বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন, ২০২৪ ০০:০০ টা
কোরবানির পশু

গরুর অভাব নেই হাটে

নিজস্ব প্রতিবেদক

গরুর অভাব নেই হাটে

ঈদুল আজহার বাকি মাত্র তিন দিন। এরই মধ্যে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন হাটবাজার পশুতে ভরে গেছে। সবখানেই ক্রেতারা আসছেন, দরদাম করছেন। ব্যাপারীরা বলছেন, সরকারি ছুটি শুরু হলে বিক্রি বাড়বে।

খোঁজ নিতে গিয়ে ধারণা পাওয়া গেছে, প্রতিবারের মতো বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এবারও গরু-ছাগল আসতে শুরু করেছে রাজধানীর কোরবানির পশুর হাটগুলোয়। পছন্দের পশু ও দামের খোঁজখবরও নিতে শুরু করেছেন ক্রেতারা। পাইকাররা জানান, এবার তাদের খামারে যে পরিমাণ গরু আছে  তাতে সংকট হবে না। তবে খাদ্যের দাম বাড়ায় গরু লালনপালনে খরচ বেড়েছে। এতে গত বছরের চেয়ে এবার পশুর দাম তুলনামূলক বেশি হবে। রাজধানীর মেরাদিয়া হাটে দেখা গেছে, হাটটি মেরাদিয়া বাজার থেকে দক্ষিণ বনশ্রী মসজিদ মার্কেট পর্যন্ত বিস্তৃত। একই সঙ্গে আশপাশের প্রধান সড়কসহ বনশ্রী ও দক্ষিণ বনশ্রী আবাসিক এলাকার সব গলিতে পশু উঠেছে। হাটটি পশুতে ভর্তি। ব্যাপারীরা কেউ গরুকে খাবার, কেউ আবার ক্লান্ত শরীরে রাস্তার ধারে কিংবা পশুর জন্য আনা খাবারের বস্তার ওপরই ঘুমাচ্ছেন। ক্রেতাদের অনেকেই হাটে এসে কোরবানির পশু দেখছেন। দরদাম করছেন। ব্যাপারীরা টুকটাক বিক্রিও করছেন। তবে এখনো তেমনভাবে বেচাকেনা শুরু হয়নি। গতকাল দক্ষিণ বনশ্রীর বাসিন্দা আজগর আলী পরিবার নিয়ে আসেন গরু দেখতে। তিনি বলেন, ‘কোরবানির জন্য গরু কিনতে এসেছি। সামর্থ্যরে মধ্যে ছোট গরু কিনতে চাই। তবে দাম একটু বেশি মনে হচ্ছে। গত বছর যে গরু ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে এবার তা ৭০ হাজার চাচ্ছে।’ এদিকে গত সোমবার সন্ধ্যায় ঝিনাইদহ থেকে ট্রাকে কয়েকজন ব্যাপারী ২১টি গরু নিয়ে আসেন মেরাদিয়া হাটে। তাদের মধ্যে সাইদুল করিম নামে একজন তিন বছর বয়সি চারটি মাঝারি আকারের দেশি জাতের গরু নিয়ে এসেছেন। এর মধ্যে একটি গরু বিক্রি করেছেন ১ লাখ ২০ হাজার টাকায়। বাকিগুলোর দরদাম করেছেন, ভালো দাম পেলে বিক্রি করে দেবেন। উত্তরা ১০ নম্বর সেক্টর হাটটিতেও ট্রাক ভর্তি পশু আসতে দেখা গেছে। হাটটির বাঁশের খুঁটিতে সারিসারি গরু বেঁধে রাখতেও দেখা গেছে। টুকটাক বিক্রি হলেও এখনো সেভাবে জমে ওঠেনি। বিক্রেতারা বলছেন, অনেকে আসছেন, দেখছেন, দরদাম জিজ্ঞেস করে চলে যাচ্ছেন। গাবতলী পশুর হাটে দেখা গেছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কোরবানির পশু নিয়ে এসেছেন খামারি ও ব্যবসায়ীরা। বেশির ভাগ পশু এসেছে বগুড়া, গাইবান্ধা, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, মানিকগঞ্জ, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গাসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে। হাটে ক্রেতাসমাগম থাকলেও এখনো বেচাকেনা সেভাবে শুরু হয়নি।

বন্ধক জমি পেতে রাজাবাবুকে বিক্রি : লালমনিরহাট প্রতিনিধি জানিয়েছেন, জেলার হাতীবান্ধা উপজেলায় কোরবানির ঈদে বিক্রির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে রাজাবাবুকে। মেজাজি আর কালো কুচকুচে দেখতে রাজাবাবু। অপরিচিত কাউকে দেখলেই তেড়ে আসে। তখন শান্ত করতে দিতে হয় মালভোগ বা শবরী কলা। মালভোগ কলা রাজাবাবুর প্রিয় খাবার। রাজাবাবুর মালিক কৃষক শামিম ও তার স্ত্রী জানান, রাজাবাবুকে বিক্রি করে বন্ধকি জমি ফেরত নেবেন তারা। ফ্রিজিয়ান জাতের এ গরুটি কৃষক শামিম হোসেন তাঁর বাড়িতেই সন্তানস্নেহে পরম যতেœ লালনপালন করছেন তিন বছর ধরে। রাজাবাবু নামের ষাঁড়টির ওজন ১৮-২০ মণ। দাম ধরা হয়েছে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা। উপজেলার ফকিরপাড়া ইউনিয়নের ১ নম্বর বুড়াসারডুবী গ্রামের মৃত আছের আলীর ছেলে কৃষক শামিম হোসেন শখ করে একটি ছোট বাছুর কেনেন। তিন বছর ধরে রাজাবাবুকে পরম মমতায় তিল তিল করে নিজ বাড়ির টিনশেড ঘরে বড় করে তুলেছেন শামিম-লিপি দম্পতি।

বগুড়ায় ৩৫ লাখ টাকার বাংলার রাজা : বগুড়া প্রতিনিধি জানিয়েছেন, বগুড়ায় আকৃষ্ট করছে ৩৫ লাখ টাকা মূল্যের ষাঁড় বাংলার রাজা। ৪০ মণ ওজনের ষাঁড়টি মন কাড়ছে সবার। অস্ট্রেলিয়ান ফ্রিজিয়ান জাতের এ ষাঁড়টি দেখতে বগুড়ার শেরপুর পৌরশহরের হাজিপুরের আজিজুল ইসলাম শাওনের খামারে প্রতিদিন ভিড় করছে অসংখ্য মানুষ। খামারটি এখন দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে। তবে তাঁরা এ খামারটিকে নয়, বরং খামারে থাকা বাংলার রাজাকে দেখতে আসেন।

রাঙামাটিতে পাহাড়ি গরুর হাট : রাঙামাটি প্রতিনিধি জানান, রাঙামাটি থেকে প্রতিদিন ট্রাকে ঢাকা ও চট্টগ্রামে রপ্তানি করা হচ্ছে রাঙামাটির পশু। ব্যাপারীরা বলছেন, সমতলে পাহাড়ি গরুর দাম মেলে কয়েক গুণ। তাই স্থানীয় বাজারের চেয়ে রপ্তানিতে লাভ বেশি। রাঙামাটির কাপ্তাই, বরকল, লংগদু, বিলাইছড়ি, জুরাছড়ি বাঘাইছড়ি ও নানিয়ারচর উপজেলা থেকে প্রতিদিন আনা হচ্ছে শত শত পাহাড়ি গরু। তবে এসব গরু তোলা হচ্ছে না হাটে। ট্রাকে করে রপ্তানি করা হচ্ছে জেলার বাইরে। রাঙামাটি পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর জামাল উদ্দীন জানান, রাঙামাটি শহরে এবার পশুহাট বসানো হয়েছে মাত্র একটি। পৌরসভা থেকে ইজারা নিয়ে পৌর ট্রাক টার্মিনালে পশুর হাটটি বসানো হয়েছে। পাহাড়ি এলাকা থেকে প্রচুর গরু হাটে আসতে শুরু করেছে।

রাজস্ব হারাচ্ছে চসিক : চট্টগ্রাম প্রতিনিধি জানান, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) সব বাজার ইজারা হলেও ‘রহস্যজনকভাবে’ ইজারা হয় না ঐতিহ্যবাহী বিবিরহাট গরুর বাজার। নামমাত্র খাস কালেকশন হলেও রমরমা চাঁদাবাজিতে মেতেছেন স্থানীয় কাউন্সিলর ও তার অনুসারীরা। গরু ওঠানামায় চাঁদাবাজি এবং খাইন বাণিজ্যে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে চক্রটি। ফলে চসিক রাজস্ব হারালেও পকেট ভারী হচ্ছে কাউন্সিলরের। নিয়ম অনুযায়ী গরু বিক্রির পর বাজার কর্তৃপক্ষ শুধু হাসিল নেওয়ার নির্দেশনা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। গরু বাজারে প্রবেশ করানোর আগেই দিতে হচ্ছে টাকা। বড় ‘এক খাইন’ ৫০-৭০ হাজার এবং ছোটগুলো ৪০ হাজার। তবে কাউন্সিলরের দাবি, বিদ্যুৎ বিল, ত্রেপাল খরচ বাবদ টাকা নেওয়া হচ্ছে। গরু ব্যাপারিদের সুবিধার্তে ম্যানেজ করা হচ্ছে। চসিকের স্থানীয় কাউন্সিলর মোবারক আলী বলেন, সিটি করপোরেশন টেন্ডার আহ্বান করেও গত ৬ জুন পর্যন্ত কোনো ইজারাদার পায়নি। এরপর ৯ জুন আমাকে তদারকি করে বাজারটি পরিচালনার জন্য বলা হয়েছে। এরপর বাজারে গরু রাখার জন্য ছয় দিনের জন্য বিদ্যুৎ, জেনারেটর ভাড়া নিয়েছি ১ লাখ ৪৫ হাজার টাকা দিয়ে। ডেকোরেটর্স থেকে ১০ দিনের জন্য ত্রিপল এনেছি ৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা দিয়ে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে গরু আনবে ব্যাপারি, সে গরু তো খোলা মাঠে রাখা যাবে না। ব্যবসায়ীদের সুবিধার জন্য এগুলো করা হয়েছে। তবে চসিকের খাস কালেকশনের দায়িত্বে থাকা আবদুর রাজ্জাক বলেন, সিটি করপোরেশ শুধু গরু বিক্রির পর হাসিল বাবদ টাকা আদায় করছেন। কারা খাইন বা খুঁটির জন্য টাকা আদায় করছেন তা আমার জানা নেই। অনেক খারাপ লোক আছে, হয়তো তারা নিচ্ছেন। 

ব্যবসায়ীরা জানান, গরুর গাড়ি বাজারে ঢোকার আগেই পাঁচশ-হাজার টাকা নেয় কাউন্সিলরের লোকজন। এরপর গরুর জন্য অগ্রিম টাকা দিয়ে নিতে হয় খুঁটি। একটি খাইনের জন্য দিতে হচ্ছে ৫০ হাজার টাকা করে।

সর্বশেষ খবর