গ্রামের সেই আদি রূপ, যা আমাদের শৈশব কিংবা কৈশোরের স্মৃতির পাতায় জমা হয়ে আছে, তা আজ আর সহজে চোখে পড়ে না। নগরায়ণ, শিল্পায়ন আর আধুনিকতার তীব্র গ্রাসে হারিয়ে যাচ্ছে সবুজের সেই চাদর। কিন্তু এর মধ্যেও কিছু ব্যতিক্রমী অঞ্চল এখনো প্রকৃতির আদিম রূপটি ধরে রেখেছে। বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার মতো সবুজ আর মনোরম পরিবেশ জিইয়ে রেখেছে। এমনই এক জনপদ ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার নয়নপুর গ্রাম। নামটির মতোই এর রূপ-সত্যিই নয়ন জুড়ানো সুন্দর। এই নয়নপুর গ্রামের একজন সাধারণ মানুষ হাফেজ রোকন উদ্দিন। আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ হলেও তাঁর চিন্তা ও উদ্যোগ কিন্তু একেবারেই অসাধারণ। নিজের চার বিঘা জমিতে তিনি গড়ে তুলেছেন স্থানীয় জাতের লটকনের এক বিশাল সমাহার, যেখানে কাজ করছেন লটকনের জাত উন্নয়নে। প্রথাগত কৃষির বাইরে গিয়ে একক প্রচেষ্টায় একটি বুনো ফলকে কীভাবে বাণিজ্যিক ও মানসম্মত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যায়, রোকন উদ্দিনের বাগানটি তারই উদাহরণ।
বাংলাদেশে লটকন চাষের ইতিহাসের সঙ্গে নরসিংদী জেলার নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। প্রায় ২৫০ বছর আগে থেকেই নরসিংদীর মানুষ লটকনের সঙ্গে পরিচিত। তবে শুরুতে এটি কেবল পাহাড়ি বা জঙ্গল এলাকার একটি সাধারণ ‘বুনো ফল’ হিসেবেই পরিচিত ছিল। গ্রামাঞ্চলে একে অনেকে ‘কানা টক’ বা ‘বুবি’ নামেও ডাকত। সে সময় এর কোনো বাণিজ্যিক কদর তো ছিলই না, বরং বনের ফল হিসেবে মানুষ অবহেলা করত।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কৃষকদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে শুরু করে। তারা বুঝতে পারেন যে লটকন চাষে উৎপাদন খরচ খুবই কম, কিন্তু এর লাভ অন্য অনেক প্রচলিত ফলের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। বিশেষ করে নরসিংদীর শিবপুর, বেলাব এবং রায়পুরা এলাকায় লটকনের ব্যাপক বাণিজ্যিক চাষ শুরু হয়। আর এর মাধ্যমেই বুনো ফলটি রূপান্তরিত হয় কৃষকের ভাগ্য বদলের অন্যতম প্রধান হাতিয়ারে। এই রূপান্তরের সবচেয়ে বড় মাইলফলকটি অর্জিত হয় ২০০৮ সালে। সে বছর থেকে নরসিংদীর লটকন ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হতে শুরু করে। যা ছিল এই ফলের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা। আজ লটকন কেবল নরসিংদীতে সীমাবদ্ধ নেই; এর পুষ্টিগুণ ও অর্থনৈতিক গুরুত্বের কারণে এখন সারা দেশেই কম-বেশি লটকনের চাষ হচ্ছে। তবে সমস্যা একটাই, বাণিজ্যিক সফলতার জন্য যে ধরনের ভালো ও উন্নত জাতের চারা প্রয়োজন, তা পাওয়া এখনো বেশ কঠিন। আর ঠিক এই সংকটটি দূর করতেই ভালুকার রোকন উদ্দিনের মতো উদ্যোক্তারা নিজেদের মতো করে সিলেকশন ও জাত উন্নয়নের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
হাফেজ রোকন উদ্দিনের বাগানটিতে ঢুকলে চোখ জুড়িয়ে যায়। বাড়ির পাশেই চার বিঘা জমিতে গড়ে তোলা এই বাগানে বর্তমানে প্রায় ২০০টি লটকন গাছ রয়েছে। গাছগুলোর বৈশিষ্ট্য হলো, এদের কাণ্ড থেকে শুরু করে ডালপালা পর্যন্ত থোকায় থোকায় লটকন ঝুলে থাকে। ইতোমধ্যে তিনি তাঁর বাগান থেকে প্রায় ২০-২৫ মণ লটকন বিক্রি করেছেন, যা স্থানীয় বাজারে বেশ ভালো দামে বিক্রি হয়েছে। রোকন উদ্দিনের সিলেকশন করা এই জাতের লটকনের স্বাদ নেওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। এর মিষ্টি ও ঈষৎ টক-মিষ্টির যে ভারসাম্য, তা সত্যি চমৎকার। রোকন উদ্দিনের বাগানে গাছ ভর্তি লটকন দেখছিলাম আর গাছ থেকে পাকা লটকন পেড়ে খাচ্ছিলাম। শুধু আমি নই, আমার সঙ্গীরা ও গ্রামের বেশ কয়েকজন। রোকন উদ্দিন আমাকে নিয়ে গেলেন তাঁর গ্রামেরই আরেক বাড়িতে, প্রায় শত বছরের পুরোনো লটকনের একটি মাতৃগাছ দেখাতে। প্রবীণ অথচ এখনো ফলবান গাছটি দেখে মন এক অদ্ভুত ভালো লাগায় ভরে ওঠে। একসময় আমাদের প্রতিটি গ্রামেই ‘জংলা’ বা গভীর অরণ্যের মতো একটা অংশ থাকত। সেখানে প্রাকৃতিকভাবেই লটকন গাছ জন্মাত। কালের বিবর্তনে সেই জঙ্গলগুলো কেটে সাবাড় করা হয়েছে, যার সঙ্গে হারিয়ে গেছে লটকনের প্রাচীন জিন ব্যাংক।
গত কয়েক দশকে লটকন দেশের কৃষি অর্থনীতিতে একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় ও উচ্চ লাভজনক ফসল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এর অর্থনৈতিক ও চাষাবাদসংক্রান্ত সুবিধাগুলো বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি প্রধান দিক দেখতে পাই। লটকন চাষের অন্যতম বড় সুবিধা হলো এর অত্যন্ত কম উৎপাদন খরচ। এই গাছের জন্য কোনো উচ্চমাত্রার রাসায়নিক সার বা অতিরিক্ত কীটনাশকের প্রয়োজন হয় না। একবার একটি লটকন গাছ রোপণ করে তা সঠিকভাবে বড় করতে পারলে, পরবর্তী ২০ থেকে ৩০ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে কোনো বড় ধরনের খরচ ছাড়াই ফলন পাওয়া যায়। লটকন গাছ মূলত ছায়াপ্রেমী। অন্য ফল গাছ যেখানে তীব্র সূর্যালোক খোঁজে, লটকন সেখানে বড় বড় গাছের ছায়ায়, বাড়ির আঙিনায় বা মিশ্র বাগানের ভিতরে অনায়াসেই বেড়ে ওঠে। ফলে জমির বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত হয়। কম বিনিয়োগে অধিক মুনাফা পাওয়ায় এটি দেশের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য একটি টেকসই ও স্থায়ী আয়ের উৎস হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে বছরের নির্দিষ্ট একটি সময়ে গ্রামীণ অর্থনীতিতে চাঙাভাব আনতে লটকন বড় ভূমিকা রাখছে। ভালুকার নয়নপুরের মতো দেশজুড়ে লটকনের এই বিপুল সম্ভাবনা যদি আমরা একটি সুসংহত শিল্পে রূপান্তর করতে চাই, তবে সনাতনী চাষপদ্ধতি থেকে বেরিয়ে এসে আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া লাগাতে হবে। এর জন্য সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর লটকনের জাত উন্নয়নে জোরালো ভূমিকা রাখতে পারে। রোকন উদ্দিনের মতো স্থানীয় উদ্যোক্তারা যে জাতগুলো সিলেকশন করছেন, সেগুলোকে ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করে বৈজ্ঞানিক উপায়ে অবমুক্ত করতে হবে, যাতে রোগবালাইমুক্ত এবং উচ্চ ফলনশীল জাত দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া যায়। লটকন চাষের সবচেয়ে বড় বাধা হলো ভালো চারার অভাব। সরকারি হর্টিকালচার সেন্টারগুলোর মাধ্যমে কলমপদ্ধতিতে উন্নত জাতের স্ত্রী-গাছের চারা উৎপাদন করে কৃষকদের মধ্যে সুলভ মূল্যে বিতরণের ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ বীজ থেকে হওয়া গাছে ফল আসতে সময় বেশি লাগে এবং অনেক সময় তা পুরুষ গাছ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, যা কৃষকের জন্য ক্ষতিকর। লটকনের ফলন পরবর্তী পরিচর্যা, ফল সংগ্রহ এবং রোগবালাই দমনে প্রান্তিক চাষিদের আধুনিক কারিগরি প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
লটকন একটি পচনশীল ফল। বেসরকারি উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসতে হবে এর দ্রুত ও আধুনিক বাজারজাতকরণ প্রক্রিয়ায়। কোল্ড স্টোরেজ বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবহনব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে পারলে দেশের এক প্রান্তের ফল অন্য প্রান্তে সতেজ অবস্থায় পৌঁছানো সম্ভব। লটকন দিয়ে জ্যাম, জেলি, জুস বা ক্যান্ডি তৈরির মতো প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে তুলতে হবে। বেসরকারি বড় বড় ফুড অ্যান্ড বেভারেজ কোম্পানিগুলো যদি লটকন প্রক্রিয়াজাতকরণে বিনিয়োগ করে, তবে মৌসুমের উদ্বৃত্ত ফল নষ্ট হওয়া থেকে বাঁচবে এবং কৃষকরা সারা বছরই ভালো দাম পাবেন। ২০০৮ সাল থেকে রপ্তানি শুরু হলেও তা এখনো একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ। বেসরকারি রপ্তানিকারকদের উচিত ইউরোপ, আমেরিকা ও দূরপ্রাচ্যের নতুন নতুন বাজার খোঁজা। এর জন্য আন্তর্জাতিক মানের ‘ফাইটোস্যানিটারি সার্টিফিকেট’ বা রোগমুক্তির সনদ নিশ্চিত করতে সরকারের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করতে হবে।
ভালুকার নয়নপুর গ্রামের হাফেজ রোকন উদ্দিন দেখিয়েছেন, কীভাবে নিজের ভিতরের তাড়না থেকে একটি ফসলের জাত উন্নয়নে অবদান রাখা যায়। গ্রামীণ পর্যায়ে এমন হাজারো রোকন উদ্দিন ছড়িয়ে আছেন, যাঁরা আমাদের কৃষির প্রকৃত নায়ক।
তবে ব্যক্তি উদ্যোগের একটি সীমাবদ্ধতা থাকে। আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি, সঠিক বিপণনব্যবস্থাপনা এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের প্রসার ঘটাতে না পারলে এই সম্ভাবনা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হতে পারে। লটকনকে যদি আমরা বাংলাদেশের সামগ্রিক কৃষি অর্থনীতিতে আরও বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তনের হাতিয়ার বানাতে চাই, তবে জাত উন্নয়নসহ বহুমুখী গবেষণা এবং এর উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ নিয়ে একটি সুপরিকল্পিত, দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। তবেই এ মাঠের ফসল কৃষকের ঘরে সমৃদ্ধি আনবে, আর আমাদের অর্থনীতি হবে আরও বেগবান ও টেকসই।
♦ লেখক : মিডিয়াব্যক্তিত্ব