দরবনের আরও অনেক বন্য প্রাণীকে ফাঁদে ফেলে। তাই সবাইকে অনুরোধ করব, বন্য প্রাণী শিকারে কোনো ধরনের সহায়তা করবেন না, হরিণের মাংস কিনবেন না এবং শিকারিদের আশ্রয় দেবেন না।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে বন্য প্রাণীর প্রজনন মৌসুম চলায় বনজীবী ও পর্যটকদের সুন্দরবনে প্রবেশ নিষিদ্ধ রয়েছে। এ সময় বন বিভাগের টহলও জোরদার করা হয়েছে। শিকারিদের ধরতে তথ্যদাতাদের জন্য পুরস্কারের ব্যবস্থাও রয়েছে। বনের ভেতরে হরিণ শিকারসংক্রান্ত তথ্য দিয়ে শিকারি ধরতে সহায়তা করলে ২০ হাজার টাকা এবং বনের বাইরে এমন তথ্য দিলে ১০ হাজার টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে।
বিডি প্রতিদিন/আশিক