প্রকৃতি কখনো কখনো এমন সব সৃষ্টি উপহার দেয়, যা দেখে মনে হয় কোনো দক্ষ শিল্পী অসংখ্য বছর ধরে ধৈর্য নিয়ে ভাস্কর্য নির্মাণ করেছেন। চীনের ইউনান প্রদেশে অবস্থিত শিলিন তেমনই এক অনন্য প্রাকৃতিক বিস্ময়। হাজার হাজার চুনাপাথরের সুউচ্চ স্তম্ভ নিয়ে গড়ে ওঠা এ অঞ্চলকে দূর থেকে দেখলে মনে হয়, যেন গাছের পরিবর্তে পাথর দিয়ে তৈরি এক বিশাল বন। এ অসাধারণ দৃশ্যের কারণেই এর নাম হয়েছে ‘স্টোন ফরেস্ট’ বা পাথরের বন।
বিজ্ঞানীদের মতে, প্রায় ২৭ কোটি বছর আগে এ অঞ্চল ছিল একটি অগভীর সমুদ্রের তলদেশ। দীর্ঘ সময় ধরে সেখানে চুনাপাথরের স্তর জমা হয়। পরবর্তী সময়ে ভূত্বকের পরিবর্তনে সমুদ্র সরে গেলে শিলাগুলো ভূপৃষ্ঠে উঠে আসে। এরপর লাখ লাখ বছর ধরে বৃষ্টির পানি, বাতাস এবং প্রাকৃতিক ক্ষয়ক্রিয়ার ফলে চুনাপাথর ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে সুচালো, খাঁজকাটা ও বিচিত্র আকৃতির স্তম্ভে পরিণত হয়। প্রকৃতির এই দীর্ঘ ভাস্কর্য নির্মাণের ফলই আজকের শিলিন।
এর ভূতাত্ত্বিক গুরুত্বের পাশাপাশি শিলিন জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যও সুপরিচিত। পাথরের স্তম্ভগুলোর মাঝখানে রয়েছে সবুজ বনাঞ্চল, ছোট ছোট জলাধার এবং নানান প্রজাতির উদ্ভিদ। আশপাশে বসবাসকারী সানি জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, লোকসংগীত ও ঐতিহ্য-এ অঞ্চলের পর্যটনকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। ফলে এখানে প্রকৃতি ও সংস্কৃতির এক চমৎকার মিলন ঘটেছে।
শিলিন প্রতি বছর বিশ্বের লাখো পর্যটককে আকর্ষণ করে। সরু পাথুরে পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে দর্শনার্থীরা বিভিন্ন আকৃতির স্তম্ভ দেখতে পান, যেগুলোর অনেকগুলোর সঙ্গে স্থানীয় লোককাহিনি জড়িয়ে আছে। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় আলো-ছায়ার খেলায় পাথরের বন আরও রহস্যময় ও মনোমুগ্ধকর হয়ে ওঠে। ভূতত্ত্ববিদ, আলোকচিত্রী এবং প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে এটি একটি স্বপ্নের গন্তব্য।
এই অনন্য প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্ব বিবেচনা করে ২০০৭ সালে ইউনেস্কো দক্ষিণ চীনের কার্স্ট ভূদৃশ্যের অংশ হিসেবে শিলিনকে বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা প্রদান করে। তবে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণের চ্যালেঞ্জও বেড়েছে। প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা, বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ এবং দায়িত্বশীল পর্যটন নিশ্চিত না করলে এমন অমূল্য সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
শিলিন আমাদের শেখায়, প্রকৃতির সবচেয়ে সুন্দর শিল্পকর্ম তৈরি হয় সময়, ধৈর্য এবং প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। তাই পৃথিবীর এই অনন্য পাথরের বন শুধু পর্যটনের আকর্ষণ নয়, বরং পরিবেশ সংরক্ষণ, ভূতাত্ত্বিক ঐতিহ্য এবং প্রকৃতির প্রতি মানুষের দায়িত্ববোধের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক।
লেখক : পরিবেশ-জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়