শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ৭ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ৬ জানুয়ারি, ২০২০ ২৩:৩৪

বিশেষ সাক্ষাৎকার

এক বছরে সরকার গণতন্ত্রকে কবর দিয়েছে : মির্জা ফখরুল

মাহমুদ আজহার

এক বছরে সরকার গণতন্ত্রকে কবর দিয়েছে : মির্জা ফখরুল

বাংলাদেশের রাজনীতি এখন ‘ভয়ঙ্কর’ ফ্যাসিবাদের খপ্পরে পড়েছে বলে দাবি করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, দেশে এখন গণতন্ত্রের লেশমাত্র নেই। সব গণতান্ত্রিক ও সাংবিধাকি প্রতিষ্ঠান আজ ধ্বংসের মুখোমুখি। রাজনীতি এখন ক্ষমতাসীন দলের এক ব্যক্তি ও পরিবারকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। কার্যত, বাংলাদেশের রাজনীতি এখন ভয়ঙ্কর ফ্যাসিবাদের খপ্পরে। গত সোমবার বিকালে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। মির্জা ফখরুল বলেন, আজকে আমাদের দুর্ভাগ্য যে, এ দেশে একদিন স্বাধীনতা যুদ্ধ হয়েছিল, গণতান্ত্রিক চেতনাকে সামনে রেখে। সেই চেতনা আজ ভুলুণ্ঠিত। সরকার গত এক বছরে গণতন্ত্রকে কবর দিয়েছে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামোকেও ধ্বংস করেছে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান যেমন বিচারবিভাগ, নির্বাহী বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণ করা হয়েছে। এ থেকে উত্তরণে জনগণের একটি জবাবদিহি সরকার প্রয়োজন। এ জন্য গণতন্ত্রের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি দিতে হবে। সবার অংশগ্রহণে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের অধীনে ভোট দিয়ে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বর্তমান সরকারের এক বছরের শাসনামল মূল্যায়ন করতে গিয়ে বিএনপি মহাসচিব ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে নানা ব্যর্থতা ও দুঃশাসনের চিত্র তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রীর দুর্নীতিবিরোধী অভিযানকে ‘আইওয়াশ’ বলেও সমালোচনা করেন। অবশ্য দুই বছর ধরে কারাবন্দী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি না হওয়ায় নিজেদের ‘ব্যর্থতা’ও স্বীকার করেন।

বর্তমান সরকারের এক বছরের শাসনকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন এমন প্রশ্নে মির্জা ফখরুল বলেন, বর্তমান যে সরকার আছে তারা ‘বৈধ’ সরকার নয়। তারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার নয়। তাদের কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। তারা যে ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেনি, তা শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বই জানে। এ সরকারকে আমরা কখনই বৈধ সরকার হিসেবে স্বীকার করি না। তাদের এক বছরের শাসনে সমস্যার কোনো সমাধান হয়নি। দেশে সংকট আরও বাড়িয়েছে। রাজনৈতিক সংকট আরও বেড়েছে। এক বছরে গণতন্ত্র ও বিচার বিভাগকে ধ্বংস করা হয়েছে। অন্যান্য সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোও ধ্বংস করে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। একদলীয় শাসনকে পুরোপুরি পাকাপোক্ত করার জন্য তারা এক বছর ধরে কাজ করে যাচ্ছে। এ সরকার ক্ষমতায় টিকে আছে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে শুধু বন্দুকের জোরে। সরকার বলছে এক বছরে অনেক উন্নয়ন কাজ করেছে। অনেক মেগা প্রকল্প দৃশ্যমান। সরকারের এই উন্নয়নকে কীভাবে দেখেন? এমন প্রশ্নে সাবেক এই মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের মানুষের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বাস করা, একটি মুক্ত সমাজে বাস করা। সেই প্রজেক্ট থেকেইতো সরকার সরে এসেছে। নির্বাচন মানেই বাংলাদেশের মানুষ মনে করে, ভালো পরিবেশে উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট। একজন যোগ্য জনপ্রতিনিধিকে নির্বাচিত করতে চায়। সেই ব্যবস্থাও সরকার শেষ করে দিয়েছে। উন্নয়নের যেসব কথা সরকার বলছে, এগুলোর বাস্তবে কোনো ভিত্তি নেই। তারা জাতীয় প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর নামে ‘ডাহা মিথ্যা’ কথা বলছে। প্রবৃদ্ধিই যদি এত বেশি হবে তাহলে গার্মেন্ট শিল্প বন্ধ হয়ে যাচ্ছে কেন? বিদেশে জনশক্তি রপ্তানিতে ধস কেন। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ নেই কেন? কৃষি উৎপাদন নিম্নমুখী কেন? উন্নয়নের সব সূচক নিম্নগামী কেন?

প্রধানমন্ত্রীর দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের সমালোচনা করে মির্জা ফখরুল বলেন, এটাও একটা ‘আইওয়াশ’। এখন দুর্নীতি বন্ধ কেন? দুর্নীতি এখন সারা দেশে এমনভাবে ছড়িয়েছে যে, এটা হুটহাট করে কয়েকদিনেই বন্ধ করতে পারবে না সরকার। কারণ, এ সরকারের দুর্নীতি এখন অনেক গভীরে। এটা করতে গেলে থলের বিড়াল বেরিয়ে যাবে। কিন্তু সরকার দুর্নীতি নির্মূলের কথা বলে পরিস্থিতিকে ভিন্ন দিকে নিয়ে যাচ্ছে। নিজেরা সস্তা বাহবা পেতে চায়। তারা কাদের ধরেছে? সবতো চুনোপুঁটি। রাঘববোয়াল কাউকে কি ধরেছে? বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া দুই বছর ধরে জেলে। আইনি প্রক্রিয়ায় তার মুক্তি এখনো হয়নি। আপনারা রাজপথের আন্দোলন কর্মসূচিও দিচ্ছেন। কোনো সফলতা নেই কেন? এমন প্রশ্নে বিএনপির এই নেতা বলেন, আমরা আন্দোলন কর্মসূচি পালন করছি। রাজপথে লড়ছি। কিন্তু রাষ্ট্রীয় জুলুম নির্যাতনে আমরা আন্দোলনে সফল হতে পারছি না-এটা সত্যি। কারণ, ফ্যাসিবাদী ও স্বৈরাচার রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে আমাদের আন্দোলন কর্মসূচিতে বাধা দিচ্ছে। আমাদের অন্তত ৫ লাখ নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে প্রায় ৩৫ লাখ মামলার বোঝা। তারপরও আমরা আইনিভাবে লড়ছি। কিন্তু একটি রাষ্ট্রের সঙ্গে ফ্যাসিবাদী সরকার থাকলে তখন গণতান্ত্রিক দলের জন্য সবকিছুই জটিল হয়ে পড়ে। সেই কারণে এখন পর্যন্ত বেগম জিয়াকে মুক্ত করার জন্য রাজনৈতিক সফলতা অর্জন করতে পারিনি। তবে বেগম জিয়া ও গণতন্ত্র মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত এ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন চলবে। এক্ষেত্রে সাংগঠনিক কোনো ব্যর্থতা আছে কিনা জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল বলেন, আমি মনে করি, এক্ষেত্রে সাংগঠনিক ব্যর্থতা বিন্দুমাত্র নেই। এ ধরনের স্বৈরাচারী সরকার ও রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করার সরকারের শাসনামলে সংগঠন খুব একটা মুখ্য নয়। পৃথিবীর ইতিহাসে খুব কম আছে একটি ফ্যাসিবাদী সরকারের সঙ্গে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল খুব সহজে লড়াই করতে পারে-তা মনে করার কোনো কারণ নেই।

বিএনপি কি এখন ঐক্যবদ্ধ? দলের নেতৃত্ব কীভাবে চলে- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, বিএনপি অবশ্যই ঐক্যবদ্ধ। আমাদের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া যখন জেলে যান, তখন অনেকেই মনে করেছিলেন, বিএনপি ভেঙে যাবে। বিএনপির অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে। কিন্তু তা হয়নি। আমরা এখন যা কিছু সিদ্ধান্ত নেই, সবই যৌথভাবে নেওয়া হয়। এখানে একক কারও সিদ্ধান্তে বিএনপি চলে না। লন্ডন থেকে আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রতি সপ্তাহেই স্থায়ী কমিটির সঙ্গে নীতিনির্ধারণী বৈঠক করেন। এ ছাড়াও বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের সব শীর্ষ নেতার সঙ্গে শলাপরামর্শ করেই নানা কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়।

একটা উদ্যোগও যৌথ সিদ্ধান্তের বাইরে হয় না। আর বিএনপি নেতৃত্ব সংকটে নেই। সংকট মূলত রাজনৈতিক ও এ সরকারের। বিএনপিতে নেতৃত্ব সংকট এটা গণমাধ্যমের সৃষ্টি। কিন্তু আওয়ামী লীগ যে গণতন্ত্রসহ সব ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে তাদের নিয়ে গণমাধ্যম খুব একটা বলতে চায় না। ঢাকার দুই সিটিতে মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থী দিয়েছেন। কীভাবে দেখছেন সিটি ভোট। এমন প্রশ্নে বিএনপি মহাসচিব বলেন, নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও আমরা বেগম জিয়া ও গণতন্ত্রের মুক্তি আন্দোলনের অংশ হিসেবে সিটি ভোটে অংশ নিয়েছি। আমাদের জোর করে হারিয়ে দেওয়া হবে সেটাও আমরা আশঙ্কা করছি। ভোটের শুরুতেই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই। নির্বাচন কমিশনের চোখের সামনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আমাদের একজন কাউন্সিলর প্রার্র্থীকে গ্রেফতার করেছে। প্রতিনিয়ত বিএনপির প্রার্থীদের হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছে। প্রচারণার সময় না হলেও আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থীরা ঠিকই প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। এগুলো নির্বাচন কমিশন দেখেও দেখে না, শুনেও শুনে না।  সিটি ভোটে ইভিএম ব্যবহার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমাদের বক্তব্য স্পষ্ট। এটা বাতিল করতে হবে। নির্বাচন কমিশন ইভিএমের মাধ্যমে ডিজিটাল পদ্ধতিতে নিঃশব্দ ভোট কারচুপির ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে। তারপরও রাজধানীর ভোটারদের বলব, আপনাদের যে কোনো পরিস্থিতিতে ভোটকেন্দ্রে যেতে হবে। যে কোনো প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়ে আপনাদের অধিকার প্রয়োগ করতে হবে। আমরা দেশবাসীকে সঙ্গে নিয়ে আপনাদের সঙ্গে আছি। ভোটের ফলাফল হাতে না পাওয়া পর্যন্ত আমরা লড়ে যাব। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব বলেন, আমাদের দলের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান একজন স্বাধীনতার ঘোষক। রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা। বিএনপি একটি মুক্তিযোদ্ধাদের দল। সেই হিসেবে বিএনপির ওপর দায়িত্বও আছে। আমরা আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করব, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সফলভাবে পালন করার।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর