শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ২২:১৪

মরার পরে খ্যাতি

তানভীর আহমেদ

মরার পরে খ্যাতি
Google News

পরিবর্তন চলমান প্রক্রিয়া। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছুই বদলে যায়। আজ যাঁর মূল্যায়ন নেই, অদূর ভবিষ্যতে তিনি হয়ে ওঠেন শিরোমণি। এমন উদাহরণ ভূরি ভূরি। ইতিহাস খুঁড়লেই চোখে পড়বে এমন জ্ঞানী-গুণী মনীষীদের, যাঁরা বেঁচে থাকতে প্রাপ্য সম্মান পাননি। মেলেনি খ্যাতি। উল্টো তাঁরা হয়েছেন উপহাসের পাত্র। তাঁদের মেধা সমাজ ও রাষ্ট্রের চোখে কখনো কখনো হয়েছে নিন্দিত, অপরাধ।  যে কারণে বেঁচে থাকতে তাঁরা অবজ্ঞার শিকার হয়েছেন, অভিযুক্ত অপরাধী হিসেবে বিচার শেষে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত হয়েছেন। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় ভুল ভেঙেছে মানুষের, সমাজের, রাষ্ট্রের। তাঁদের মেধার গভীরতা, সত্যতা মিলেছে আজ।  এখন তাঁদের যুক্তি, তত্ত্ব, দর্শন, বাণী সবই পাঠ্য, অনুসরণীয়। তাঁদের বাণী উচ্চারিত হয় মানুষের মুখে মুখে।  তাঁদের তত্ত্ব দিক প্রদর্শনকারী বলেই প্রশংসিত সব মহলে।

 

বন্দীদশায় মৃত্যু হয় গ্যালিলিওর

গ্যালিলিও গ্যালিলি, জ্যোতির্বিদ

ইতালির বিখ্যাত সমুদ্রবন্দর পিসায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন গ্যালিলিও। আধুনিক বিজ্ঞান তাঁকে ইতিহাসের সেরা গণিতবিদ, পদার্থবিদ, জ্যোতির্বিদ ও দার্শনিক বলে স্বীকার করলেও বেঁচে থাকতে তাঁর বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব মেনে নিতে পারেনি সমাজ ও রাষ্ট্র। পূর্ববর্তী বিজ্ঞানী টলেমি দাবি করেছিলেন, সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে।

কিন্তু নিজের উদ্ভাবিত টেলিস্কোপ নিয়ে পরীক্ষা শেষে গ্যালিলিও বললেন- না, সূর্য নয়, পৃথিবীই বরং সূর্যের চারদিকে ঘোরে। একই দাবি করেছিলেন কোপার্নিকাসও। এই মতবাদ দেওয়ায় গ্যালিলিও কোপার্নিকাসের মতো চার্চের রোষানলে পড়লেন। শাস্তির মুখোমুখি হয়ে হয় বিখ্যাত এই দার্শনিককে। তাঁকে গৃহবন্দী করা হয়। বন্দীদশায়ই তাঁর মৃত্যু হয়। মূল্যায়ন দূরে থাক, মৃত্যুর ৩০০ বছর পরও তিনি চার্চের চোখে অপরাধীই ছিলেন।  অথচ এখন তাঁর বন্দনা বিশ্বজুড়ে।

 

 

যুবকদের বিপথে নেওয়ায় দোষী সাব্যস্ত হন সক্রেটিস

সক্রেটিস, প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক

সক্রেটিসকে যুক্তি ও মুক্তচিন্তার জনক বলতে দ্বিধা নেই। প্রাচীন এই গ্রিক দার্শনিকের বাণী শতাব্দী থেকে শতাব্দী মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হচ্ছে। যদিও জীবদ্দশায় তাঁর পান্ডিত্য ও জ্ঞানের পরিসীমা উল্টো অপরাধের কাতারে নাম লেখায়। অভিযোগ ওঠে, তিনি প্রচলিত দেবতাদের উপেক্ষা করছেন।

তাঁর ভাষণ, জ্ঞান যুবকদের নৈতিক চরিত্র কলুষিত করছে, তারা বিপথগামী হচ্ছে। কিছু ভক্ত জুটলেও তাঁর যুক্তি ও দর্শন মেনে নেয়নি সমাজ ব্যবস্থার বড় অংশ। যে কারণে তাঁকে বিচারের মুখোমুখি হতে হয়। এথেন্সের উন্মুক্ত ময়দানে ৫০০ বিচারকের সামনে তিনি ৬০ ভোটে পরাজিত হন। দোষী সাব্যস্ত হওয়া সক্রেটিসের মৃত্যুদন্ড হেমলক বিষপানের মাধ্যমে কার্যকর করা হয়েছিল। বিশ্ববাসী এখন তাঁকে জ্ঞানী-গুণী, ন্যায়পরায়ণ বলে স্বীকার করেছে। তাঁর দর্শন প্রশংসিত সর্বত্র। মনীষী সক্রেটিসের চিন্তা ও যুক্তি কালজয়ী, আজও তার দর্শন সবাইকে প্রভাবিত করছে।

 

বেঁচে থাকতে কাফকার মিলেছে শুধু অবজ্ঞা

ফ্রানৎস কাফকা, সাহিত্যিক

জার্মান ভাষায় অনবদ্য উপন্যাস ও ছোট গল্পের লেখক ফ্রানৎস কাফকা জীবিত অবস্থায় তেমন মূল্যায়ন পাননি। তাঁর সাহিত্যকর্মের বৈচিত্র্য মোটেই প্রশংসিত হয়নি। উল্টো তাঁকে নিয়ে সমালোচনা, অর্ধসত্য ও অসত্য মিথের ছড়াছড়ি রয়েছে। কাফকা একজন আইনজীবী হিসেবে প্রশিক্ষণ নিলেও লেখক হিসেবেই সময় ব্যয় করেছেন। কিন্তু তাঁর লেখা জনসম্মুখে আসেনি। নানা প্রতিকূলতা তাঁকে পর্যুদস্ত করেছে।

যক্ষ্মা রোগেও তিনি বিছানায় শায়িত ছিলেন জীবনের লম্বা সময়। কাফকা তাঁর সব লেখা ম্যাক্স ব্রডকে তাঁর মৃত্যুর পর পুড়িয়ে ফেলতে অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু ম্যাক্স ব্রড তা করেননি। কাফকার মৃত্যুর পর পাঠক, সমালোচকরা তাঁর ছোট গল্পের প্রশংসা করেন। আজ তাঁর সাহিত্যের মূল্যায়ন হয়। তাঁর লেখায় বিচিত্র ও উদ্ভট সব ঘটনাপ্রবাহ এমনভাবে ঘটে, যেন সেগুলোয় অস্বাভাবিকতার কিছু নেই।

 

 

মানুষের কাছে হাসির পাত্র ছিলেন ভ্যান গফ

ভিনসেন্ট ভ্যান গফ, চিত্রশিল্পী

দুনিয়া কাঁপানো চিত্রশিল্পী ভিনসেন্ট ভ্যান গফ। বেঁচে থাকতে তাঁর চিত্রশিল্পের কোনো খোঁজই পায়নি বিশ্ব। তবে অনেকেই জানেন না যে, ভ্যান গফ চিত্রশিল্পীর ক্যারিয়ার বেছে নিয়েছিলেন যখন তাঁর ২৮ বছর বয়স। জীবনে শুরুর দিকে পাদ্রীর জীবন বেছে নিয়েছিলেন। ধর্মচর্চায় মন দিয়েছিলেন। দরিদ্রতা ও অসামাজিক বলে মানুষ তাকে এড়িয়ে চলত।

মাত্র ২০ বছর বয়সে তিনি পুরোদমে ছবি আঁকায় মন দেন। তাঁর আঁকা পেইন্টিংগুলোয় সূর্যের সোনালি আলো ও উজ্জ্বল রঙের বর্ণালি দেখা গেলেও তাঁর জীবন ছিল একেবারেই উল্টো। মানুষের কাছে হাসির পাত্র ছিলেন, দরিদ্র বলে অবজ্ঞার পাত্র হয়েছেন। যে কারণে আত্মহত্যা করে জীবনের ইতি টানেন। মৃত্যুর পর তাঁর আঁকা ৯০০ ছবি, ১ হাজার ১০০ ড্রইং ও স্কেচ উদ্ধার হয়। ফ্রান্স, বেলজিয়াম ও জার্মানি পেরিয়ে পেইন্টিংগুলো বিশ্বব্যাপী ব্যাপক প্রশংসিত হয়।

 

 

পুড়িয়ে মারা হয় ব্রুনোকে

জিওর্দানো ব্রুনো, গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিদ

১৫৪৮ সালে ইতালিতে জন্ম নেন ব্রুনো। তিনি ছিলেন একাধারে দার্শনিক, গণিতবিদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও জ্যোতিষী। মাত্র ২৪ বছর বয়সে ব্রুনো পাদ্রি হিসেবে মনোনীত হন। তাঁর মুক্ত ও অনুসন্ধানী চিন্তা এবং সে যুগে গির্জা কর্তৃক বাজেয়াপ্ত বই পড়ার কারণে তিনি প্রচলিত ধর্ম বিশ্বাস ও শাসক গোষ্ঠীর মুখোমুখি হন। জীবনের বেশির ভাগ সময়ই তিনি পালিয়ে বেড়ান।

তিনি এই মহাবিশ্বের মতো আরও মহাবিশ্ব আছে, পৃথিবী গোল, সূর্য এই মহাবিশ্বের কেন্দ্র নয় এবং এটি একটি নক্ষত্র ছাড়া আর কিছুই নয়- এই ধারণা পোষণ করায় চার্চের রোষানলে পড়েন। তাঁকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়। দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় সবার সামনে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে পুড়িয়ে মারা হয় তাঁকে। কিন্তু পরবর্তীতে প্রমাণ হয় তাঁর তত্ত্বই ঠিক। এখন ইতিহাস কাঁপানো গণিতবিদ, জ্যোতির্বিদ হিসেবে তিনি সর্বত্র সমাদৃত।

 

 

বিজ্ঞানচর্চা করায় খুন করা হয় হাইপেশিয়াকে

হাইপেশিয়া, গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিদ

৩৭০ খ্রিস্টাব্দে মিসরের আলেকজান্দ্রিয়ায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন হাইপেশিয়া। ইতিহাসবিদদের মতে, হাইপেশিয়া মুক্তবুদ্ধি চর্চাকারীদের মধ্যে ইতিহাসের শেষ প্যাগান সায়েন্টিস্ট। কিন্তু নারী বিজ্ঞানী ও মুক্তবুদ্ধি চর্চাকারী বলে চার্চের চোখে প্রবল সমালোচিত ছিলেন। অল্প বয়সে হাইপেশিয়া প্লেটো-সক্রেটিসদের মতো বড় বড় গণিতবিদ এবং দার্শনিকদের অসংখ্য বই পড়ে ফেলেন। এতেই তাঁর গণিত ও দর্শনে দক্ষতা সেকালের অনেক পন্ডিতকেও ছাড়িয়ে যায়। তাঁর গোটা জীবন তিনি গণিতের জন্য উৎসর্গ করেন। বিয়ে করেননি। গণিত, দর্শন, জ্যোতির্বিদ্যা ও মেকানিক্সের জটিল বিষয়গুলোয় হাইপেশিয়া ছিলেন জনপ্রিয় শিক্ষিকা।

আলেকজান্দ্রিয়ার গভর্নর অরেস্টেসও তাঁর জ্ঞানে মুগ্ধ ছিলেন। রাজনৈতিক কারণ ছাড়াও নারী বিজ্ঞানী, মুক্তবুদ্ধি চর্চাকারী বলেই তাঁকে মৌলবাদী সন্ন্যাসী ও চার্চের প্যারাবোলানসরা হত্যা করে।

 

 

মৃত্যুর ৫০০ বছর পর বীরের মর্যাদা পান কোপার্নিকাস

নিকোলাস কোপার্নিকাস, জ্যোতির্বিদ

এক সময় মানা হতো, পৃথিবী সৌরজগতের কেন্দ্র। আর পৃথিবীকে কেন্দ্র করেই সব গ্রহ ঘুরছে। কিন্তু বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ নিকোলাস কোপার্নিকাস প্রথমবারের মতো বললেন- না, পৃথিবী নয়, সূর্যকে কেন্দ্র করে অন্য গ্রহগুলো আবর্তিত হচ্ছে। তিনি লিখলেন, ‘দ্য রেভিলিউশানিরস অরবিয়াম কোয়েনেসিটিয়াম’। এতে দেড় হাজার বছরের টলেমির মতবাদ ভ্রান্ত বলে প্রমাণিত হয়। ধর্মযাজকরা ক্ষেপে ওঠেন।

ক্যাথলিক চার্চের তীব্র সমালোচনা ও অবজ্ঞার সম্মুখীন হয়েছিলেন কোপার্নিকাস। তাঁকে ধর্মদ্রোহী ঘোষণা দিয়েছিল চার্চ। যে কারণে মৃত্যুর পর নাম-পরিচয়হীনভাবে অবহেলার সঙ্গে সমাধিস্থ করা হয় তাঁকে। কিন্তু তিনি যে ঠিক, গ্যালিলিও তার সত্যতা প্রমাণ করেন। এক সময় ভুল ভাঙে চার্চের। কোপার্নিকাসের মৃত্যুর ৫০০ বছর পর পোলিশ ক্যাথলিক চার্চ তাঁকে পুনরায় বীরের মর্যাদায় সমাহিত করেছে।

 

 

জীবদ্দশায় এমিলির কবিতা মূল্যায়ন করেনি কেউ

এমিলি ডিকিনসন, কবি

যুক্তরাষ্ট্রের কবি এমিলি ডিকিনসন। জন্ম যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসে। নীরবে লিখে গেছেন একের পর এক কবিতা। সেসব ছাপার ব্যাপারে তাঁর খুব একটা আগ্রহ ছিল না। জীবিত থাকা অবস্থায় তাঁর মাত্র সাতটি কবিতা ছাপা হয়েছিল। প্রকাশকরা একজন নারীর কাছ থেকে ‘মেয়েলিপনা’ কবিতা আশা করেছিলেন। কিন্তু ব্যতিক্রম ছিলেন এমিলি ডিকিনসন।

যে কারণে তাঁর সব কবিতা অপ্রকাশিতই থেকে যায়। সে সংখ্যাটাও চমকে দেওয়ার মতো। প্রায় ১ হাজার ৭০০ কবিতা লিখেছিলেন এমিলি। জীবন সম্পর্কে তাঁরও বিতৃষ্ণা জেগে উঠেছিল। তাঁর সাহিত্য সমাজে কোনো মূল্যায়ন পায়নি, মেলেনি স্বীকৃতি। বিয়ে করেননি, ব্যক্তিজীবনও তাঁর সুখকর ছিল না। মৃত্যুর পর তাঁর বোন এমিলির লেখা অপ্রকাশিত কবিতার খোঁজ দেন। তবে বর্তমানে মার্কিন নারী কবি হিসেবে এমিলিকে বিশ্বের সেরাদের একজন বলেই মানা হয়।