নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে গাইবান্ধার ধু-ধু বালুচরে নির্মিত বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ ২০০ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র এক অনন্য মাইলফলক। তিস্তা সোলার লিমিটেডের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এ কেন্দ্রটি ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে। আর আজ উত্তরবঙ্গের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ করে এক নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচন করছে। দেশের নানা কাঠামোগত ও নীতিগত চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করে তিস্তা সোলার প্রমাণ করেছে-বাংলাদেশে বৃহৎ আকারের সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র শুধু সম্ভবই নয়, বরং সফলতার সঙ্গে বাস্তবায়নযোগ্য। এ কেন্দ্র এখন পথ দেখাচ্ছে আরও বৃহৎ সৌর প্রকল্পের, হয়ে উঠছে ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ ও উদ্ভাবনের অনুপ্রেরণা। শুধু বিদ্যুৎ নয়, এ প্রকল্প বদলে দিয়েছে এক বিস্তীর্ণ জনপদের আর্থসামাজিক বাস্তবতা। কর্মসংস্থান, অবকাঠামো উন্নয়ন ও স্থানীয় অর্থনীতির পুনর্জাগরণে এটি হয়ে উঠেছে আশার আলো।
বর্তমানে বৈশ্বিক পরিস্থিতি এবং জ্বালানি সংকটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি কতটা সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে?
কভিড-পরবর্তী বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং সাম্প্রতিক একাধিক যুদ্ধ আমাদের স্পষ্টভাবে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে-জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ কতটা নাজুক অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে। দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৯০ শতাংশই এখনো জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল, যার মূল্যবৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যাহত হওয়া এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বিশ্বব্যাপী জ্বালানি নিরাপত্তাকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। এ প্রেক্ষাপটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি এক উজ্জ্বল সম্ভাবনার দিগন্ত খুলে দিচ্ছে, যা স্থিতিশীল, নিরাপদ এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে বৈশ্বিক জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম। সৌর, বায়ু, জলবিদ্যুৎ ও বায়োমাসের মতো স্থানীয়ভাবে উৎপাদনযোগ্য উৎসগুলোর মূল্য স্থিতিশীল, সরবরাহ ঝুঁকি কম এবং জ্বালানি নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে অত্যন্ত সহায়ক। ফলে আমদানিনির্ভরতা হ্রাস, বিদ্যুৎ উৎপাদনের দীর্ঘমেয়াদি খরচ নিয়ন্ত্রণ এবং সামগ্রিক জ্বালানি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবদান অপরিসীম। পাশাপাশি বৃহৎ পরিসরে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে জলবায়ু ঝুঁকি হ্রাস করে, যা ভবিষ্যতের টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে বাংলাদেশ পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকে এখনো কেন পিছিয়ে?
নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারে বাংলাদেশ এখনো পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে। ভারতের International Renewable Energy Agency (IRENA)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ভারতে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা দাঁড়িয়েছে ২০৪ গিগাওয়াট, পাকিস্তানে ১৭ গিগাওয়াট, অথচ বাংলাদেশের সক্ষমতা মাত্র ১ গিগাওয়াটের সামান্য বেশি। সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এই পিছিয়ে পড়া কেবল প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার ফল নয়; বরং নীতিগত দুর্বলতা, আর্থিক ঝুঁকি, অবকাঠামোগত ঘাটতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের অভাবের সম্মিলিত প্রতিফলন। ভারত, নেপাল ও চীন বহু বছর ধরে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করেছে, এমনকি পাকিস্তানও কভিড-পরবর্তী সময়ে একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ প্রণয়ন করে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। এর বিপরীতে বাংলাদেশ বিভিন্ন সময়ে নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করলেও একটি বাস্তবায়নযোগ্য, সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপের অভাবে প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গ্রিড অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, জমির সংকট, উচ্চ জনঘনত্ব এবং বিনিয়োগ পরিবেশের দুর্বলতা। অংশীজনদের মতামত ও বাস্তব চাহিদার ভিত্তিতে একটি সমন্বিত জাতীয় রোডম্যাপ প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ দ্রুতই নবায়নযোগ্য জ্বালানির পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সক্ষম হতে পারে।
আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং নীতিমালার অসামঞ্জস্য দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করেছে কি না?
অবশ্যই, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং নীতিমালার অসামঞ্জস্যতা বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের অগ্রগতিকে সুস্পষ্টভাবে বাধাগ্রস্ত করেছে। উদাহরণস্বরূপ, একটি গ্রিড সংযুক্ত সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য প্রায় ৩২টি পৃথক অনুমোদন প্রয়োজন হয়, যা বাংলাদেশের প্রচলিত প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতার প্রেক্ষাপটে এক ধরনের দুঃস্বপ্নের মতো। বিশেষ করে, প্রকল্পটি পরিবেশবান্ধব হওয়া সত্ত্বেও পরিবেশগত ছাড়পত্র গ্রহণ প্রক্রিয়া দীর্ঘ, জটিল এবং বহু স্তরবিশিষ্ট। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জমি সংস্থানের সমস্যা; সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে বিপুল পরিমাণ জমির প্রয়োজন হলেও জমি অধিগ্রহণ ও ক্রয়ের বিদ্যমান আইন ও নীতিমালা যুগোপযোগী নয়। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়। তদুপরি, নীতিমালা থাকলেও লক্ষ্য ও বাস্তবায়ন কৌশলের মধ্যে অসামঞ্জস্য, বিভিন্ন সংস্থার নীতির মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এবং সর্বোপরি নীতির ধারাবাহিকতার ঘাটতি একটি অসহনীয় দীর্ঘসূত্রতা তৈরি করে, যা দীর্ঘমেয়াদে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের অগ্রগতিকে উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যাহত করছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনে মূল প্রতিবন্ধকতা কী কী?
নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা নিঃসন্দেহে জমি সংস্থান। উচ্চ জনঘনত্বের দেশে যেকোনো উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য জমি পাওয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ, আর নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের ক্ষেত্রে এই চ্যালেঞ্জ আরও জটিল রূপ নেয়। বিশেষ করে বৃহৎ সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে প্রচলিত ধারণা হলো-এগুলো বিপুল পরিমাণ জমি দখল করে কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলে। বাস্তবে উপযুক্ত পরিকল্পনার মাধ্যমে অ্যাগ্রি সোলার বা সমন্বিত কৃষিভিত্তিক সৌর প্রকল্প স্থাপন করলে কৃষি উৎপাদন কমে না; বরং অনেক ক্ষেত্রে তা বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ সঠিক নকশা ও ব্যবস্থাপনায় জ্বালানি নিরাপত্তার পাশাপাশি খাদ্য নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা সম্ভব। তবে জমি-সংক্রান্ত মূল বাধা হলো জমি অধিগ্রহণ আইন ও নীতিমালা যুগোপযোগী না হওয়া, যা প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা সৃষ্টি করে এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করে। জমির পাশাপাশি আরেকটি বড় প্রতিবন্ধকতা হলো গ্রিড অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা। বাংলাদেশের বিদ্যমান গ্রিড এখনো উচ্চমাত্রার সৌর ও বায়ু শক্তির পরিবর্তনশীলতা সামলানোর মতো সক্ষম নয়; স্মার্ট গ্রিড, স্টোরেজ এবং ডিমান্ড রেসপন্স প্রযুক্তির ঘাটতি স্পষ্ট। ফলে গ্রিড আধুনিকায়ন এখন সময়ের দাবি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দীর্ঘ অনুমোদন প্রক্রিয়া, নীতিমালার অসামঞ্জস্যতা, বিনিয়োগ পরিবেশের দুর্বলতা এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও গবেষণার ঘাটতি, যা নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের অগ্রগতিকে আরও ধীর করে দেয়। তবুও আশার বিষয় হলো, এসব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও দেশে ইতোমধ্যে বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মিত হয়েছে। যেমন-গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে ৬৫০ একর জমিতে প্রতিষ্ঠিত ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার তিস্তা সোলার প্রকল্প।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির যন্ত্রাংশ আমদানির ক্ষেত্রে কী কী সুযোগসুবিধা প্রত্যাশা করেন?
শুধু নবায়নযোগ্য জ্বালানি নয়, সামগ্রিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্পর্কিত যন্ত্রাংশ আমদানিতে সরকারের করনীতি ইতোমধ্যেই উল্লেখযোগ্য সহায়তা প্রদান করে। এসআরও ১৮১, ২৫৪ এবং ১৫১-এর আওতায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত বহু গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি শুল্কমুক্তভাবে আমদানি করা সম্ভব। তবে এ সুবিধা রুফটপ সোলার স্থাপনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, যা খাতটির দ্রুত সম্প্রসারণে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে রয়ে গেছে। এর পাশাপাশি কোন কোন যন্ত্রাংশ শুল্কমুক্ত সুবিধার আওতায় পড়ে তা নির্ধারণ করাও প্রায়শই জটিল ও সময়সাপেক্ষ, যা উদ্যোক্তাদের পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ সিদ্ধান্তকে অনিশ্চিত করে তোলে। এই প্রেক্ষাপটে জরুরি হলো-রুফটপ সোলার প্রকল্পগুলোকে শুল্কমুক্ত সুবিধার আওতায় আনা এবং শুল্কমুক্ত পণ্যের এইচএস কোডভিত্তিক একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ তালিকা প্রকাশ করা, যাতে প্রযোজ্যতা নিয়ে সব ধরনের বিভ্রান্তি দূর হয় এবং উদ্যোক্তারা নিশ্চিন্তে বিনিয়োগ পরিকল্পনা করতে পারেন। পাশাপাশি প্রয়োজন আরও কিছু নীতিসহায়তা, যেমন-দ্রুত ও সরলীকৃত আমদানি অনুমোদন প্রক্রিয়া, দ্রুত টেস্টিং ও সার্টিফিকেশন সুবিধা, প্রাধান্যভিত্তিক কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স, বন্দর চার্জ হ্রাস এবং বন্দরগুলোতে বিশেষ গ্রিন চ্যানেল সুবিধা প্রতিষ্ঠা। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির যন্ত্রাংশ আমদানি আরও সহজ, দ্রুত ও বিনিয়োগবান্ধব হবে; যা দেশের জ্বালানি রূপান্তরকে ত্বরান্বিত করবে। তদুপরি সরকারের উচিত বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের জন্য রুফটপ বা ক্ষুদ্র পরিসরে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্ল্যান্ট ও যন্ত্রপাতি কাস্টমস ডিউটি, রেগুলেটরি ডিউটি, অগ্রিম আয়কর ও ভ্যাট থেকে অব্যাহতি দিয়ে শুল্কমুক্ত আমদানির সুযোগ প্রদান করা। নেট মিটারিং ব্যবস্থার আওতায় কোনো ভবন মালিক রুফটপ সোলার স্থাপন করলে সেই বিনিয়োগের ওপর কর রেয়াত দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে।
সৌরবিদ্যুৎ প্রসারে সরকারের কাছ থেকে কী ধরনের সহায়তা আশা করেন?
সৌরবিদ্যুৎ দ্রুত সম্প্রসারণের জন্য সরকারের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হলো একটি শক্তিশালী, বাস্তবসম্মত এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতিকাঠামো প্রণয়ন করা। সাম্প্রতিক টেন্ডার প্রক্রিয়ায় যে অসংগতি ও সীমাবদ্ধতা দেখা গেছে, তা সংশোধন করে একটি স্বচ্ছ, পূর্বানুমানযোগ্য এবং বাজার উপযোগী নীতি গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। একইভাবে মার্চেন্ট পাওয়ার পলিসি যুগোপযোগী পুনর্বিন্যাস করা প্রয়োজন, যাতে বেসরকারি খাত আরও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বিনিয়োগে এগিয়ে আসতে পারে। দ্বিতীয়ত, সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য জমি ক্রয় ও অধিগ্রহণ সংক্রান্ত নীতিমালার আধুনিকায়ন ও সরলীকরণ অপরিহার্য। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার প্রশাসনকে আরও ক্ষমতায়ন করলে প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। তৃতীয়ত, প্রয়োজন একটি যৌক্তিক ও আধুনিক ট্যারিফ নির্ধারণ নির্দেশিকা। বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন এখনো প্রারম্ভিক পর্যায়ে; তাই পরিপক্ব বাজারের ট্যারিফের সঙ্গে অযৌক্তিক তুলনা না করে একটি বাস্তবসম্মত ট্যারিফ অনুমোদন করলে তা খাতটির বিকাশে শক্তিশালী প্রণোদনা হিসেবে কাজ করবে। বাজার পরিণত হলে স্থাপন ব্যয় স্বাভাবিকভাবেই কমে আসবে এবং তখন প্রতিযোগিতামূলক ট্যারিফ স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে। এ ছাড়া সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে সরকারের আরও কিছু কৌশলগত সহায়তা প্রয়োজন। যেমন-সিঙ্গেল উইন্ডো সিস্টেমে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে অনুমোদন, গ্রিড অবকাঠামোর আধুনিকায়ন, বিনিয়োগবান্ধব আর্থিক কাঠামো বিনির্মাণ, রুফটপ সোলারের জন্য বিশেষ প্রণোদনা এবং বন্দর ও লজিস্টিক সুবিধার উন্নয়ন ইত্যাদি। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সৌরবিদ্যুৎ খাত শুধু দ্রুত সম্প্রসারিতই হবে না, বরং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি টেকসই ভিত্তিও তৈরি করবে।
এবারের বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের বরাদ্দ নিয়ে আপনাদের প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে কি না?
প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট ২০২৬-২০২৭ এ পরিবেশবান্ধব ও টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে স্বনির্ভরতা অর্জনে সরকার ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নিয়েছে। বাজেটে ২০৩০ সাল নাগাদ দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ শতাংশ। সেই সঙ্গে এ খাতের অপরিকল্পিত নীতি এবং এলএনজি ও জ্বালানি তেলের ওপর চরম আমদানিনির্ভরতা কাটিয়ে উঠতে এ বাজেট সাহায্য করবে বলে আমরা মনে করি। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সৌর উপকরণের শুল্ক-কর অব্যাহতি এবং ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল শিল্পকে যে নজিরবিহীন ছাড় দেওয়া হয়েছে, তা দেশের জ্বালানি রূপান্তরকে বহুদূর এগিয়ে নিয়ে যাবে। এ ছাড়া এ খাতের চুক্তি অনুমোদন প্রক্রিয়া হতে হবে স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক এবং আন্তর্জাতিক মানসম্মত। যেন প্রতিটি ধাপ বিনিয়োগকারীর কাছে বিশ্বাসের বার্তা পৌঁছে দেয়। নীতিমালায় বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি, বাস্তবায়ন চুক্তি এবং ভূমি ব্যবস্থাপনা চুক্তির নমুনা সংযুক্ত থাকলে এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও গ্রহণযোগ্যতা পাবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জমি স্বল্পতার একটি বিষয় আছে। এক্ষেত্রে বিকল্প কী কী উপায়ে এ খাত থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায় বলে মনে করেন?
রুফটপ বা ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে অনেকে বাসাবাড়ি, অফিস, কারখানা, স্কুল-কলেজের ছাদ ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করেন। এক্ষেত্রে আলাদা জমির প্রয়োজন হয় না। এতে গ্রিডের ওপর চাপ কমে। আবার ফসলের জমির ওপর উঁচু কাঠামোয় সৌর প্যানেল স্থাপন করা যায়। এখানে একই জমিতে কৃষিকাজ ও বিদ্যুৎ উৎপাদন একসঙ্গে করা যায়। জলাধার, হ্রদ, খনি-গর্ত বা বাঁধের জলাশয়ে সৌর প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। এখানে কৃষিজমি দখল হয় না। পানির বাষ্পীভবনও কমে। আবার ভবনের দেয়াল, জানালা ও ছাদে সৌর সেল সংযুক্ত করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। নগর ও শহর এলাকার জন্য এ পদ্ধতি খুবই কার্যকর।
বেসরকারিভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে করণীয় কী?
বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে প্রয়োজন একটি স্থিতিশীল, সময়োপযোগী ও পূর্বানুমানযোগ্য নীতিকাঠামো, যেখানে টেন্ডার প্রক্রিয়া হবে স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানসম্মত, আর বিদ্যুৎ ক্রয়, বাস্তবায়ন এবং ভূমি ব্যবস্থাপনার নমুনা চুক্তি নীতিমালায় সংযুক্ত থাকবে; জমি অধিগ্রহণ ও ব্যবস্থাপনা নীতির আধুনিকায়ন এবং অ্যাগ্রি সোলার/ফ্লোটিং সোলারের মতো বিকল্প স্বীকৃতি বিনিয়োগের পথ আরও সহজ করবে; প্রকল্প ব্যয়ভিত্তিক যৌক্তিক ট্যারিফ নির্ধারণ, স্মার্ট গ্রিড ও স্টোরেজসহ গ্রিড আধুনিকায়নের রূপরেখা, স্বল্প সুদের দীর্ঘমেয়াদি ঋণ, রিফাইন্যান্স স্কিম ও বৈদেশিক মুদ্রা বরাদ্দের মতো আর্থিক প্রণোদনা বিনিয়োগকারীর ঝুঁকি কমাবে; পাশাপাশি রুফটপ সোলারের জন্য শুল্ক ভ্যাট ছাড়, নেট মিটারিং সহজীকরণ ও কর রেয়াত এবং এইচএস কোডভিত্তিক শুল্কমুক্ত যন্ত্রাংশের তালিকা, দ্রুত কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স ও গ্রিন চ্যানেল সুবিধা আমদানি লজিস্টিককে আরও কার্যকর করবে। সব মিলিয়ে নীতি স্থিতিশীলতা, সহজ অনুমোদন, আধুনিক গ্রিড, যৌক্তিক ট্যারিফ ও শক্তিশালী আর্থিক লজিস্টিক সহায়তাই বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির মূল চাবিকাঠি।
নবায়নযোগ্য খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে?
শুধু নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত নয়, বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো একটি স্থিতিশীল ও সময়োপযোগী নীতি কাঠামো, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থা সৃষ্টির ভিত্তি স্থাপন করে। এর পাশাপাশি, ঝুঁকি বিবেচনায় বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য সহজে মুনাফা নিজ দেশে স্থানান্তরের সুযোগ, বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা এবং বিভিন্ন শুল্ক ও কর ছাড় প্রদান করা যেতে পারে। বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারজনিত ঝুঁকি হ্রাসে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিতে (PPA) মুদ্রা ঝুঁকি সুরক্ষা সংক্রান্ত বিশেষ বিধান অন্তর্ভুক্ত করা বিনিয়োগকে আরও নিরাপদ করবে।