গায়ের রং দুধের মতো ধবধবে সাদা। নাম তার স্বর্গীয় দুধরাজ। নামের সঙ্গে ‘স্বর্গীয়’ শব্দটি যেমন মানানসই, তেমনি রূপ-রঙ আর লাবণ্যে প্রকৃতিকে মুগ্ধ করে রাখে এই পাখি। একসময় বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এ পাখির দেখা মিললেও বর্তমানে ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে এর সংখ্যা। শান্ত স্বভাবের হলেও বিপদের মুখে আত্মরক্ষায় দুধরাজ বেশ সাহসী হয়ে উঠতে পারে। অনেকের কাছে এটি ‘শাহ বুলবুল’ নামেও পরিচিত।
দুধসাদা রঙের পুরুষ পাখিটিকে বলা হয় ‘দুধরাজ’, আর স্ত্রী পাখিকে অনেকে ‘দুধরানি’ নামে ডাকেন। উড়ন্ত অবস্থায় এর সৌন্দর্য সত্যিই অপূর্ব। গত মে মাসে কুড়িগ্রামে দেখা মেলে এই দৃষ্টিনন্দন পাখিটির। এর ছবি তুলেছেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও নদী-প্রকৃতি গবেষক ড. তুহিন ওয়াদুদ।
জানা যায়, দুধরাজের গলার নিচ থেকে লেজের ডগা পর্যন্ত দুধের মতো সাদা। পেটও সাদা, তবে বুক, গলা ও মাথা কালো। মাথায় মুকুটের মতো চূড়া, হালকা বাঁকানো নীলচে-কালো ঠোঁট, নীলচে চোখ এবং হালকা লালচে পা এ পাখির সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
দুধরাজের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর লম্বা দুইটি সাদা লেজের পালক। ঠোঁট থেকে লেজ পর্যন্ত দেহের দৈর্ঘ্য ১৯ থেকে ২১ সেন্টিমিটার হলেও অতিরিক্ত দুইটি লেজের পালক প্রায় ৩০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। ফলে শরীরের চেয়েও লেজ অনেক বেশি দীর্ঘ। উড়ার সময় বাতাসে দুলতে থাকা এই পালক অপূর্ব নান্দনিক দৃশ্যের সৃষ্টি করে। ডালে বসে থাকলে লম্বা লেজটি নিচের দিকে বাঁকিয়ে রাখে।
স্ত্রী দুধরাজের তুলনায় পুরুষ দুধরাজের রঙ ও সৌন্দর্য বেশি আকর্ষণীয়। এরা সাধারণত জোড়ায় জোড়ায় বসবাস করে এবং উড়ন্ত পোকামাকড় শিকার করতেই বেশি পছন্দ করে। উঁচু গাছের ডালে বাসা বানিয়ে তিন থেকে পাঁচটি ডিম পাড়ে। তবে সব ডিম থেকে ছানা ফোটে না, আর সব ছানাও বেঁচে থাকে না। এ কারণেই অন্যান্য অনেক পাখির তুলনায় দুধরাজের সংখ্যা কম।
মে থেকে জুলাই মাস দুধরাজের প্রজননকাল। এ সময় পুরুষ ও স্ত্রী উভয় পাখিই সমানভাবে বাসা তৈরি, ডিমে তা দেওয়া এবং ছানাদের খাবার জোগাড়ের দায়িত্ব পালন করে। ডিম পাড়ার ২১ থেকে ২৩ দিনের মধ্যে ছানা ফুটে। একটি দুধরাজ সাধারণত ১০ থেকে ১২ বছর বেঁচে থাকে।
এ পাখির আরেকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো—জীবনসঙ্গী মারা গেলে অন্য পাখিটি করুণ সুরে ডাকতে থাকে, এমনকি মাটিতে গড়াগড়ি করে শোক প্রকাশ করে।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও নদী-প্রকৃতি গবেষক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, একসময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্বর্গীয় দুধরাজ প্রচুর দেখা যেত। কিন্তু বন উজাড়, প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস, খাদ্যসংকট এবং পরিবেশগত নানা পরিবর্তনের কারণে এ পাখির সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দুধরাজের আবাসস্থল সংরক্ষণ এবং বনভূমি রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেয়া জরুরি।
বিডি-প্রতিদিন/এমএল