টিএমএসএস মেডিকেল কলেজ ও রফাতুল্লাহ কমিউনিটি হাসপাতাল উত্তরাঞ্চলের মানুষের উন্নত চিকিৎসাসেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এ হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠা করেছেন টিএমএসএসের প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী পরিচালক প্রফেসর ড. হোসনে আরা বেগম। উত্তরাঞ্চলে ক্যানসার, হৃদ্রোগ, বোন ম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট, জিনোম সিকোয়েনন্সিংসহ সব সেবা মিলছে টিএমএসএসের এক ছাদের নিচে। জানা গেছে, বগুড়ার ঠেঙ্গামারায় গড়ে উঠেছে এক সুবিশাল স্বাস্থ্যনগরী। সাম্প্রতিক সময়ে টিএমএসএসের উদ্যোগে উত্তরাঞ্চলে উন্নত, মানবিক ও প্রযুক্তিনির্ভর স্বাস্থ্যসেবার বিস্তার ঘটেছে। বগুড়া, রংপুর, নওগাঁ, গাইবান্ধা এ নামগুলো শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে দেশের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত, সুবিধাবঞ্চিত জনপদের ছবি। দীর্ঘদিন ধরে বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা এখানকার মানুষের নাগালের বাইরে ছিল। জটিল রোগের নাম শুনলেই ভয়ে কুঁকড়ে যেত মানুষ। ক্যানসার, হৃদ্রোগ, কিডনি বা থ্যালাসেমিয়ার মতো মরণব্যাধির চিকিৎসার জন্য ধনী-গরিব সবারই ছিল একই গন্তব্য-রাজধানী ঢাকা। সেই যাত্রাপথ ছিল কষ্টদায়ক, সময়সাপেক্ষ এবং সর্বোপরি আর্থিকভাবে অনেক ব্যয়বহুল। কিন্তু সে চিত্র বদলে দিয়েছে টিএমএসএস। টিএমএসএসের নিরলস প্রচেষ্টায় বগুড়ায় গড়ে উঠেছে উত্তরবঙ্গের প্রথম বায়োমলিকুলার ল্যাব, ২৫০ শয্যার সুপার স্পেশালাইজড ক্যানসার সেন্টার, অত্যাধুনিক হার্ট সেন্টার, হেমাটোলজি ও বোন ম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট সেন্টার, ফিজিওথেরাপি ও রিহ্যাবিলিটেশন, আর্টিফিশিয়াল লিম্ব সেন্টার এবং নানান বিশেষায়িত বিভাগ। যেখানে সাশ্রয়ী মূল্যে পাওয়া যাচ্ছে আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসাসেবা। আধুনিক চিকিৎসার এক অনন্য অবকাঠামো, উন্নত প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল এবং সাশ্রয়ী মূল্যে চিকিৎসা প্রদানের মাধ্যমে টিএমএসএস এখন উত্তরবঙ্গের মানুষের নির্ভরতার প্রতীক। ২০২২ সালে যাত্রা করা টিএমএসএস ক্যানসার সেন্টার এখন দেশের অন্যতম আধুনিক ও সাশ্রয়ী চিকিৎসা কেন্দ্র। ১৪ তলা এ সেন্টারে রয়েছে বিশ্বমানের ডায়াগনস্টিক সুবিধা। ক্যানসার নির্ণয় ও চিকিৎসায় রয়েছে আধুনিক প্যাথলজি ও ল্যাবরেটরি পরীক্ষানিরীক্ষার সুবিধা। ক্যানসার চিকিৎসায় চালু হয়েছে টার্গেটেড থেরাপি, ইমিউনো থেরাপি ও প্রিসিশন মেডিসিন; যা রোগীর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কমিয়ে আনে এবং চিকিৎসার সফলতা বাড়ায়। এখানে তিনটি উন্নত রেডিওথেরাপি মেশিন লিনাক, ব্র্যাকি থেরাপি এবং দেশের প্রথম ও প্রযুক্তিভিত্তিক টোমো থেরাপি ব্যবহৃত হচ্ছে।
২০২৪ সালে চালু হওয়া হেমাটোলজি ও বোন ম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট সেন্টার দেশের উত্তরাঞ্চলে রক্তরোগ চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। লিউকেমিয়া, লিম্ফোমা, মাইলোমা, হিমোফিলিয়া, থ্যালাসেমিয়া প্রভৃতি জটিল রক্তরোগের সঠিক চিকিৎসা এখন বগুড়াতেই পাওয়া যাচ্ছে। একই বছরে চালু হওয়া টিএমএসএস হার্ট সেন্টার উত্তরাঞ্চলে হৃদ্রোগ চিকিৎসার ধারা বদলে দিয়েছে। এখানে রয়েছে ২৫ শয্যার সিসিইউ, ৩০ শয্যার পোস্টসিসিইউ, ১০ শয্যার আইসিইউ, অত্যাধুনিক ক্যাথল্যাব এবং আধুনিক সার্জারি ওটি।
ক্যানসার চিকিৎসায় প্রিসিশন মেডিসিন যুগের সূচনা করেছে ২০২২ সালে প্রতিষ্ঠিত টিএমএসএস বায়োমলিকুলার ল্যাব। আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় গড়ে ওঠা এ ল্যাবে রয়েছে এনজিএস প্রযুক্তি; যার মাধ্যমে রোগীর জিনগত মিউটেশন বিশ্লেষণ করে সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা নির্ধারণ করা হয়। এখানে টার্গেটেড থেরাপির মতো যুগান্তকারী চিকিৎসা পদ্ধতি প্রয়োগ করে শুধু ক্যানসার কোষ ধ্বংস করা হয়।
২০২০ সালে প্রতিষ্ঠিত ট্রপিক্যাল মেডিসিন ও ক্লিনিক্যাল ইমিউনোলজি ল্যাব কভিড-১৯ থেকে শুরু করে সেপসিস, মেনিনজাইটিস, HPV DNA এবং MIC-ভিত্তিক কালচার টেস্টে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে।
২০১৯ সালে উত্তরবঙ্গে চালু হওয়া প্রথম প্রস্থেটিক-অর্থোটিক লিম্ব সেন্টার অঙ্গহানি রোগীদের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। বিশেষজ্ঞ জনবল ও প্রশিক্ষিত টেকনিশিয়ানদের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানের কৃত্রিম হাত-পা এবং সহায়ক যন্ত্র স্বল্পমূল্যে সরবরাহ করছে এ সেন্টার। টিএমএসএসের স্বাস্থ্যসেবার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হলো আধুনিক ফিজিওথেরাপি ও রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার। দুর্ঘটনা, স্ট্রোক, মেরুদণ্ডের আঘাত, হাড় ভাঙা, জন্মগত অঙ্গবিকলতা বা দীর্ঘমেয়াদি ব্যথায় ভুগছেন এমন রোগীদের জন্য এখানে রয়েছে পূর্ণাঙ্গ পুনর্বাসন সেবা।
বর্তমানে টিএমএসএসের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে আটটি হাসপাতাল ও মেডিকেল সেন্টার, ১১টি চিকিৎসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (মেডিকেল, ডেন্টাল, নার্সিং কলেজসহ) এবং ১৩১টির বেশি প্রাইমারি হেলথকেয়ার সাব-সেন্টার। উত্তরবঙ্গের স্বাস্থ্যসেবায় টিএমএসএস আজ একটি নির্ভরযোগ্য নাম ও আস্থার প্রতীক। টিএমএসএসের প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী পরিচালক প্রফেসর ড. হোসনে আরা বেগম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘বগুড়ায় প্রতিষ্ঠিত টিএমএসএসের ব্যাপক স্বাস্থ্য অবকাঠামো বাংলাদেশের চিকিৎসা খাতের জন্য একটি অনুকরণীয় মডেল। দেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েনসিং ল্যাব থেকে শুরু করে সাশ্রয়ী মূল্যে ক্যানসার চিকিৎসা ও জটিল হৃদ্রোগ সার্জারি সবই এখন এক ছাদের নিচে পাওয়া যাচ্ছে।
২০২৪ সালে চালু হওয়া টিএমএসএস হার্ট সেন্টার উত্তরাঞ্চলে হৃদ্রোগ চিকিৎসার ধারা বদলে দিয়েছে। এখানে রয়েছে ২৫ শয্যার সিসিইউ, ৩০ শয্যার পোস্টসিসিইউ, ১০ শয্যার আইসিইউ, অত্যাধুনিক ক্যাথল্যাব এবং আধুনিক সার্জারি ওটি।’ তিনি আরও বলেন, ‘টিএমএসএসের এ উদ্যোগ উত্তরাঞ্চলকে উন্নত চিকিৎসাসেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করেছে; যা এখন সারা দেশের মানুষের জন্য আশার আলো হয়ে দাঁড়িয়েছে। চিকিৎসাসেবায় ব্যবসা নয়, মানবসেবার জন্য টিএমএসএস হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।’