সোমবার, ২৩ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ টা

মেঘ না চাইতে বিরিয়ানি

আফরীন

মেঘ না চাইতে বিরিয়ানি

দেলুকে পড়াতে শুরু করার পর থেকে অদ্ভুত সব অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। কোনো কাজে আলসেমি নেই। শুধু পড়ায় ফাঁকি দেবার জন্য সে নানা রকম ফন্দি বের করে। আজ বিকাল থেকে মাথা ধরেছে। দেলুকে ওষুধ আনার জন্য পাঠালাম। দশ মিনিট হয়ে গেছে, খবর নেই। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম পড়ার সময় পার হয়ে যাচ্ছে। বুঝলাম আজকে আর তাকে ধরা যাবে না। পুরো সময়টা ঘুরে-ফিরে কাটিয়ে আসবে। ওর জন্য অপেক্ষা করে লাভ নেই। দারোয়ান চাচাকে দিয়ে ওষুধ আনিয়ে খেলাম। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যে দেলু এসে কলিংবেল চাপল। তার হাতে ঢাকা দেওয়া একটা প্লেট। সুগন্ধ নাকে আসছে। বোঝা যাচ্ছে বিরিয়ানি জাতীয় খাবার। প্রতিবেশী ফ্ল্যাটের কেউ পাঠিয়েছে? তা হবার কথা নয়। আমার ডান পাশের ফ্ল্যাটের ইঞ্জিনিয়ার ভদ্রলোকের বউ কোরিয়ান। দেশি রান্না একদম জানেন না। ভদ্রলোককে মাঝে-মধ্যে কিনে খেতে হয়। উনি নিশ্চয় কেনা খাবার আমার জন্য পাঠাবেন না। বাম পাশের দম্পতি ভেজিটেরিয়ান। তাদের কাছ থেকে বিরিয়ানি জাতীয় খাবার আসবার কথা না। ওপর নিচ থেকে কেউ পাঠালে সশরীরে আসত। দেলুকে দিয়ে পাঠাত না। ওকে, ভিতরে এনে প্লেটের ঢাকনা তুলে দেখি ঠাসা এক প্লেট কাচ্চি বিরিয়ানি। আমার চোখ গোল গোল হয়ে গেল। সকালে অহনার সঙ্গে কাচ্চি নিয়ে গল্প করছিলাম। ইদানীং করোনার কারণে কেউ তেমন আয়োজন করে বিয়ে-শাদি করছে না। তাই কদিন হলো পেটপুরে বিয়ে বাড়ির কাচ্চি খাওয়া হয় না। এ দেখছি মেঘ না চাইতেই জল। যা আছে তাতে দুজন মানুষের অনায়াসে হয়ে যাবে। তাকিয়ে দেখি দেলুর মুখ হাসি হাসি। আমি তাকাতেই দাঁত সব বেরিয়ে পড়ল। বলল, “আপা, আমারে অদ্দেক দিয়েন।” আমি প্লেট রাখতে রাখতে জিজ্ঞেস করলাম, “কে দিল রে?” সে খুশি খুশি গলায় বলল, “গল্লির মাতায় সাততালা বাড়িডায় বিয়া। মাত্র গরম গরম রাইন্ধা শ্যাষ করছে, একটু পরে সবাই খাইব। ওইখান থিকা চাইয়্যা আনছি।” “কি? তুই মানুষের কাছ থেকে খাবার চেয়ে এনেছিস? তুই কি ভিক্ষুক? তোকে আমি খাওয়াই না? গত সপ্তাহেও অন্তুর সঙ্গে গিয়ে রেস্টুরেন্টে খেয়ে আসছিস, মনে নাই? এই, ঠিক করে বলত, ওরা তোকে এমনি এমনি এতগুলো খাবার দিয়ে দিল? না বলে আনিসনি তো? সত্যি করে বল।” দেলু মিন মিন করে বলল, “আমি চাইলেতো এতডি বিরানি দিত না।” “মানে কী? কী সর্বনাশ! তুই চুরি করেছিস?” দেলু মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, “না, না। চুরি করি নাই। হেগোরে গিয়া বলছি আপনে খাইতে চাইছেন। লম্বা লম্বা চুলঅলা একটা ব্যাডায় আপনেরে চিনছে। লগে লগে পেলেট ভইরা বিরানি দিয়া দিছে।” আমি হাসব না কাঁদব বুঝতে পারছি না। প্রতিবেশী হিসেবে মুখচেনা পরিচয় সবার সঙ্গে। এরা আমার বন্ধু-কুটুম কিছুই না। এদের কাছে গিয়ে আমার কথা বলে বিরিয়ানি চেয়ে এনেছে। ছি! ছি! কী ভাবল এরা? কী করল ছেলেটা! দেলু মিয়াকে যখন আচ্ছাসে বকুনি দিচ্ছি ঠিক তখনই আবার বেল বাজল। খুলে দেখি সাততলার দারোয়ান সাদেক আলী আর ওই বিল্ডিংয়ের এক ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে। হাতে এক বোতল বোরহানি আর কী কী সব খাবার-দাবার। ভদ্রলোক শুভেচ্ছা জানালেন। আমি কিছু বুঝলাম না। সাদেক ভাই বললেন, “আপা উনার ভাইয়ের বিয়া। আপনে নিজে থিকা বিরানি খাইতে চাইছেন শুইনা উনি খুবই খুশি হইছেন। আপনার দেলু মিয়া শুধু বিরানি নিয়া আইসা পড়ছে। বাদবাকি আইটেম আনতে পারে নাই। এইজন্য উনি নিজে সব নিয়া আসছেন। লজ্জায় কান দুটো তেতে উঠল। মুখে কোনো কথা আসছে না। কেবল মাথায় ঘুরছে। দেলুকে হেল্পিং হ্যান্ড বলে পরিচয় দেওয়ার পর কেমন কেমন করে যেন ও সবার কাছে পরিচিত পেয়ে গেছে। আমি আমতা আমতা করে কোনোমতে বলার চেষ্টা করলাম, “দেখুন আমি খুবই স্যরি। আসলে ও ছোট মানুষ কী শুনতে কী শুনেছে... আপনারা কষ্ট করে ইয়ে মানে...। ভদ্রলোক নিতান্তই ভদ্রলোক বলে খাবারগুলো দিয়ে হাসিমুখে বিদায় নিলেন। আমি ভিতরে গিয়ে দেখি আমাদের দেলু মিয়া সুন্দর করে ভেজা বিড়ালটির মতো বই-খাতা নিয়ে পড়তে বসে গেছেন।

এই রকম আরও টপিক