বাংলাদেশ প্রতিদিন : আজ সারা দেশে বাংলা কিউআর চালু হচ্ছে। এ উদ্যোগকে আপনার ব্যাংক কীভাবে দেখছে?
মো. এহতেশামুল হক খান : বাংলা কিউআর আমাদের ডিজিটাল পেমেন্ট-ব্যবস্থায় একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ। সব ব্যাংক ও মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) এক প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হওয়ায় এতে গ্রাহকদের লেনদেন আরও সহজ, নিরাপদ ও দ্রুত হবে। ডাচ্-বাংলা ব্যাংক শুরু থেকেই ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। তাই আমরা এ উদ্যোগকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি এবং বিশ্বাস করি এটি ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বিনির্মাণের যাত্রা আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : বাংলা কিউআর বাস্তবায়নে আপনার ব্যাংক কী ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে?
মো. এহতেশামুল হক খান : বাংলা কিউআর বাস্তবায়নের জন্য আমাদের প্রযুক্তিগত অবকাঠামো সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত। মোবাইল অ্যাপ আপডেট, মার্চেন্ট অনবোর্ডিং, সিস্টেম ইন্টিগ্রেশন, কর্মী ও মার্চেন্টদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম আমরা ইতোমধ্যে সম্পন্ন করে ফেলেছি। এ ছাড়া দেশজুড়ে ২ লাখের বেশি মার্চেন্ট পয়েন্টে বাংলা কিউআর স্থাপন করা হয়েছে, যা এখন দৃশ্যমান। পাশাপাশি প্রতিনিয়ত নতুন নতুন মার্চেন্ট পয়েন্টে দ্রুত বাংলা কিউআর সম্প্রসারণের কাজ চলমান রয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন প্রচারমূলক উপকরণ ও লিফলেটের মাধ্যমে মার্চেন্ট ও গ্রাহকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : ক্যাশলেস অর্থনীতি গড়ে তুলতে ব্যাংকগুলোর ভূমিকা কী হওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?
মো. এহতেশামুল হক খান : ক্যাশলেস অর্থনীতি গঠনে ব্যাংকগুলোর ভূমিকা শুধু প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়; বরং গ্রাহকদের মধ্যে ডিজিটাল লেনদেনের প্রতি আস্থা তৈরি করাও তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এ ছাড়া ব্যাংকগুলোর একটি সহজ, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী ডিজিটাল পেমেন্ট -ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি গ্রাহকদের সচেতন করা, মার্চেন্টদের উদ্বুদ্ধ করা এবং নতুন নতুন সেবা চালুর মাধ্যমে সব ব্যাংককে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : গ্রাহকদের ডিজিটাল লেনদেনে উৎসাহিত করতে আপনার ব্যাংক কী কী উদ্যোগ নিয়েছে বা নিতে যাচ্ছে?
মো. এহতেশামুল হক খান : আমরা বিভিন্ন ক্যাম্পেইন, ক্যাশব্যাক, ডিসকাউন্ট অফার এবং সহজ অনবোর্ডিং সুবিধার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত গ্রাহকদের বাংলা কিউআর ব্যবহারে উৎসাহিত করে চলেছি। পাশাপাশি বাংলা কিউআর ব্যবহার করে কেনাকাটায় আরও কী কী নতুন সুবিধা এবং অফার দেওয়া যায়, তা নিয়েও কাজ করছি।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দোকানদার ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে বাংলা কিউআর জনপ্রিয় করতে কী ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে?
মো. এহতেশামুল হক খান : ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দোকানদার ও প্রান্তিক, জনগোষ্ঠীর মধ্যে বাংলা কিউআর জনপ্রিয় করার প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো হলো সচেতনতার অভাব, প্রযুক্তিগত জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা, এমডিআর খরচ বহনে অনাগ্রহ, ডিজিটাল লেনদেনে অনীহা এবং কিছু এলাকায় ইন্টারনেট সংযোগের সমস্যা। তবে সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংক ও এমএফএসগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করলে এসব বাধা সহজেই অতিক্রম করা সম্ভব। বিশেষ করে মাঠপর্যায়ে গিয়ে মানুষকে বাংলা কিউআর লেনদেন সম্পর্কে বোঝানো ও ব্যবহার করতে উদ্বুদ্ধ করার মাধ্যমে বাংলা কিউআরকে অধিকতর এবং দ্রুত জনপ্রিয় করে তোলা সম্ভব।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : বাংলা কিউআর চালুর ফলে নগদ লেনদেন কতটা কমবে বলে আপনি মনে করেন?
মো. এহতেশামুল হক খান : ইতোমধ্যে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে লেনদেনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। আশা করা যায় বাংলা কিউআরের প্রতিনিয়ত ব্যবহারের মাধ্যমে ধীরে ধীরে নগদ টাকার ওপর নির্ভরতা অনেকটাই কমে আসবে। যত বেশি সাধারণ মানুষ এবং ছোট, মাঝারি ও বড় ব্যবসায়ী বাংলা কিউআর ব্যবহার করবেন, লেনদেনে ডিজিটাল পেমেন্টের অভ্যাস তত বাড়বে এবং ক্যাশ টাকার ব্যবহার ধীরে ধীরে কমে আসবে। এ ছাড়া নগদ লেনদেন হ্রাসকরণের জন্য প্রয়োজন পুরো পেমেন্ট ইকোসিস্টেম ডিজিটালাইজড হওয়া।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : ডিজিটাল লেনদেন বাড়লে আর্থিক স্বচ্ছতা, সুশাসন ও করব্যবস্থায় কী ধরনের ইতিবাচক প্রভাব পড়বে?
মো. এহতেশামুল হক খান : ডিজিটাল লেনদেনের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো প্রতিটি লেনদেনের সুস্পষ্ট রেকর্ড সংরক্ষিত থাকে। এর ফলে আর্থিক স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে, হিসাববহির্ভূত লেনদেন কমবে এবং কর আদায় আরও কার্যকর ও সহজ হবে। একই সঙ্গে সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : সাইবার নিরাপত্তা ও জালিয়াতি প্রতিরোধে ব্যাংকগুলো কী ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছে?
মো. এহতেশামুল হক খান : সাইবার নিরাপত্তা ও জালিয়াতি প্রতিরোধে ব্যাংকগুলো আন্তর্জাতিক মানের সাইবার সিকিউরিটি ব্যবস্থা, ডেটা এনক্রিপশন, ওটিপি বা মাল্টি-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন এবং ট্রানজেকশন মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করে থাকে এবং এর পাশাপাশি নিয়মিত নিরাপত্তা অডিটও পরিচালনা করে । প্রযুক্তিগত নিরাপত্তার পাশাপাশি গ্রাহকদের সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নিয়মিত বিভিন্ন প্রচার ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়ে থাকে।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস), ইন্টারনেট ব্যাংকিং ও বাংলা কিউআরের মধ্যে সমন্বয় কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
মো. এহতেশামুল হক খান : মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস), ইন্টারনেট ব্যাংকিং ও বাংলা কিউআরের সমন্বয়ই আমাদের ডিজিটাল পেমেন্ট-ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান শক্তি। এর ফলে গ্রাহক যেকোনো ব্যাংক বা এমএফএস অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করেই একই বাংলা কিউআর স্ক্যান করে সহজে পেমেন্ট করতে পারবেন। এই ইন্টারঅপারেবিলিটি (আন্তঃসংযোগ) ডিজিটাল পেমেন্ট আরও সহজ, কার্যকর ও সর্বজনগ্রাহ্য করে তুলবে।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের ডিজিটাল পেমেন্ট ইকোসিস্টেমকে কোথায় দেখতে চান?
মো. এহতেশামুল হক খান : আমি এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে চাই, যেখানে প্রতিদিনের অধিকাংশ লেনদেনই ডিজিটাল মাধ্যমে সম্পন্ন হবে। শহর থেকে গ্রাম সবখানেই ছোট, মাঝারি ও বড় সব ধরনের ব্যবসায়ী বাংলা কিউআর ব্যবহার করবেন। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আধুনিক, নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল পেমেন্ট হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।