মঙ্গলবার, ৯ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০ টা

সীমাহীন নৈরাজ্য গ্যাসের গাড়িতেও বাড়তি ভাড়া

মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর পণ্য পরিবহন ধর্মঘট স্থগিত

নিজস্ব প্রতিবেদক

রাতারাতি রাজধানীর সব ধরনের বাস তেলচালিত হয়ে গেল। গতকাল ঢাকার বিভিন্ন রুট ঘুরে কোথাও একটি গ্যাসচালিত বাসও পাওয়া যায়নি। ভাড়া আদায়ের সময় সব বাসের ড্রাইভার, কন্ডাক্টর ও হেলপারই দাবি করেছেন যে তাদের বাস তেলে চলে। কবে থেকে তেলে চলে- এ প্রশ্নে কেউ কোনো উত্তর দেননি। ফলে তারাও বাড়তি ভাড়া আদায় করছেন যাত্রীদের থেকে। বিষয়টি নিয়ে সব বাসেই স্টাফদের সঙ্গে যাত্রীদের ঝগড়াঝাঁটি হয়েছে। কোথাও কোথাও হয়েছে হাতাহাতি।

তিন দিন ধর্মঘটের পর সরকারের সঙ্গে বাস মালিকদের বৈঠকে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বর্ধিত ভাড়ায় পুরোদমে গাড়ি চলতে শুরু করেছে। রাজধানীর বিভিন্ন রুটে লোকাল বাসে সিদ্ধান্তের চেয়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ করেছেন অধিকাংশ যাত্রী। ভাড়া নিয়ে পুরো দিনের চিত্র ছিল একরকম নৈরাজ্যিক। বাসের সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা এবং মিনিবাসে ৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়। সরকার সে অনুযায়ী প্রজ্ঞাপনও জারি করে। কিন্তু অনেক বাসই তা মানছে না। বরং বলছে ভাড়ার তালিকা তৈরি হলে ভাড়া আরও বাড়বে।

গ্যাসে চালিয়েও ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছে লেগুনা বা হিউম্যান হলারগুলো। তুলনামূলক কম দূরত্বে চলা লেগুনাগুলো শতভাগ গ্যাসে চালিত। ফার্মগেটের ইন্দিরা রোডে মোহাম্মদপুর ও জিগাতলায় যাওয়ার লেগুনাগুলো সারি ধরে দাঁড়িয়ে। মোহাম্মদপুরের ভাড়া আগে ছিল ১০ টাকা। সেগুলো করা হয়েছে ১৫ টাকা। রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, গুলিস্তান, আজিমপুর, রামপুরা, মোহাম্মদপুর, বাড্ডাসহ আরও কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, স্বল্প দূরত্বের ক্ষেত্রে আগের তুলনায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। এসব রুটে তেলবাহী বাসে সর্বোচ্চ ২৭ শতাংশ ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। অধিকাংশ রুটের বাসে পুরনো ১০ টাকা ভাড়ার স্থলে ১৫ টাকা নেওয়া হচ্ছে। কোথাও কোথাও ২০ টাকা পর্যন্ত আদায় করছেন হেলপাররা। তারা বলছেন, ‘সিদ্ধান্ত হলেও এখন পর্যন্ত নতুন ভাড়ার তালিকা করা হয়নি। বাস মালিকরা যেভাবে ভাড়া নিতে বলেছেন আমরা যাত্রীদের থেকে সেভাবেই ভাড়া আদায় করছি।’ তেলচালিত গাড়ির সঙ্গে সিএনজিচালিত বাসেও বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে সব রুটে। বাস চালক ও হেলপাররা তাদের গাড়ি সিএনজিচালিত এ বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। চালকদের সঙ্গে কথা বললে কেউই বিষয়টি স্বীকার করতে চাননি। যাত্রীদের বলছেন, তাদের তেলের গাড়ি। কিন্তু গাড়ির পেছনের অংশে নিচে সিএনজি সিলিন্ডার (বোতল) দেখা গেছে এসব বাসের। রাজধানীর জুরাইন-উত্তরা রুটে একাধিক বাসে এমন চিত্র দেখা যায়।

যাত্রাবাড়ী থেকে টঙ্গী রুটে চলাচলকারী তুরাগ পরিবহনের বেশ কয়েকটি বাস সিএনজিচালিত হলেও যাত্রীদের থেকে বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া যাত্রাবাড়ী-গাবতলী রুটে ৮ নম্বর, উত্তরা রুটে রাইদাসহ কয়েকটি সিএনজিচালিত বাসেও নেওয়া হচ্ছে বাড়তি ভাড়া। অরাজকতা বেশি রাইদায়। তারা যেখানে আগে ১০ টাকা নেওয়া হতো, প্রতিটি কাউন্টারে ৫ টাকা ভাড়া বৃদ্ধি করে ১৫ টাকা আদায় করছে। অথচ রাইদার সব গাড়িই সিএনজিচালিত। তবে চালকদের সঙ্গে কথা বললে কেউ বিষয়টি স্বীকার করতে চাননি। কিন্তু গাড়ির পেছনের অংশে নিচে সিএনজির বোতল দেখা যায়। একাধিক চালক-হেলপারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, যাত্রাবাড়ী থেকে টঙ্গী পর্যন্ত আগের ভাড়া ছিল ৪৫ টাকা। এখন ৭০ টাকা রাখা হচ্ছে। কোনো কোনো গাড়ির চালক-হেলপার দাবি করেন ৬৫ টাকা রাখছেন তারা।

রাইদা পরিবহনের একটি বাসের ভাড়া আদায়কারী মিজানুর বলেন, ‘মালিকের কথামতো রাতেই ভাড়া নির্ধারণ করা হইছে। সেই অনুযায়ী আমরা ভাড়া চাইতেছি। কিন্তু যাত্রীরা বাড়তি ভাড়া দিতে চায় না। চাইলে বকাবাজি করে।’ যাত্রী আরিফুল হক বলেন, ‘বাড্ডা থেকে গুলিস্তান ভাড়া হওয়ার কথা ছিল ১০ থেকে ১২ টাকা, কিন্তু আগেই ২০ টাকা নেওয়া হতো। এখন তার সঙ্গে আরও ১০ টাকা যোগ হয়েছে।’ বাসযাত্রীর অনেকেই বাড়তি ভাড়া দিতে রাজি হচ্ছেন না। ফলে অনেক জায়গায় বাসকর্মীদের সঙ্গে তাদের বিতন্ড কিংবা হাতাহাতিও ঘটছে।

পণ্য পরিবহন  ধর্মঘট স্থগিত : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আশ্বাসে পণ্য পরিবহন ধর্মঘট স্থগিত করেছেন ট্রাক-কাভার্ডভ্যান মালিকরা। গতকাল রাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে মালিক সংগঠনের নেতারা বিভিন্ন দাবি তুলে ধরেন। মন্ত্রীর আশ্বাসে তারা পণ্য পরিবহনের ধর্মঘট স্থগিত করেন। বৈঠক শেষে গণমাধ্যমকে এসব তথ্য জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। মন্ত্রী জানান, ডিজেলের দাম বাড়ানোর কারণে গণপরিবহন, পণ্য পরিবহন, নৌপরিবহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গণপরিবহন ও নৌ-পরিবহনের সঙ্গে সমঝোতা হয়েছে। তাদের প্রথম দাবি ছিল জ্বালানির দাম কমাতে হবে, বৃদ্ধি করা যাবে না। আমরা মনে করেছি তাদের দাবি যৌক্তিক। আমরা অনুরোধ করেছি তাদের সঙ্গে বসে ভাড়া নির্ধারণ করা হবে। এ পরিপ্রেক্ষিতে এখন থেকেই ধর্মঘট স্থগিত করা হবে। এরপর তাদের সঙ্গে বৈঠক করে সিদ্ধান্তের পর চূড়ান্তভাবে ধর্মঘট প্রত্যাহার হবে। বৈঠকে জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব, সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, মালিক ও শ্রমিক নেতারা উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ডভ্যান ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি রুস্তম আলী খানের নেতৃত্বে মালিক-শ্রমিক নেতারা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।

সর্বশেষ খবর