একজন জেলা প্রশাসক মানেই জেলার লাখো মানুষের নিরাপত্তা, সরকারি নীতি বাস্তবায়ন আর উন্নয়নের গুরুদায়িত্ব। দিনভর মিটিং, ফাইল সই, মাঠ পর্যায়ে পরিদর্শন আর প্রটোকলের কঠোর শৃঙ্খলে ঘেরা জীবন। কিন্তু এই কঠিন
প্রশাসনিক আবরণের আড়ালে যখন একজন মমতাময়ী মা বাস করেন, তখন সেই জীবনটা কেমন হয়? পেশাদারিত্বের ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তা আর মাতৃত্বের রেশমি কোমলতার এই যে সহাবস্থান, তা নিয়ে কথা বলেছেন ঢাকার জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মিজ ফরিদা খানম। বিশ্ব মা দিবস উপলক্ষে তাঁর প্রশাসনিক ও ব্যক্তিগত জীবনের সেই না বলা গল্পগুলো তুলে ধরছেন বাংলাদেশ প্রতিদিনের আদালত প্রতিবেদক -তুহিন হাওলাদার
প্রশ্ন : মা দিবসের শুভেচ্ছা। জেলা প্রশাসক এবং মা-এই দুই সত্তাকে আপনি প্রতিনিয়ত কীভাবে সমন্বয় করেন?
উত্তর : আসলে এই সমন্বয়টা অনেক সময় সরু সুতোর ওপর দিয়ে হাঁটার মতো এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। যখন আমি জেলা প্রশাসকের চেয়ারে বসি, তখন আইন, বিধিবিধান আর সরকারি প্রটোকলই আমার শেষ কথা। সেখানে ব্যক্তিগত আবেগ বা সম্পর্কের জায়গা খুব সংকীর্ণ। কিন্তু যখন আমি মা, তখন আমি পৃথিবীর সবচেয়ে সাধারণ একজন মানুষ। অফিসের গুরুত্বপূর্ণ ফাইল সই করতে করতে অনেক সময় হয়তো মনের অজান্তেই মাথার কোণে সন্তানের স্কুল, তার খাওয়াদাওয়া বা স্বাস্থ্যের কথা উঁকি দেয়। তবে আমি মনে করি, মাতৃত্ব আমাকে একজন আরও ভালো প্রশাসক হতে সাহায্য করেছে। কারণ, একজন মা যেমন অপরিসীম ধৈর্য আর মমতা নিয়ে পুরো সংসার সামলান, আমিও তেমনি সেই ধৈর্য নিয়ে জেলার প্রতিটি সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করি।
প্রশ্ন্ন : প্রশাসনিক গুরুদায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কি কখনো মাতৃত্বের টান বা অবহেলার অপরাধবোধ কাজ করে?
উত্তর : অবশ্যই করে। এটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। ধরুন, হয়তো কোনো জরুরি রাষ্ট্রীয় মিটিং চলছে বা গভীর রাতে কোনো দুর্যোগ মোকাবিলায় মাঠে আছি, ঠিক তখন খবর পেলাম বাড়িতে সন্তান অসুস্থ বা সে একা বোধ করছে। এই যে দোটানা, এটা সব কর্মজীবী মায়েরই এক চিরন্তন লড়াই। অনেক সময় ওর বিশেষ দিনগুলোতে বা স্কুলের অনুষ্ঠানে আমি পাশে থাকতে পারি না। তখন মনে মনে এক ধরনের অপরাধবোধ কাজ করে। কিন্তু পরক্ষণেই আমি নিজেকে বোঝাই এবং তাকেও বলি যে, আমি যদি আমার ওপর অর্পিত রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করি, তবে আমার সন্তানও একদিন শিখবে যে দেশের সেবা করা এবং মানুষের কল্যাণে কাজ করা কতটা সম্মানের। সে হিসেবে প্রতিটি মা-ই একজন অঘোষিত প্রশাসক।
প্রশ্ন : দারুন দর্শন। ‘প্রতিটি মা-ই একেকজন অঘোষিত প্রশাসক’ এটার ব্যাখ্যা যদি দিতেন।
উত্তর : আমি এটা অন্তরের গভীর থেকে বিশ্বাস করি। আমাদের সমাজের প্রতিটি মা-ই একেকজন অসাধারণ ম্যানেজার বা প্রশাসক। তাঁরা যেভাবে সীমিত বাজেটে সংসার পরিচালনা করেন, সন্তানদের সঠিক শিক্ষা ও মূল্যবোধ দিয়ে বড় করেন এবং পরিবারের প্রতিটি সদস্যের প্রয়োজন মেটান- তা কোনো বড় প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনের চেয়ে কম নয়। মায়েদের এই ব্যবস্থাপনা দক্ষতা সহজাত। আমি মায়েদের বলব, আপনারা নিজেদের কোনোভাবেই ছোট বা পিছিয়ে পড়া ভাববেন না। আপনাদের ত্যাগ এবং সুনিপুণ গৃহ ব্যবস্থাপনাই এই সমাজ ও রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি। একজন মা যখন একটি পরিবারকে শৃঙ্খলায় রাখেন, তিনি আসলে পরোক্ষভাবে রাষ্ট্রকেই শক্তিশালী করেন।
প্রশ্ন্ন : আজকের এই যান্ত্রিক ও ব্যস্ত জীবনে মা ও সন্তানের নিবিড় সম্পর্ককে অটুট রাখতে আপনার পরামর্শ কী?
উত্তর : আমি মনে করি সময়ের পরিমাণের চেয়ে ‘গুণগত সময়’ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমি সারা দিন যতই ব্যস্ত থাকি না কেন, বাসায় ফিরে যতটুকু সময় পাই, চেষ্টা করি পুরোপুরি সন্তানের সঙ্গে কাটাতে। সেই সময়ে কোনো অফিসের ফাইল, মোবাইল ফোন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেন আমাদের মাঝে বাধা না হয়। শুধু গল্প করা, একসঙ্গে খাওয়া বা তার মনের কথা শোনা- এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই সম্পর্কের ভিত শক্ত করে।
প্রশ্ন : এই দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য প্রশাসনিক ক্যারিয়ার গড়ে তোলার পেছনে আপনার মা আপনাকে কতটা অনুপ্রাণিত করেছেন?
উত্তর : আজকের এই অবস্থানের পেছনে আমার মায়ের অবদান ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। আমার মা-ই আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ মেন্টর। ছোটবেলা থেকেই তিনি আমাকে শিখিয়েছেন কীভাবে প্রতিকূলতার মাঝেও মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হয় এবং সততার পথে অবিচল থাকতে হয়।
প্রশ্ন : আপনি কি মনে করেন একজন নারী প্রশাসক হওয়ার কারণে সাধারণ মানুষ আপনার কাছে পৌঁছাতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে?
উত্তর : এটি জেন্ডার দিয়ে বিচার করা কঠিন তবে হ্যাঁ, মাতৃত্বের অভিজ্ঞতা একজন নারীকে প্রাকৃতিকভাবেই অনেক বেশি সহমর্মী ও ধৈর্যশীল করে তোলে। কোনো সংকটে বা দুর্যোগে যখন আমি দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াই, তখন আমার মধ্যে যে মমতা কাজ করে, সাধারণ মানুষ তা সহজেই অনুভব করতে পারে। বিশেষ করে নারীরা তাঁদের সমস্যার কথা আমার কাছে এসে নিঃসংকোচে বলতে পারেন।
প্রশ্ন : জেলা প্রশাসক হিসেবে নয়, একজন সাধারণ মা হিসেবে আপনার নিজের ভবিষ্যৎ স্বপ্ন ও প্রত্যাশা কী?
উত্তর : একজন মা হিসেবে আমার ব্যক্তিগত স্বপ্ন খুব সাধারণ। আমার সন্তান যেন একজন সত্যিকারের সংবেদনশীল ও ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে। সে যেন বড় কোনো পদের চেয়ে বড় হৃদয়ের অধিকারী হয় এবং মানুষের দুঃখ দেখে ব্যথিত হয়। আর একজন নাগরিক হিসেবে আমি এমন এক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি, যেখানে কোনো মা-কে চিকিৎসার অভাবে ধুঁকতে হবে না, কোনো সন্তানকে অর্থের অভাবে পড়ালেখা ছাড়তে হবে না এবং প্রতিটি মা সমাজে সর্বোচ্চ সম্মানের সঙ্গে মাথা উঁচু করে বাঁচবেন।