সোমবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ টা

ফ্রিতে যা খাবেন না

তানভীর আহমেদ

ফ্রিতে যা খাবেন না

ট্রেনে যাত্রীদের মধ্যে এক ধরনের প্রতিযোগিতা চলে। ট্রেনে সিট দখলের প্রতিযোগিতা না। খাওয়ার প্রতিযোগিতা। সাধারণত ফেরিওয়ালা সামনে পড়লে কেউ কিছু কিনতে চায় না। খেতে চায় না। টুথব্রাশ লাগবে কারও? দাঁত যত হলুদই হোক, কেউ কিনবে না। বাচ্চাদের আম-কাঁঠাল পরিচিতির বই নিয়ে অনেক জ্ঞান বিতরণের পর বই বিক্রেতাকে উল্টো জ্ঞান দিয়ে ট্রেনের পরের কামরায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। একই অবস্থা, মোবাইল স্ট্যান্ড বিক্রেতার, পিঠ চুলকানোর যুগান্তকারী যন্ত্র বিক্রেতার ও বেগুন-শসা ছিলে নেওয়ার মেশিনও বিক্রি হচ্ছে না। তবে উল্টো চিত্র খাবার বিক্রেতাদের। ঝালমুড়িওয়ালা, চানাচুরওয়ালা, সিদ্ধ ডিমওয়ালা, আচারওয়ালার বাম্পার অবস্থা। একবার কেউ খাওয়া শুরু করলে সবার যেন একসঙ্গে খিদে পেয়ে যায়। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, ফেরিওয়ালা অর্ডার সামলাতে না পেরে ট্রেন থেকে নামতে পারলেই বাঁচে। আর খাওয়া শুরু হলে সেটা চলে ঘণ্টাব্যাপী। মচমচ, কচকচ, খচখচ করতে থাকে মুখগুলো। এমন পরিস্থিতিতে মনে হয় আরেকজনের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে কিছুটা খেয়ে নেই! সেটা যত অখাদ্যই হোক। এ খাওয়া চলে ধাপে ধাপে। প্রথম ধাপে যারা কিছুই কেনেননি তারা দ্বিতীয় ধাপে খাওয়ার অপেক্ষা করেন। ধরা যাক, প্রথম ধাপে এসেছিল চানাচুরওয়ালা। পঞ্চাশ শতাংশ যাত্রী চানাচুর খেয়েছিল। চানাচুরওয়ালা ট্রেনের অন্য বগিতে চলে গেছেন। এবার এলেন শসাওয়ালা। বাকি পঞ্চাশ শতাংশ এবার ঘিরে ধরেন শসাওয়ালাকে। শসা শেষ না হওয়া পর্যন্ত চলে এ খাওয়ার উৎসব। দ্বিতীয় ধাপে এ খাওয়ার পরেও দেখা যায় কেউ কেউ মিস করে গেছেন। তারা অপেক্ষায় থাকেন তৃতীয় ধাপে খাওয়ার জন্য। এবার এলেন সিদ্ধ ডিমওয়ালা। তাকে রীতিমতো আটকে রাখা হয়। হাঁড়ির সব ডিম খাওয়ার পর তাকে ছাড়া হবে। খাওয়ার এ স্রোতে পড়েও কেউ না খেয়ে থাকলে বুঝতে হবে তার পেটে প্রবলেম আছে। তবে সবার পেটে প্রবলেম থাকে না। কেউ কেউ আছেন যারা আমার মতো স্বাস্থ্য সচেতন। তারা দাঁতে খিচ মেরে এ খাওয়ার প্রতিযোগিতা থেকে নিজেকে রক্ষা করেন।

এক দিনের ঘটনা। ট্রেনে খাওয়ার প্রতিযোগিতা চলছে। প্রথম ধাপে গেল বাদাম, দ্বিতীয় ধাপে গেল আমড়া-শসা এবং তৃতীয় ধাপে গেল চানাচুর। আমি যথারীতি প্রতিযোগিতা থেকে দূরে আছি। এমন সময় একজন বলল, ‘ভাই, একটু চানাচুর নেন?’ তাকে ফিরিয়ে দিলাম। আরেকটু পর একজন বললেন, ‘ভাই, কয়েকটা বাদাম নেন?’ তাকেও ফিরিয়ে দিলাম। আরও কিছুক্ষণ পর একজন বললেন, ‘ভাই, শসার একটা পিস নেন?’ না করে দিলাম। সবাইকে না করে দেওয়ার পর একজন বলল, ‘একটু নুডলস খাবেন, আমি রান্না করেছি।’ এত দিনের ট্রেন ভ্রমণে এমন অফার কখনো পাইনি। তাকিয়ে দেখি পরীর মতো সুন্দর একজন বসে আছেন। তাকে পরীও বলা যায়। পাখা না থাকলে যে কাউকে পরী ভাবা যাবে না, এমন কোনো নিয়ম তো নেই। দুই সেকেন্ড তাকিয়ে দেখেই বুঝে গেছি, সে সত্যিকারের পরী। মনে একটু খটকা ছিল তা-ও দূর হয়ে গেল যখন সে বলল, সে ভৈরব যাচ্ছে। আমিও ভৈরব যাচ্ছি। সে তার পাশের সিটে আমাকে বসতে দিল। এক শ ভাগ নিশ্চিত হলাম, সে আসলে সত্যিকারের পরী। নাহলে কেউ এত ভালো হয়? এদিকে ট্রেনে খাওয়ার প্রতিযোগিতা চলছে। এত মচমচ, কচকচ, খচখচের ভিতর কিছু না খেয়ে থাকা কঠিন। আমি তো সহজ মানুষ। তাই পরীর নিজ হাতে রান্না করা নুডলস খাওয়া শুরু করলাম। তারপর আর কিছু মনে নেই। মানুষের কাছে শুনলাম আমি নাকি অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়েছিলাম।  কি জানি! তবে একটা জিনিস জানলাম, ফ্রিতে নুডলস খাবেন না।

এই রকম আরও টপিক

সর্বশেষ খবর