আর্কটিক অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি জোরদার করতে গ্রিনল্যান্ডে নতুন তিনটি সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়ে ডেনমার্কের সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েক মাস ধরে চলা এই উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক আলোচনায় গ্রিনল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলে ঘাঁটি নির্মাণের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে রাশিয়া ও চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলার কৌশল হিসেবে এই উদ্যোগকে দেখা হচ্ছে। পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলে নজরদারি ও সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।
এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেছিলেন। জানুয়ারিতে তিনি বলেছিলেন, রাশিয়া ও চীনের প্রভাব ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের “গ্রিনল্যান্ডের মালিক হওয়া উচিত”। তিনি আরও ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, বিষয়টি “সহজ উপায়ে” না হলে “কঠিন উপায়ে”ও হতে পারে। এ মন্তব্যে ইউরোপজুড়ে কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয় এবং ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের নেতারা তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান।
তবে সাম্প্রতিক আলোচনায় জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার কোনো প্রসঙ্গ নেই বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো। বরং ওয়াশিংটন ও কোপেনহেগেন বিদ্যমান নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যেই সমঝোতার চেষ্টা করছে।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা চলছে, যদিও বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি। এক মার্কিন কর্মকর্তা বিবিসিকে বলেন, আলোচনা “ইতিবাচক পথে এগোচ্ছে” বলে তারা আশাবাদী।
ডেনমার্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও আলোচনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে, তবে সংবেদনশীলতার কারণে বিস্তারিত জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
কূটনৈতিক সূত্র অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি প্রস্তাব দিয়েছে যাতে নতুন ঘাঁটিগুলোকে বিশেষ প্রশাসনিক মর্যাদা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। ঘাঁটির সংখ্যা ও অবস্থান ভবিষ্যতে পরিবর্তনও হতে পারে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, এসব ঘাঁটি মূলত উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলে রাশিয়া ও চীনের সামুদ্রিক তৎপরতা নজরদারির কাজে ব্যবহার করা হবে। বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে গ্রিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যের মধ্যবর্তী কৌশলগত সামুদ্রিক করিডর ‘জিআইইউকে গ্যাপ’-এ।
সম্ভাব্য স্থানগুলোর মধ্যে নারসারসুয়াকের নাম আলোচনায় রয়েছে। সেখানে আগে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক ঘাঁটি ও বিমানবন্দর ছিল। বিশ্লেষকদের মতে, পুরোনো অবকাঠামো ব্যবহার করা হলে নতুন ঘাঁটি দ্রুত ও কম ব্যয়ে গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
বর্তমানে গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সক্রিয় ঘাঁটি রয়েছে—পিটুফিক স্পেস বেস। শীতল যুদ্ধের সময় সেখানে প্রায় ১৭টি মার্কিন সামরিক স্থাপনা ছিল। বর্তমানে এটি ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কতা ও মহাকাশ নজরদারির কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।
বিবিসির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আলোচনার নেতৃত্ব দিচ্ছেন মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মাইকেল নিডহ্যাম। তাঁর লক্ষ্য হলো এমন একটি সমঝোতা তৈরি করা, যা যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থ পূরণ করবে এবং একই সঙ্গে ডেনমার্কের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা উদ্বেগও বিবেচনায় রাখবে।
আর্কটিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া ও চীনের উপস্থিতি বাড়ায় এই অঞ্চল এখন বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার কেন্দ্র হয়ে উঠছে। তবে কিছু সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা মনে করেন, মিত্র দেশগুলোর ওপর প্রকাশ্য চাপ না দিয়েও কূটনৈতিকভাবে একই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব ছিল।
বিডি-প্রতিদিন/এআইএস