বর্তমানে বৈশ্বিক পরিস্থিতি এবং জ্বালানি সংকটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি কতটা সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে?
উত্তর : বর্তমান বিশ্বে জ্বালানি নিরাপত্তা এবং জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতা একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন ভূরাজনৈতিক সংঘাত, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি, সরবরাহব্যবস্থার অনিশ্চয়তা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিশ্বের প্রায় সব দেশকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করেছে। এ প্রেক্ষাপটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ একটি কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কোনো জ্বালানি আমদানি করতে হয় না, ফলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমে। একই সঙ্গে এটি পরিবেশবান্ধব এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশের মতো একটি দ্রুতবর্ধনশীল অর্থনীতির দেশে শিল্পায়ন ও নগরায়ণের সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। তাই প্রচলিত জ্বালানি উৎসের পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎকে জাতীয় জ্বালানি মিশ্রণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। নবায়নযোগ্য জ্বালানি শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিকল্প নয়, বরং দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি কৌশলগত মাধ্যম।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে বাংলাদেশ পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকে এখনো কেন পিছিয়ে আছে?
উত্তর : বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে সচেতনতা এবং বিনিয়োগ আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। তবে ভারত, চীন বা ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোর তুলনায় আমাদের অগ্রগতি এখনো তুলনামূলকভাবে সীমিত। এর অন্যতম কারণ হলো জমির সীমাবদ্ধতা। বৃহৎ আকারের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্ত খালি জমি পাওয়া বাংলাদেশে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ ছাড়া প্রকল্প অনুমোদন, গ্রিড সংযোগ এবং বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমতির ক্ষেত্রে সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অর্থায়ন। অনেক উন্নত ও পার্শ্ববর্তী দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের জন্য দীর্ঘমেয়াদি এবং স্বল্পসুদে অর্থায়নের ব্যবস্থা রয়েছে, যা বাংলাদেশে এখনো পর্যাপ্ত নয়। পাশাপাশি স্থানীয় উৎপাদন শিল্পের সীমাবদ্ধতা এবং আমদানিনির্ভর সরঞ্জাম-ব্যবস্থাও প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি করে। তবে ইতিবাচক দিক হলো, বাংলাদেশে শিল্প খাতে রুফটপ সোলারের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে এবং সঠিক নীতিগত সহায়তা পেলে দেশটি খুব দ্রুত এ খাতে এগিয়ে যেতে সক্ষম হবে।
আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং নীতিমালার অসামঞ্জস্য দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করেছে কি না?
উত্তর : নিঃসন্দেহে কিছু ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং নীতিগত অসামঞ্জস্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের অগ্রগতিকে ধীর করেছে। একটি সোলার প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য অনেক সময় একাধিক সরকারি ও নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। এ প্রক্রিয়া দীর্ঘ হলে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় ও ব্যয় উভয়ই বৃদ্ধি পায়। অনেক ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীরা প্রকল্প বাস্তবায়নের আগেই অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হন। এ ছাড়া নীতিমালার ধারাবাহিকতা ও দীর্ঘমেয়াদি দিকনির্দেশনা বিনিয়োগকারীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন বিনিয়োগকারী সাধারণত ১৫ থেকে ২৫ বছরের পরিকল্পনা নিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ করেন। তাই নীতিগত স্থিতিশীলতা, স্বচ্ছতা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য অত্যন্ত জরুরি। আমরা মনে করি, একটি সমন্বিত ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ ব্যবস্থা এবং ডিজিটাল অনুমোদন প্রক্রিয়া চালু করা গেলে এ খাতের অগ্রগতি আরও ত্বরান্বিত হবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনে মূল প্রতিবন্ধকতা কী কী?
উত্তর : বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। প্রথমত, জমির সংকট। বৃহৎ সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য পর্যাপ্ত খালি জমি পাওয়া কঠিন। দ্বিতীয়ত, অর্থায়ন। অধিকাংশ প্রকল্পের প্রাথমিক বিনিয়োগ তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ায় অনেক উদ্যোক্তা আগ্রহী হলেও অর্থায়নের সীমাবদ্ধতায় পিছিয়ে যান। তৃতীয়ত, গ্রিড অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা। অনেক এলাকায় গ্রিডের সক্ষমতা কম থাকায় উৎপাদিত বিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত করার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ দেখা দেয়। চতুর্থত, দক্ষ জনবল ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজন রয়েছে। যদিও গত এক দশকে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে, তবু উন্নত প্রযুক্তি পরিচালনার জন্য আরও প্রশিক্ষিত জনবল দরকার। এ ছাড়া নীতিগত অনিশ্চয়তা, কর কাঠামো এবং আমদানি প্রক্রিয়ার জটিলতাও খাতটির বিকাশে প্রভাব ফেলে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির যন্ত্রাংশ আমদানির ক্ষেত্রে কী কী সুযোগ-সুবিধা প্রত্যাশা করেন?
উত্তর : বাংলাদেশে অধিকাংশ উচ্চমানের সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি স্টোরেজ সিস্টেম এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ফলে শুল্ক, ভ্যাট এবং অন্যান্য কর প্রকল্প ব্যয়ের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। আমরা আশা করি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতকে একটি কৌশলগত শিল্প হিসেবে বিবেচনা করে সোলার সরঞ্জাম আমদানির ক্ষেত্রে কর ও শুল্ক সুবিধা আরও সম্প্রসারণ করা হবে। পাশাপাশি কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স প্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুত করা গেলে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় কমে আসবে। একই সঙ্গে দেশীয় উৎপাদন শিল্প গড়ে তোলার জন্য কাঁচামাল আমদানিতেও বিশেষ সুবিধা প্রদান করা যেতে পারে।
সৌরবিদ্যুৎ প্রসারে সরকারের কাছ থেকে কী ধরনের সহায়তা আশা করেন?
উত্তর : বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎ খাতকে আরও এগিয়ে নিতে সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তবে খাতটির পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে আরও কিছু সহায়তা প্রয়োজন। আমরা চাই, শিল্প খাতে রুফটপ সোলার স্থাপনে বিশেষ প্রণোদনা ও স্বল্পসুদে অর্থায়নের ব্যবস্থা করা হোক। নেট মিটারিং নীতিমালাকে আরও আধুনিক ও ব্যবহারবান্ধব করা হোক। সরকারি ভবন, অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং শিল্প পার্কগুলোতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা হোক। এ ছাড়া গ্রিড আধুনিকায়ন, ব্যাটারি স্টোরেজ প্রযুক্তি এবং স্মার্ট এনার্জি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও সরকারি সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিনিয়োগবান্ধব নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। এ নীতিমালায় আপনার প্রত্যাশা কী?
উত্তর : আমাদের প্রত্যাশা, নতুন নীতিমালা শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং একটি পূর্ণাঙ্গ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার রূপরেখা প্রদান করবে। নীতিমালায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ সুরক্ষা, কর প্রণোদনা, স্বল্পসুদে অর্থায়ন, ব্যাটারি স্টোরেজ, ভার্চুয়াল নেট মিটারিং, কার্বন ক্রেডিট ট্রেডিং এবং গ্রিন ফাইন্যান্সিংয়ের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত। আমরা বিশ্বাস করি, একটি বাস্তবমুখী ও বিনিয়োগবান্ধব নীতিমালা বাংলাদেশকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে আঞ্চলিক নেতৃত্বের অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে।
বেসরকারিভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে করণীয় কী?
উত্তর : বেসরকারি খাত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি। তাই নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তারেও বেসরকারি খাতকে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করতে হবে। এজন্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন, সহজ ঋণসুবিধা, কর প্রণোদনা এবং দ্রুত অনুমোদন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিল্পোদ্যোক্তাদের কাছে সৌরবিদ্যুতের আর্থিক সুবিধা, বিদ্যুৎ ব্যয় সাশ্রয় এবং কার্বন নিরপেক্ষতার গুরুত্ব তুলে ধরতে হবে। বর্তমানে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান ব্যয় মোকাবিলায় রুফটপ সোলারে বিনিয়োগ করছে। এ প্রবণতাকে আরও উৎসাহিত করা গেলে বেসরকারি বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
নবায়নযোগ্য খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে?
উত্তর : বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সাধারণত নীতিগত স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি রিটার্নের নিশ্চয়তা খোঁজেন। তাই বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য স্বচ্ছ নিয়ন্ত্রক কাঠামো, দ্রুত অনুমোদন ব্যবস্থা, ওয়ান স্টপ সার্ভিস, মুনাফা প্রত্যাবাসনের নিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পাওয়ার পারচেজ অ্যাগ্রিমেন্ট (PPA) কাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল, বহুপাক্ষিক উন্নয়ন ব্যাংক এবং বৈশ্বিক গ্রিন ফান্ডগুলোর সঙ্গে সমন্বয় বাড়ালে বৃহৎ আকারের বিনিয়োগ আকর্ষণ করা সম্ভব হবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে আপনার প্রতিষ্ঠানের অবদান সম্পর্কে জানতে চাই।
উত্তর : সুপার স্টার রিনিউয়েবল এনার্জি লিমিটেড (SSREL) গত ১৩ বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে কাজ করে আসছে। দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের বিকাশ, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রসারে প্রতিষ্ঠানটি ধারাবাহিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। আমরা আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিল্প, কৃষি এবং সরকারি খাতে সমন্বিত সৌরবিদ্যুৎ সমাধান প্রদান করছি। এ পর্যন্ত আমরা ১১০ মেগাওয়াটেরও বেশি রুফটপ সোলার প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়ন করেছি, যা দেশের শিল্প খাতে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং কার্বন নিঃসরণ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কৃষি খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণে আমরা ২,৫০০-এরও বেশি সোলার সেচ পাম্প স্থাপন করেছি, যা কৃষকদের ডিজেলনির্ভরতা কমাতে এবং উৎপাদন ব্যয় হ্রাসে সহায়তা করছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এবং এনজিও পরিচালিত প্রকল্পে সোলার সমাধান প্রদান করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও বিদ্যুৎ সুবিধা পৌঁছে দিতে কাজ করেছি। এ ছাড়াও সুপার স্টার রিনিউয়েবল এনার্জি লিমিটেডের একটি শক্তিশালী জাতীয় ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক রয়েছে। সারা দেশে আমাদের ২০০-এরও বেশি অনুমোদিত ডিলার ও ব্যবসায়িক অংশীদারের মাধ্যমে সৌর সমাধান সরবরাহ করা হচ্ছে। এ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আমরা ইতোমধ্যে ৪ লাখেরও বেশি সোলার হোম সিস্টেম সরবরাহ ও পরিচালনা করেছি, যা দেশের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন, বিদ্যুতের সহজলভ্যতা বৃদ্ধি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। আমাদের প্রতিষ্ঠানের অন্যতম শক্তি হলো দক্ষ প্রকৌশলী, প্রশিক্ষিত টেকনিশিয়ান এবং অভিজ্ঞ প্রকল্প ব্যবস্থাপনা দল।