Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : ২ মে, ২০১৮ ১৮:৩৯ অনলাইন ভার্সন
যে কারণে বন্য পাখি পালা যাবে না
কৌশিক সরকার কাব্য:
যে কারণে বন্য পাখি পালা যাবে না
সংগৃহীত ছবি
bd-pratidin

'খাঁচায় যে সবাই পাখি পালেন সেটাতো ওয়াইল্ড (বন) থেকে ধরেই খাঁচায় পুরেছেন, না কি?যত্তসব সেন্টিমেন্টাল কথা -ওয়াইল্ড পাখি পালা যাবে না!' দু'চারদিন যেতে না যেতেই এই প্রশ্ন নিয়ে হাজির হন অনেকেই। এটা আসলেই ১০০ ভাগ সত্য কথা আমরা যে পাখি খাঁচায় পালি, তা ওয়াইল্ড থেকেই আনা! তাহলে আবার আমরাই ওয়াইল্ড বার্ড বা বন্য পাখি খাঁচায় রাখার বিপক্ষে কেন?

উত্তরটা প্রশ্নকর্তা নিজেই জানেন! তা হল আপনার আমার লোভ! মানুষের লালসা! নিজের শখের জন্য আমরা যে বন্য পাখি খাঁচায় রাখার লালসা কোনদিনই বাদ দিতে পারবো না। এটা জেনেই কিছু মানুষ সুন্দর সুন্দর কিছু পাখি ধরে আপনার আমার লালসা মেটাতে সেই সব প্রজাতির কিছু বাড়তি পাখি বানিয়ে (প্রজনন ঘটিয়ে) আমাদের দিয়ে দিয়েছে- "নে ভাই, তোরা শখ মেটা, কিন্তু জঙ্গলের দিকে আর নজর দিস না"। যেটাকে আমরা বলছি কেইজ বার্ড বা খাঁচার পাখি।

এখন কথা হল জঙ্গলে নজর দিলে কার কি আসে যায়? জঙ্গলের পাখিতো কারো পৈতৃক সম্পত্তি না। তাহলে কী সমস্যা দু'চারটা ময়না-টিয়া-পেঁচা ধরে আনলে?

আসলে সমস্যা হল ইকোসিস্টেমে (Ecosystem)! ইকোসিস্টেম শব্দটি কম-বেশি সবাই শুনেছেন, কিন্তু যদি বিষয়টি খেয়াল করে আমলে না নিয়ে থাকেন, তাহলে আপনি নিজেই জানেন না, আপনি কত বড় বিপদে আছেন!

সেই বিপদটা কীভাবে?
আপনি নিজেও ইকোসিস্টেমের ভেতরেই থাকেন! আমাদের স্ব স্ব ধর্ম যেমন আমাদের একটি গ্রন্থ দিয়ে বলেছে অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে, তেমনি পৃথিবী আমাদের দিয়েছে 'ইকোসিস্টেম' যা মেনে চলা আমাদের পরম কর্তব্য! ইকোসিস্টেম ভেঙে যাওয়া মানে 'বায়োডাইভারসিটি (Biodiversity)' বা জীব বৈচিত্রের বিলুপ্তি!

কিন্তু কেন?
সহজ করে বলি, ছোটবেলায় আমরা খাদ্য চক্র পড়েছি, মনে আছে? এই যেমন গাছের পাতা হরিণ খায়, হরিণকে বাঘ খায় কিংবা পকুরে ছোট মাছ ব্যাঙাচি খায়, ছোট মাছকে আবার বড় মাছ খায়। এভাবে পরিবেশের প্রতিটি প্রাণি একে অপরের উপর চরমভাবে নির্ভরশীল! আর এই তালিকায় আপনি আমি আরও গুরুতরভাবে নির্ভরশীল!!

ইকোসিস্টেমে বন্য পাখির অবদান কি? 
শুধু পাখির মলের (পুপ্স) গুণাগুণ বলি- জঙ্গলের লক্ষ-কোটি গাছের কল্যাণে যে অক্সিজেন প্রতি মিনিটে ১৮-২০ বার বুকে টেনে নিয়ে বেঁচে আছি, সেই কোটি গাছের জন্য পাখির মল সাপ্লাই দিচ্ছে 'নাইট্রোজেন', 'ফসফেট' এবং 'পটাশিয়াম'। যে তিন উপাদান ছাড়া গাছের বৃদ্ধি অসম্ভব!ভেবে দেখেনতো আপনার আমার ১৪ পুরুষ মিলে কি এতো সারের সাপ্লাই নিয়ে জঙ্গলে ছিটিয়ে আসবে?

ফলের বীজ খেয়ে পাখি তার মলত্যাগের মাধ্যমে হাজার হাজার মাইল পর্যন্ত ছড়িয়ে গাছের বংশ বিস্তার টিকিয়ে রেখেছে। আপনার আমার ১৪ পুরুষ একত্রে কৃষিকাজ করলেও এই পরিমাণ চারা রোপন সম্ভব না!এমন আরো অনেক গুণাগুণ রয়েছে পাখির।

এরপরও হয়তো প্রশ্ন আসবে ‘সব বুঝলাম, একটা পাখি রাখলে কি এমন হবে?’

শুধু একটি দেশী পেঁচা আমাদের কী দেয় জানেন?
আমাদের দেশে সরকারী হিসাবে কৃষকের অতি কষ্টের ফসলের ৫ শতাংশ’র বেশী যায় ইদুরের পেটে! গড় আয়ু ২০ বছর ধরলে একটি পেঁচার বছরে ৭,৩০০ ইঁদুর খায়। প্রতিটি ইঁদুর বছরে ১৮.২ কেজি করে ৭,৩০০ ইঁদুর মোট ১,৩২,৮৬০ কেজি খাদ্য খায়! তাহলে ১টা পেঁচার কল্যাণে আমাদের প্রায় দেড় লাখ কেজি খাদ্যশস্য বেশী উৎপাদন হয়!!

এরপরও কেউ বলবেন- তাহলে অন্য পাখি রাখি, ময়না/শালিক?
বন্য পাখি এখনো যে পরিমাণে টিকে আছে, এরা যে পরিমাণ পোকামাকড় খায়, তার পরেও আমাদের কীটনাশক ছিটানো লাগে। সেই কীটনাশকযুক্ত শস্য খেয়ে ক্যান্সারে মরি এবং ধুয়ে পানিতে মিশালে মাছ মরে এবং মাছ খেয়ে আমরাও ক্যান্সারে আক্রান্ত হই।

আবারো কেউ বলবেন- 'আচ্ছা আমি একটা ময়না রাখি, সবাইতো আর রাখতেছে না.. তাই না?'

এবার মানুষের স্বভাবের একটা গল্প মনে রাখুন-
এক রাজা তার লোকেদের দিয়ে একটি পুকুর কাটালেন। রাজ্যে ঘোষণা দিয়ে দেয়া হলো সেদিন রাতেই যেন সবাই তাদের বাড়ি থেকে এক গ্লাস করে দুধ নিয়ে এসে সেই পুকুরে ঢেলে দেয়। রাজা সকাল বেলা তার প্রাসাদের বারান্দা থেকে দুধের পুকুর দেখতে চান!

এবার এক লোক ভাবলো যে সবাইতো গ্লাসে করে দুধ নিয়ে যাবে, সে যদি রাতের অন্ধকারে লুকিয়ে দুধের যায়গায় পুকুরে এক গ্লাস পানি দিয়ে আসে তবে কেউই তা বুঝবে না। তাই সে সকলের সাথে গিয়ে অন্ধকারে এক গ্লাস পানি ঢেলে দিয়ে এলো।

সকাল বেলা রাজা তার প্রাসাদের বারান্দায় এসে হাহাকার করে উঠলো! তার সাধের পুকুর শুধু পানি দিয়ে ভর্তি ছিল, সেখানে এক ফোঁটাও দুধ ছিল না!

পৃথিবীর (২০১৭ সালের সর্বশেষ জরিপ) ১,৪৬৯ 'প্রজাতির' লাখ লাখ পাখি বিপন্ন হবার তালিকায় রয়েছে, যা কিনা পৃথিবীর অবশিষ্ট পাখির ১৩.৪ শতাংশ। যার সহজ অর্থ আপনার আমার দেখা প্রতি ৮ টি পাখির ১ টি বিলুপ্তির পথে!এদের মধ্যে ২২২ প্রজাতি আছে বিপদসীমার একদম শেষ প্রান্তে, অতি নিকট ভবিষ্যতে তারা বিলুপ্ত হয়ে যাবে বলে গবেষকদের অনুমান।

লেখক: সৌখিন পাখি পালক, পুরান ঢাকা।

বিডি প্রতিদিন/২ মে ২০১৮/হিমেল

আপনার মন্তব্য

up-arrow