শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ২১ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ২০ মার্চ, ২০২১ ২১:৫৪

মুক্তিযুদ্ধে বিদেশি বন্ধু

মুক্তিযুদ্ধে বিদেশি বন্ধু

বাংলাদেশের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা সংগ্রামে শুরু থেকেই বহির্বিশ্বের নাগরিকদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অংশগ্রহণ ছিল। নিরস্ত্র বাংলাদেশিদের হত্যা, নির্যাতন এবং একপেশে যুদ্ধের খবর কেউ পৌঁছে দিয়েছিলেন কলম হাতে, কেউ ক্যামেরা হাতে। বিশ্ববাসীকে জানান দিয়েছিলেন নিজের কবিতায়, কেউবা গান গেয়ে। মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশিদের দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়ানো ক’জন বন্ধুকে নিয়ে লিখেছেন- তানভীর আহমেদ

 

কনসার্ট ফর বাংলাদেশ

রবিশঙ্কর আর জর্জ হ্যারিসন। বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষের কথা সুরের মূর্ছনায় বিশ্ববাসীকে প্রথম জানান দিয়েছিলেন তারাই। কনসার্ট ফর বাংলাদেশ থেকেই বিশ্ববাসীকে আবেগী নাড়া দেয়, নিরস্ত্র বাংলাদেশিদের নৃশংসভাবে হত্যাযজ্ঞ বাস্তবে উপস্থাপন করেন তারা। একাত্তরে বাংলাদেশে পাকিস্তানিদের পৈশাচিকতা দেখে ভারতের সেতারসম্রাট বিখ্যাত শিল্পী রবিশঙ্কর ঠিক করলেন, কিছু করতে হবে তাকে। তার বন্ধু বিখ্যাত বিটলস ব্যান্ডের অন্যতম সদস্য জর্জ হ্যারিসনও এতে সায় দেন।

১ আগস্ট ১৯৭১ নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ারে বসল পৃথিবীর ইতিহাসে স্মরণীয় এক ঐতিহাসিক কনসার্ট। সেখানেই বাংলাদেশের জন্য বাজালেন সেতারসম্রাট রবিশঙ্কর, সরোদসম্রাট ওস্তাদ আলী আকবর খাঁ, তবলার কিংবদন্তি শিল্পী আল্লারাখা খাঁ। তারপর একে একে গান গাইলেন বিটলসের জর্জ হ্যারিসন, রিঙ্গো স্টার, লিওন রাসেল, বিলি প্রিস্টন আর কিংবদন্তি গায়ক বব ডিলান। কিংবদন্তি গিটারিস্ট এরিক ক্ল্যাটনও গিটার বাজিয়েছিলেন কনসার্টটিতে। সবশেষে জর্জ হ্যারিসন গাইলেন তার সেই বিখ্যাত গান ‘বাংলাদেশ’।

 

 

বীরপ্রতীক ওডারল্যান্ড

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ও সাহসী অবদান রাখার জন্য বীরপ্রতীকপ্রাপ্ত ওডারল্যান্ড ছিলেন একজন ডাচ-অস্ট্রেলিয়ান কমান্ডো অফিসার। ঢাকায় বাটা স্যু কোম্পানির প্রোডাকশন ম্যানেজার হিসেবে ওডারল্যান্ড ১৯৭০ সালের শেষ দিকে প্রথম ঢাকায় আসেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই কোম্পানি-ম্যানেজার ওডারল্যান্ড যেন নিজের মধ্যে আবিষ্কার করেন নতুন এক যুদ্ধের মুখোমুখি প্রাক্তন-সৈনিক ওডারল্যান্ডকে। অপারেশন সার্চলাইটের সময় তিনি লুকিয়ে সে রাতের ভয়াবহতার কিছু ছবি তুলে পাঠান আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে। আর এভাবেই তিনি বাংলাদেশিদের প্রাণের বন্ধু হয়ে ওঠেন। শুধু এ দেশের স্বাধীনতার জন্য আর নিরীহ মানুষকে হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে নিজের মানবিক তাড়নাতেই সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করে লড়তে থাকেন পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে। আগস্ট মাসের দিকে তিনি টঙ্গীতে বাটা কোম্পানির ভিতরে গেরিলা ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের খাদ্য-ওষুধ এবং আশ্রয় দিয়েও তিনি সাহায্য করেছিলেন। টঙ্গী ও এর আশপাশ এলাকায় বেশ কয়েকটি সফল গেরিলা হামলার আয়োজকও ছিলেন তিনি। স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি মুক্তিযুদ্ধে এ বীরোচিত ভূমিকার জন্য বীরপ্রতীক খেতাবে ভূষিত হন

 

অকৃত্রিম বন্ধু অ্যাডওয়ার্ড

বিশ্বের মানবতাবাদী মানুষ বাংলাদেশের ন্যায্য অধিকার আদায়ের সংগ্রামে, মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করেছিলেন। তাদেরই একজন মহান ব্যক্তিত্ব, বাংলাদেশিদের অকৃত্রিম বন্ধু যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর অ্যাডওয়ার্ড কেনেডি। অ্যাডওয়ার্ড কেনেডি ১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিকে গণহত্যার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন। পাকিস্তান বাহিনীর পাশবিকতা থেকে বাঁচার জন্য মানুষ ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। এক কোটি শরণার্থীর দুর্দশা স্বচক্ষে পর্যবেক্ষণ করে ফিরে এসে কেনেডি সিনেট জুডিশিয়ারি কমিটির কাছে বিস্তারিত রিপোর্ট করেছিলেন ‘ক্রাইসিস ইন সাউথ এশিয়া’। ইতিহাসে এই রিপোর্টটির গুরুত্ব অনেক। এ রিপোর্টে কেনেডি পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর নির্বিচার গণহত্যার কথা বলেছেন, বাংলাদেশের মানুষের দুর্দশার কথা তুলে ধরেছেন মার্কিন প্রশাসনের সামনে। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও তিনি বিভিন্ন দেশে গিয়ে বাংলাদেশের শরণার্থীদের জন্য সাহায্য চেয়েছেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে অ্যাডওয়ার্ড কেনেডি সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশে আসেন। এখানে তিনি একটি শোভাযাত্রায় অংশ নেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষণ দেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে কাজ করে গেছেন জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত।

 

সাংবাদিক সায়মন ড্রিং

কলম আর ক্যামেরা হাতে নিজের জীবন বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধে নিরীহ বাংলাদেশিদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন সাংবাদিক সায়মন ড্রিং। একাত্তর সালে সাইমন ড্রিংয়ের বয়স ছিল মাত্র ২৭ বছর। তিনি তখন নামকরা পত্রিকা ডেইলি টেলিগ্রাফের একজন সাংবাদিক। অন্যদিকে তখন আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পাকিস্তানি সামরিক সরকার ২৫ মার্চ বিশ্বের বড় বড় সংবাদ মাধ্যমগুলোর ৪০ সাংবাদিককে বাংলাদেশে আসার অনুমতি দিয়েছে। সেই সুযোগে টেলিগ্রাফের সাংবাদিক হিসেবে বাংলাদেশে আসেন সায়মন ড্রিং। পাকিস্তানি সেনাদের নির্যাতনের চিত্র তিনি তুলে ধরেন বিশ্ববাসীর সামনে। এক সময় সাংবাদিকদের জন্য অবস্থা প্রতিকূলে চলে গেলে তিনি দেশত্যাগ না করে লুকিয়ে থাকেন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে। তিনি ২৭ তারিখে পকিস্তানি বাহিনীকে ফাঁকি দিয়ে বেরিয়ে আসেন শহরে। ঢাকার বুকে তখন হত্যা, ধ্বংস আর লুটপাটের চিহ্ন। পর্যাপ্ত ছবি আর প্রত্যক্ষ ছবিগুলো নিয়ে তিনি পালিয়ে চলে গেলেন ব্যাংককে। আর সেখান থেকে প্রকাশ করলেন ‘ট্যাঙ্কস ক্রাশ রিভল্ট ইন পাকিস্তান’। বিশ্ববাসীর সামনে তিনি তুলে ধরলেন নির্মম বাস্তবতাকে। তার পাঠানো খবরেই নড়েচড়ে বসল পুরো বিশ্ব।

 

কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ

কবি এবং কাব্য বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে আলোড়ন তুলেছিল। সেই কবির নাম অ্যালেন গিন্সবার্গ। তিনি একজন মার্কিন কবি। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের ওপর তিনি লিখেছিলেন একটি দীর্ঘ কবিতা। কবিতাটির নাম ছিল- ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’। তার কবিতাটি ছুঁয়ে যায় হাজারও মানুষের হৃদয়। নিপীড়িত মানুষের হাহাকার মেশানো, যুদ্ধের বাস্তবচিত্র কবিতার অক্ষরে অক্ষরে জানান দিয়ে যায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের দৃশ্য। তার কবিতা শুনে ও পড়ে অশ্রুসজল হয়ে পড়েন হাজারও মানুষ। বাংলাদেশের পক্ষে একত্ম হয়ে ওঠেন বিশ্বের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অগণিত সাহিত্যপ্রেমিক। তার কবিতাটির কয়েকটি লাইন এখনো অনেকের মুখে মুখে চলে আসে। ‘মিলিয়নস অব সোলস নাইন্টিন সেভেন্টিওয়ান, হোমলেস অন যশোর রোড আন্ডার গ্রে সান, আ মিলিয়ন আর ডেড, দ্য মিলিয়নস হু ক্যান, ওয়াক টুওয়ার্ড ক্যালকাটা ফ্রম ইস্ট পাকিস্তান’। কবিতার ইস্ট পাকিস্তান বা পূর্ব পাকিস্তানই হলো বর্তমান বাংলাদেশ। তার এ কবিতার সূত্র ধরেই বিখ্যাত বাঙালি গায়িকা মৌসুমী ভৌমিক কবিতাটির কিছু অংশ বাংলায় অনুবাদ করে তৈরি করেছেন তার ‘যশোর রোড’ গানটি।

 

জোসেফ ও’কনেল

মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত বন্ধু জোসেফ ও’কনেল টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ম গবেষণা বিভাগের প্রফেসর ইমেরিটাস এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ্ব ধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের সম্মানিত অধ্যাপক ছিলেন। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃৃতির প্রতি গভীর অনুরাগের বশে তিনি ও তার সহধর্মিণী ক্যাথলিন ও’কনেল দীর্ঘদিন ধরে বাংলা চর্চা করেছেন। জোসেফ ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে জনমত গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রাখেন।

বিদেশে যে কয়জন বন্ধু বাংলাদেশের সংস্কৃতি, ভাষার প্রতি সত্যিকারে দরদ দেখিয়েছিলেন তাদের একজন তিনি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তিনি দেশের বাইরে বিভিন্ন জায়গায় জনমত তৈরি করেন।

 

 

 

লেয়ার লেভিন

পাকিস্তানি সেনাদের বর্বরতার কাহিনী বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দেবেন-এ মন্ত্রেই ’৭১ সালে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে ক্যামেরা হাতে ঘুরে বেড়িয়েছেন ‘মুক্তি সংগ্রামী শিল্পী সংস্থা’র সঙ্গে। তারা একটি ট্রাকে ঘুরে বেড়াতেন ভারতের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে আর মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে। সুযোগ পেলে দেশের ভিতরের মুক্তাঞ্চলেও চলে আসতেন। আর সেখানে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধা ও গেরিলাদের দেশাত্মবোধক গান শুনিয়ে, পুতুলনাচ দেখিয়ে উজ্জীবিত করতেন। প্রায় ২০ ঘণ্টার ক্যামেরা ফুটেজ তৈরি করলেন তিনি। তারপর ফিরে গেলেন যুক্তরাষ্ট্রে। শুরু করলেন ডকুমেন্টারিটি তৈরির কাজ। কিন্তু টাকার অভাবে শেষ করতে পারলেন না ডকুমেন্টারিটি। পরে অবশ্য আমাদের দেশের আরেকজন বিখ্যাত পরিচালক তারেক মাসুদ আর তার স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ লেভিনের কাছ থেকে ফুটেজগুলো নিয়ে তৈরি করেন ‘মুক্তির গান’।

 

 

পল কনেট দম্পতি

লন্ডনে বাংলাদেশের নিরীহ জনমানুষের ওপর অস্ত্র ব্যবহারে নির্মম হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছিল পল কনেট দম্পতি। পাকিস্তান দোসররা বাংলাদেশে নিরীহ মানুষের রক্ত ঝরাচ্ছে এ খবরে তারা আর চুপ করে বসে থাকতে পারেননি। মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন, বাংলাদেশের খাদ্যসামগ্রী ও ওষুধপথ্য পাঠানোর জন্য তিনি ‘অপারেশন ওমেগা’ নামে একটি সংস্থা করেন। লন্ডনের ক্যামডেন এলাকায় তারা ‘অ্যাকশন বাংলাদেশ’ নামে একটি কার্যালয় খোলেন। পাকিস্তানি সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে এবং বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য জনমত গঠন করতে ১ আগস্ট লন্ডনের ট্রাফালগার স্কয়ারে বিশাল জনসভার আয়োজন করেন তারা। এ ছাড়া বাংলাদেশে ত্রাণ কার্যক্রম চালাতে পল নিজেই চলে আসেন। পলের সঙ্গে তার স্ত্রী এলেন কনেটও বাংলাদেশে এসেছিলেন। ট্রাফালগার স্কয়ারে বিশাল জমায়েত শেষে একটি অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে ভারতে আসেন। সেখান থেকে জীবনের ঝুঁঁকি নিয়ে ঢোকেন বাংলাদেশে। কিন্তু পাকিস্তানি বাহিনী তাকে গ্রেফতার করে। পরে পাকিস্তানের সামরিক আদালত তাকে দুই বছরের কারাদন্ড দেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি মুক্তি পান।