শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৫ জুন, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৫ জুন, ২০২১ ০০:০০

চায়ের আড্ডায় খুলে গেল খুনের রহস্য

মির্জা মেহেদী তমাল

চায়ের আড্ডায় খুলে গেল খুনের রহস্য
Google News

নড়াইলের লোহাগড়ার বাসিন্দা আমিরুল ইসলাম টনিক। দীর্ঘদিন ছিলেন মধ্যপ্রাচ্যে। ভালো অর্থ উপার্জন করে দেশে ফিরে স্থায়ী হয়েছেন বাড়িতে। ব্যবসা করবেন বলে ১৮ লাখ টাকা দিয়ে একটি গাড়ি কিনেন তিনি। ব্যবসা তার ভালোই চলছিল। ব্যবসা প্রসারের চিন্তা করে তিনি আরও একটি গাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত নেন। গাড়ি কেনার জন্য ব্যাংক থেকে ১২ লাখ টাকা তুলে বাসায় ফেরেন। সেদিন রাতে তার পাকা বাড়িতে ঘুমিয়ে ছিলেন টনিক। আচমকা হালকা শব্দে তার ঘুম ভেঙে যায়। ঘরে তিনি কাউকে দেখতে পান। তিনি চিনে ফেলেন। ‘তুই এখানে কী করিস’ বলেই তাকে তাড়া করেন। অজ্ঞাত ব্যক্তিটি ঘর থেকে দৌড়ে বাইরে চলে যায়। পিছু নেয় টনিক। হইচই শুনে লোকজন বেরিয়ে আসে। তারা চোর চোর বলে হাঁকডাক দিতে থাকে। কিন্তু যার ডাকে লোকজন ছুটে বাইরে এসেছে, সেই টনিকেরই কোনো খবর নেই। কোথায় টনিক? টনিককে খোঁজ করতে থাকে সবাই। কিছুক্ষণ পর কিছুটা দূরে খুঁজে পাওয়া যায়। মাথায় মারাত্মক জখম নিয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে আছে। তাকে তখনই ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় করে জেলা হাসপাতালে নেওয়া হয়। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে পাঠানো হয় খুলনায়।

আহত টনিককে তার মা প্রশ্ন রাখেন। চোর তো মনে হয় চিনেছ বাবা, কে এমন সর্বনাশ করল। আহত টনিক জবাব না দিয়ে বলেন, আগে সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরি মা। তারপর দেখ কী করি। কিন্তু দীর্ঘ ১৮ দিন ডাক্তার-নার্সদের সব চেষ্টা বিফল করে টনিক মারা যান। ঘটনাটি ২০১৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারির।

নিহতের পরিবারের পক্ষে থানায় খুনের মামলা দায়ের করেন টনিকের চাচাতো ভাই লাবু শেখ। যার খুনি-চোররা সবাই অজ্ঞাত। কিন্তু পুলিশ তদন্ত করে খুনিকে শনাক্ত করতে পারে না। টনিকের পরিবার বিচারের আশায় থানা পুলিশ করতে করতে হয়রান। দুই বছর পেরিয়ে যায়। মামলার তদন্তের ভার যায় পিবিআইতে। দায়িত্বপ্রাপ্ত তদন্ত কর্মকর্তার কাছে শুধু এতটুকুই তথ্য-চোর টনিকের পরিচিত হতে পারে, আর এ ভরসায় এদিক-সেদিক দৌড়াদৌড়ি করেন তিনি। পেরিয়ে যায় আরও একটি বছর। কোনোভাবেই রহস্যের কূলকিনারা করতে না পারা তদন্তকারী কর্মকর্তা একদিন আদালত পাড়ার একটি চায়ের দোকানে বসেন। ভিড় কমলে তদন্ত কর্মকর্তা কী মনে করে দোকানদারকে জিজ্ঞেস করেন তিন বছর আগের লোহাগড়ার কোনো খুনের বিষয়ে এখানে কোনো গল্প শুনেছেন কি-না।

দোকানদার স্মৃতি হাতরে বলার চেষ্টা করেন, কোনো এক মামলার আসামি আদালতে হাজিরা দিতে এসে মাঝে-মধ্যে তার দোকানে চা বিস্কিট খেতেন। সেই আসামি একদিন সতীর্থ একজনকে কথাচ্ছলে বলেছিলেন, তার জেলখানায় থাকাকালীন সেখানকার এক চোরের গল্প। সেই চোর চুরি করার সময় গৃহকর্তা তাকে চিনে ফেলায় হাতে থাকা দা দিয়ে কোপ মারে। কোপ খেয়েও তাকে তাড়া করে প্রায় ধরে ফেলেছিলেন।

চা দোকানির গল্পকে পুঁজি করেই ছুটতে থাকেন তদন্তকারী কর্মকর্তা। অনেক খোঁজাখুঁজির পর জেলখানার জামিনপ্রাপ্ত সেই ব্যক্তিকে পাওয়া যায়। তার বাড়ি অন্যত্র হলেও আনা হয় যশোরে। যদিও সে কোনোভাবেই টনিকের খুনের সঙ্গে জড়িত নয়, তবে জেল কর্মীদের সাহায্য নিয়ে শনাক্ত করা হয় তার গল্পের সেই চোরকে। সে অন্য একটি মামলায় জেলে আছেন এবং নাবালক। তার নাম টাবু শেখ। পুলিশ হতবাক। কী করে সম্ভব! এতো টনিকের আপন চাচাতো ভাই। আর টাবু শেখের আপন ভাই লাবু শেখ হলেন এই মামলার বাদী। পুলিশের কাছে তখন সব পরিষ্কার। কিন্তু এরপরেও সমস্যা দূর হয় না। টাবু শেখকে খুঁজে পেয়ে তদন্তে গোলমাল বেঁধে যায়। সন্দেভাজন টাবু শেখ নাবালক হওয়ায় তার রিমান্ড আর পাওয়া যায় না। ওদিকে লাবু শেখ তদন্তে অসহযোগিতা শুরু করেন। টনিকের মাও ধাঁধায় পড়ে যান। তিনি আদালতে গিয়ে বলেন, তার ছেলে হত্যায় পিবিআই শুধু শুধু তার পরিবারের লোকজনকে ফাঁসাচ্ছে। তদন্তকারী কর্মকর্তা অন্য পথে এগোন। খুঁজে বের করা হয় টাবু শেখের বন্ধু-বান্ধবদের। একে একে গ্রেফতার করা হয় চারজনকে। যারা সবাই আদালতে স্বীকার করেন, টনিকের ব্যাংক থেকে উঠানো ১২ লাখ টাকার জন্যই টাবু শেখসহ টনিকের ঘরে ঢুকেছিলেন। অবশেষে আসামিদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, টাবুর খাটের নিচ থেকে খুনে ব্যবহৃত দা-টি উদ্ধার করা হয়। আর এসব করতেই পেরিয়ে যায় আরও দুই বছর। ঘটনার তদন্ত শেষে এ বছরের চলতি মাসেই আদালতে জড়িতদের বিরুদ্ধে খুনসহ ডাকাতির অভিযোগ আনেন পিবিআইর কর্মকর্তা। আর এর মধ্য দিয়ে পাঁচ বছর পর উদঘাটন হয় ক্লু লেস খুনের এই ঘটনার রহস্য।