শিরোনাম
প্রকাশ : ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ১৬:২৭
আপডেট : ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ১৬:৪৮
প্রিন্ট করুন printer

শাহীন রেজা নূর; মুক্তিযুদ্ধের উত্তারাধিকার ও আদর্শবান দুঃসাহসী যোদ্ধা

এফ এম শাহীন

শাহীন রেজা নূর; মুক্তিযুদ্ধের উত্তারাধিকার ও আদর্শবান দুঃসাহসী যোদ্ধা
এফ এম শাহীন

শাহীন রেজা নূর মোহগ্রস্ত মানুষদের ভিড়ে এক নির্মোহ ব্যক্তিত্ব। তিনি হৃদয় দিয়ে বাংলা, বাঙালি ও বাংলাদেশকে ধারণ করতেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ নির্মাণে শান্তির অন্বেষায় তাঁর নিরন্তর ছুটে চলার সাক্ষী আমরা অনেকেই। তার রাজনীতি ছিল মুক্তিযুদ্ধ কেন্দ্রিক। তাই স্বাধনতা বিরোধী অপশক্তির বিপক্ষে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছেন ভীষণ দুঃসসময়েও। ছিলেন প্রজন্ম একাত্তরের সভাপতি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে তিনি ছিলেন সোচ্চার কণ্ঠ। জীবনের ঝুকি নিয়ে স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির বিরুদ্ধে ছিলেন দুঃসাহসী কলম সৈনিক ও মাঠের লড়াকু যোদ্ধা। একাত্তরের ঘাতক, মানবাধিকারবিরোধীদের বিচারে সাক্ষ্য দিয়েছেন। প্রবল প্রতিরোধের মুখেও তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে এগিয়ে গেছেন ইতিহাসের দায় মোচনের জন্য। দেশে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের মশাল জ্বালিয়ে রাখার জন্য সম্মুখে থেকে লড়েছেন, দিয়েছেন নেতৃত্ব।  

একাত্তরের ঘাতক কসাই কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে যখন আমরা শাহবাগে জড় হয়ে অবস্থান করছি, শাহীন ভাই ছুটে এসেছেন। পরিচিত বন্ধু স্বজনদের আহ্বান করেছেন শাহবগে আসতে। আমাদের পাশে থেকে উৎসাহ অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। খবর রেখেছেন প্রতিটি মুহূর্তের। তারুণ্যকে মূল্যায়ন ও ধারণ করার যে সাহস ও ক্ষমতা তা সবার থাকে না যেখানে শাহীন রেজা নূর ব্যতিক্রম। একাত্তরের খুনি জামায়াত নেতা আলী আহসান মো. মুজাহিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে তিনি সাক্ষী ছিলেন। 

আমার মত অসংখ্য তরুণের তিনি ছিলেন অভিভাবক ও বন্ধু। যখনই তাঁর কাছে যেতাম প্রবল আনন্দ ও শক্তি নিয়ে ফিরে আসতাম। রবীন্দ্র, নজরুল,মধুসূদন কিংবা শেক্সপিয়ার কি ছিল না তাঁর ঝুলিতে, যেন বিশ্ব ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে গড়েছিলেন অন্যরকম সখ্য। এক নিমিষে মুগ্ধতায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা কিভাবে চলে যেত আড্ডায় তা লিখে বোঝানো সম্ভব নয়। আড্ডায় শাহীন ভাইয়ের প্রবেশ যেন সবার মধ্যে অন্যরকম সময়ে নিয়ে যেত। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাঁর আবেগ, আনন্দ- বেদনায় সিক্ত করতেন আমাদের। তাঁর স্নেহ ও ভালবাসার চাদরে যতটুকু উষ্ণতা পেয়েছি তা কখনোই ভুলে যাওয়ার না।    

কানাডায় চিকিৎসা গ্রহণের পর সবথেকে মনে হয় আমার সাথে বেশি কথা হয়েছে। দেশে ফিরে এসে একসাথে কত কাজ করারই না পরিকল্পনা ছিল তাঁর। সমকালীন রাজনীতি ও রাষ্ট্রকে নিয়ে বেশি কথা হত। দেশের কোন একটি খারাপ খবর শুনলেই ফোন করতেন। আমাদের করণীয় কি ভাবতে বলতেন। মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তরুণদের মধ্যে তুলে ধরতে তাঁর যে নিরন্তর চেষ্টা সে কথা বলে শেষ করা যাবে না। বঙ্গবন্ধুর শতবর্ষ ও স্বাধীনতার ৫০ বছর নিয়ে আমরা কয়েকটি কর্মসূচীর পরিকল্পনা করেছিলাম কিন্তু চলে গেলেন বড় অসময়য়ে। গৌরব ’৭১ এর জন্ম থেকেই তিনি পাশে ছিলেন আমৃত্যু।       

তাঁর স্নেহের অসংখ্য মানুষের মধ্যে আমি সৌভাগ্যবান যে ১৩ ফেব্রুয়ারি শাহীন ভাইয়ের জীবনাবসান হওয়ার কয়েকদিন আগে জাগরণ টিভি আয়োজিত ‘গৌরব একাত্তর, ছয় দফা থেকে স্বাধীনতা’ একটি সংলাপ অনুষ্ঠানে দীর্ঘ ২ ঘণ্টারও বেশি সময় দিয়েছিলেন। সেদিন শাহীন ভাইয়ের চেহারা দেখে ভীষণ মুচড়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু কখনো ভাবিনি এত তারাতাড়ি শাহীন ভাই চলে যাবেন আমাদের ছেড়ে। ভাবতে কষ্ট হচ্ছে শাহীন ভাইয়ের কাছ থেকে অনর্গল রবীন্দ্র-নজরুল কাব্য আর শোনা হবে না। মুক্তি সংগ্রামের অজানা ইতিহাস আর শোনা হবে না।   

মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে ১০ ডিসেম্বর বাবা মুক্তিযুদ্ধের মহান সংগঠক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু শহীদ সাংবাদিক সিরাজউদ্দিন হোসেনকে একাত্তরের ঘাতক দালালরা গুম করে ফেললে কিশোর বয়সেই খেলাধুলা ছেড়ে মা ও ৮ ভাইয়ের সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিতে হয়। জীবনের সবকিছু উজাড় করে তিনি এই দায়িত্ব পালন করেছেন। জীবন যুদ্ধে শাহীন ভাই ছিলেন বিজয়ী এক বীর।

জীবন যুদ্ধে নেমে কখনোই পিতার আদর্শ থেকে সরে যাননি। বাবার দেখানো পথে বেছে নিয়েছিলেন সাংবাদিকতা পেশা। ১৯৭২ সালে ঢাকা বেতার কেন্দ্রের বার্তা বিভাগে অনুলিপিকারের চাকরি গ্রহণের মধ্য দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৭৩ সালের নভেম্বর মাসে দৈনিক ইত্তেফাকের শিক্ষানবিশ সহসম্পাদক পদে যোগ দেন। ১৯৮৮ সালে তিনি কানাডায় যান। সেখানে মন্ট্রিয়েল থেকে বাংলা সাপ্তাহিক ‘প্রবাস বাংলা’ প্রকাশের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। কানাডা থেকে দেশে ফিরে আবার দৈনিক ‘ইত্তেফাক’–এ যোগ দেন। সেখানে তিনি নির্বাহী সম্পাদক থাকা অবস্থায় চাকরি ছেড়ে দেন। বাবা শহীদ বুদ্ধিজীবী সিরাজউদ্দিন হোসেন ছিলেন দৈনিক ইত্তেফাকের বার্তা প্রধান। দেশ প্রেমিক সাংবাদিক সিরাজউদ্দিন হোসেনের কর্মস্থল দৈনিক ইত্তেফাকের যোগদান করে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ রেখে হয়েছিলেন ইত্তেফাকের নির্বাহী সম্পাদক। যদিও শেষ বেলায় ইত্তেফাক নিয়ে শাহীন ভাইয়ের বেশ আক্ষেপ ছিল। আক্ষেপ ছিল নিজের হাতে গড়া সংগঠন প্রজন্ম ’৭১ নিয়েও। তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সংগঠন গৌরব ’৭১ এর উপদেষ্টা, সাবেক ছাত্রলীগ ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী সমিতি, মুক্তিযোদ্ধা সংহতি পরিষদ, সেক্টর কমান্ডারস ফোরামসহ আরও অনেক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।  

শাহীন ভাই নির্মোহ সাংবাদিকতার পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কত বড় মাপের সংগঠক ছিলেন তা বিভিন্ন সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ততাই প্রমাণ করে। তাঁর বক্তৃতা তরুণ প্রজন্মকে যে কিভাবে আন্দোলিত করত তা লিখে শেষ করা কঠিন। ছোট বড় সবাই তাঁর কথায় মুগ্ধ হয়ে পিন পতন নিরাবতায় শুনতো একাত্তরের ঘাতকদের নির্মামতা আর মুক্তিযুদ্ধের অজানা ইতিহাস। তাঁর লেখনি কিংবা বক্তৃতায় মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলা ধরাই ছিল প্রধান লক্ষ্য ।

মহান মুক্তিযুদ্ধের উত্তারাধিকার ও আদর্শের মশাল জ্বালিয়ে রাখার এমন দুঃসাহসী যোদ্ধাকে আমরা ধারণ করতে পারিনি কিংবা চায়নি! জীবিত শাহীন রেজা নূরকে আমরা যথাযথ মূল্যায়ন করতে পারিনি কিন্তু সময় এসেছে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়তে নিজেকে বিলিয়ে দেয়া এই মহান যোদ্ধা ও সংগঠককে মূল্যায়ন করার। আমার বিশ্বাস, বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার সরকার স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদানের মাধ্যমে দেশপ্রেমিক এক কর্মবীর শাহীন রেজা নূরের কর্ম ও আত্মত্যাগের সঠিক মূল্যায়ন করবেন।  

 

লেখক: সাধারণ সম্পাদক- গৌরব ‘৭১, সংগঠক-গণজাগরণ মঞ্চ।

বিডি-প্রতিদিন/সালাহ উদ্দীন


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর