শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ৩ মে, ২০১৮ ০০:০০ টা
আপলোড : ৩ মে, ২০১৮ ০২:১৪

মা ও দুই মেয়ের লাশ

জেসমিনের বুকে পেটে ১২ আঘাত ভিন্ন সন্দেহ

নিজস্ব প্রতিবেদক

জেসমিনের গলা ও দুই হাতে কব্জির কাছে কাটা ছিল। বুকে, পেটে ছিল অন্তত ১২টি আঘাতের চিহ্ন। তার বড় মেয়ে হিমির পেটে তিনটি আঘাত ছিল। বাঁ হাতের কব্জির কাছেও কাটা ছিল। আর ছোট মেয়ে হানির পেটে একটি এবং ডান হাতের কব্জির কাছে আরেকটি ক্ষত ছিল। দুই বোনেরই ছিল গলা কাটা। জেসমিনের দেহের আঘাতের ধরন পুলিশকে ভাবিয়ে তুলেছে।

সৃষ্টি হয়েছে সন্দেহ। ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকরাও বলছেন একই কথা। তারা বলছেন, একা কীভাবে সম্ভব যে নিজের দুটো হাত কেটে আবার নিজের পেটে, বুকে, গলায় ১২ বার ছোরা বসাবে! এসব নিয়ে নতুন করে রহস্য সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিশ্লেষণে প্রথম দিকে পুলিশের ধারণা ছিল, জেসমিন আক্তার তার দুই মেয়েকে হত্যার পর নিজেই আত্মঘাতী হয়েছেন। কিন্তু মঙ্গলবার ময়নাতদন্তের পর আঘাতের ধরন দেখে পুলিশ আগের অবস্থান থেকে সরে এসেছে। এ ঘটনায় অন্য কারও উপস্থিতি রয়েছে কি না পুলিশ এখন সেই তদন্ত শুরু করেছে। ঢাকার মিরপুরের পাইকপাড়ায় সরকারি কলোনির একটি বাসা থেকে সোমবার রাতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কর্মী জেসমিন আক্তার (৩৫) এবং তার দুই সন্তান হাফিদা তাসলিম হিমি (৯) ও আবিলা তাহমিম হানির (৬) রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ঢাকার মিরপুরে এক নারী ও তার দুই শিশুসন্তানের লাশ উদ্ধারের ঘটনায় পুলিশ মায়ের আত্মহত্যার সন্দেহের কথা বললেও ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক বলেছেন, আঘাতের ধরনগুলো তার কাছে ‘ব্যতিক্রমধর্মী’ বলে মনে হয়েছে।

মঙ্গলবার মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। তবে থানায় এখনো মামলা হয়নি। ময়নাতদন্ত শেষে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. এ এম সেলিম রেজা বলেন, আঘাতের ধরনগুলো তার কাছে ‘ব্যতিক্রমধর্মী’ বলে মনে হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আঘাতগুলো একটু অন্য ধরনেরই। সাধারণভাবে আমরা যে ধরনের পাই, এর চেয়ে একটু ব্যতিক্রমধর্মী বটে।’

এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের সরাসরি কোনো উত্তর না দিয়ে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক এ এম সেলিম রেজা বলেন, তিনজনের মৃত্যুর সঠিক কারণ কী তা সব পরীক্ষা শেষ হলে চূড়ান্ত প্রতিবেদনে তারা জানাতে পারবেন। তিনি জানান, তিনজনকে বিষ খাওয়ানো হয়েছিল কি না তা জানতে পুলিশের অনুরোধে তারা ভিসেরা সংরক্ষণ করেছেন। আঘাতের ধরন ‘ব্যতিক্রমধর্মী’ বলে আসলে কী বোঝাতে চাইছেন—এমন প্রশ্নে এই চিকিৎসক বলেন, ‘সাধারণত এ রকম ক্ষেত্রে একটি আঘাত থাকে। এখানে বেশ কতগুলো আঘাত সারা শরীরে রয়েছে, এমনকি বাচ্চাগুলোরও।’ জেসমিনের স্বামী হাসিবুল ইসলাম চাকরি করেন সংসদ সচিবালয়ে। তিনি পুলিশকে বলেছেন, সোমবার কর্মস্থল থেকে বাসায় ফিরে তিনি শোয়ার ঘরের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ পান। পরে ডাকাডাকি করে সাড়া না পেয়ে দরজা ভেঙে ঢুকে তিনজনের মৃতদেহ দেখতে পান। ওই পরিবারের সদস্যদের বরাত দিয়ে ডিএমপির মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার মাসুদ আহমেদ বলেন, মাইগ্রেনের সমস্যার কারণে আর মায়ের মৃত্যুর পর জেসমিন হতাশায় ভুগছিলেন। ২৫ দিন আগে তিনি মেয়েদের অতিরিক্ত ঘুমের বড়ি খাওয়ানোর চেষ্টা করেন। পরে পরিবারের সদস্যরা টের পেয়ে এক মেয়েকে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে তোলেন।

তবে জেসমিন সন্তানদের মেরে নিজে আত্মহত্যা করে থাকতে পারেন—পুলিশের এমন ধারণা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন তার ছোট ভাই শাহীনুর ইসলাম। সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘একাই কীভাবে সম্ভব যে নিজের দুটো হাত কেটে আবার পেটে, গলায় কেটেছেন? ভাগ্নি দুজনেরই হাত কাটা, গলা কাটা। বিষয়টা বুঝতে পারছি না। আপা নিজে করেছেন, না অন্য কিছু?’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, দরজা ভেঙে যে ঘর থেকে তিনজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে, সেই ঘরে বাইরে থেকে ছিটকিনি লাগানোর সুযোগ নেই। আবার ভিতর থেকে ছিটকিনি লাগিয়ে বাইরে বের হওয়ারও সুযোগ নেই।

শাহীন বলেন, মাইগ্রেনের জন্য ভারতে গিয়ে চিকিৎসা নিয়েছিলেন জেসমিন। ফেরার পর পুরোপুরি সুস্থ থাকলেও তার ঘুম বেশি হতো। দুপুরে অফিস থেকে ফিরে মেয়েদের নিয়ে তিনি নিজের ঘরে শুয়ে পড়েছিলেন। তখন বাসায় ছিলেন শাহীন আর তাদের এক মামাতো বোন। জেসমিনের স্বামী হাসিবুল ছিলেন অফিসে। বোন ফেরার পর শাহীন নিজেও একটি কাজে বাইরে চলে যান বলে সাংবাদিকদের জানান।

তিনি বলেন, সন্ধ্যার দিকে বাসায় ফেরার পর তিনি জেসমিনের ঘরের দরজা ভিতর থেকে লাগানো দেখতে পান। তবে আগে কখনো বোনকে তিনি দরজা ভিতর থেকে আটকে ঘুমাতে দেখেননি। শাহীন বলেন, ‘আমি আসার আগে দুলাভাই একবার দরজা ধাক্কা দিয়েছিলেন। কিন্তু না খোলায় মনে করেছিলেন, ঘুমাচ্ছে যখন বিরক্ত করার দরকার নেই। পরে মাগরিবের সময় তিনি মসজিদে চলে যান।’ তিনি বলেন, সন্ধ্যার পর অনেক ধাক্কাধাক্কি করেও সাড়া না পাওয়ায় তাদের সন্দেহ হয়। হাসিবুল নামাজ শেষে ফিরলে দরজা ভাঙার চেষ্টা করা হয়। একপর্যায়ে দরজা কিছুটা ফাঁক করে সেখান দিয়ে ভিতরে উঁকি দিয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় বড় মেয়েকে দেখেন হাসিবুল। তখন রড দিয়ে দরজা ভেঙে তিনজনকে মৃত অবস্থায় পান তারা।

ময়নাতদন্ত শেষে জেসমিন আর তার দুই সন্তানের মরদেহ পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় গ্রামের বাড়িতে তাদের দাফন করার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

দারুস সালাম থানার ওসি সেলিমুজ্জামান গতকাল বলেন, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কেউ থানায় মামলা করেনি। তবে পুলিশ ইতিমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে।


আপনার মন্তব্য