বুকভরা সাহস আর হাজারো স্বপ্ন নিয়ে উচ্চশিক্ষা অর্জন করতে আসেন দেশসেরা মেধাবীরা। প্রত্যন্ত অঞ্চলের দরিদ্র পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থীরা পড়তে এসে প্রথমেই অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হন। বর্তমানে কঠিন থেকে কঠিনতর হয়েছে বসুন্ধরা গ্রুপের সহায়তায় উচ্চশিক্ষার স্বপ্নপূরণটিউশনি পাওয়া। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীর জন্য টিউশনি পাওয়াটা বেশি কঠিন।
টাকার অভাবে কী করে পড়াশোনা করবেন ভেবে দিশাহারা হন স্বপ্ন দেখা তরুণরা। সারা দেশের বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজ, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা নিতে আসা হাজারো তরুণের ভরসা ও আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে বসুন্ধরা শুভসংঘ। বসুন্ধরা গ্রুপের সহায়তায় মেধাবী অথচ অসচ্ছল শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়িয়ে বসুন্ধরা শুভসংঘ তৈরি করছে নতুন ইতিহাস। তারা দরিদ্র মেধাবীদের পাশে দাঁড়ানোর অদম্য প্রয়াস, দায়িত্বশীল ও মানবিক মানুষ হয়ে দেশ গঠনের অনুপ্রেরণা দিচ্ছে তরুণদের।
বসুন্ধরা শুভসংঘের বৃত্তি পেয়ে নিশ্চিন্তে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া হাজারো তরুণ এখন নিজেকে সৃষ্টিশীল করে তুলতে ব্যস্ত। তাঁরা জানিয়েছেন ভিন্ন ভিন্ন অনুভূতি। বসুন্ধরা গ্রুপের সহায়তাপ্রাপ্ত বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থীর অনুভূতি তুলে ধরেছেন জাকারিয়া জামান। বৃত্তিপ্রাপ্তদের নিয়ে ধারাবাহিক আয়োজনের অষ্টম পর্ব ছাপা হলো আজ
হাসান মিয়া
এমবিবিএস অধ্যয়নরত, শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ
আমার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বাঞ্ছারামপুর থানার শরীফপুর গ্রামে।
২০০৯ সালে আমার মাত্র ছয় বছর বয়সে বাবাকে হারিয়েছি। মা একজন গৃহিণী। বাবার অকালমৃত্যুতে আমাদের পরিবারে অর্থনৈতিক অনেক সংকট দেখা দেয়। সেই সময় থেকে আমার লালন-পালন ও পড়াশোনার দায়িত্ব নেন নানা-নানি। নানার বাড়ি থেকেই আমি মাধ্যমিক (এসএসসি) পড়াশোনা সম্পন্ন করি।
পরে উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) পড়ার জন্য আমাকে থাকতে হয় খালার বাড়িতে। মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় আমি আশ্রয় পাই আমার ফুফাতো বোনের বাসায়। পড়াশোনার বিভিন্ন সময়ে আত্মীয়-স্বজনের এই সহযোগিতা আমার জীবনে আল্লাহ তাআলার বিশেষ নিয়ামত হিসেবে আমি গভীরভাবে অনুভব করি। অর্থনৈতিক অনেক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও আমি মনোযোগসহকারে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। আল্লাহ তাআলার ওপর ভরসা, মায়ের দোয়া এবং নিজের নিরলস প্রচেষ্টার ফলে আলহামদুলিল্লাহ, আমি মেডিক্যালে ভর্তির সুযোগ পাই। এতে খুব খুশি হই, আবার বেশ চিন্তিতও হই। এত দিন অন্যের বাসায় থেকে পড়েছি, এবার কী হবে? আমি কি পারব—এমন চিন্তা যখন আমাকে গ্রাস করছিল, তখনই দেবদূত হয়ে পাশে দাঁড়ায় বসুন্ধরা শুভসংঘ। তারা আমাকে প্রতি মাসে পড়াশোনার খরচ দিচ্ছে। আমি এখন নিশ্চিন্তে পড়ছি। বসুন্ধরা শুভসংঘের এই সহায়তা শুধু আর্থিক নয়, বরং এটি আমার প্রতি তাদের আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতিফলন। এই বিশ্বাস আমাকে ভবিষ্যতে একজন দায়িত্বশীল, মানবিক ও সৎ চিকিৎসক হিসেবে গড়ে ওঠার প্রেরণা জোগায়। একজন ভালো চিকিৎসক হয়ে মানুষের সেবা করাই আমার জীবনের প্রধান লক্ষ্য। অনেক অনেক দোয়া ও কৃতজ্ঞতা বসুন্ধরা গ্রুপ ও শুভসংঘের জন্য।

জান্নাতুল ফেরদৌস টুম্পা
দর্শন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
গ্রামবাংলার এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। দারিদ্র্য শব্দটি আমার জীবনের সঙ্গে জন্মলগ্ন থেকেই জড়িয়ে আছে। বাবা একজন ভ্যানচালক, শারীরিক অসুস্থতার কারণে যিনি আর আগের মতো পরিশ্রম করতে পারেন না। তিন ভাই-বোনের পড়াশোনার ব্যয়ভার তাঁর একার পক্ষে বহন করা কখনোই সহজ ছিল না। সীমিত সুযোগ, সামাজিক পরিবেশের অভাব আর নিত্যদিনের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়েই আমার পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া। কোনো নামি প্রতিষ্ঠান নয়, প্রত্যন্ত গ্রামের সাধারণ স্কুল-কলেজেই পড়াশোনা করেছি। তবু স্বপ্ন দেখা ছাড়িনি। পশুপালন, কৃষিকাজ, হোটেলে রান্নার কাজ, ডিম বিক্রি, টিউশনি, পরীক্ষার খাতা দেখার মতো ছোট ছোট কতশত কাজ করে যে পড়াশোনা চালিয়েছি! প্রতিটি ধাপ ছিল কষ্টের, সংগ্রামের। আমার জীবনের প্রতিটি অর্জন ছিল যুদ্ধ জয়ের মতো। দীর্ঘ লড়াই শেষে আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন বিভাগে ভর্তি হতে পেরেছি। শত অভাব-অনটন সত্ত্বেও জেএসসি, এসএসসি ও এইচএসসি—সব পরীক্ষায় জিপিএ ৫ ও বোর্ড বৃত্তি নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছি। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে এসে অভাব ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। টিউশনি পাওয়া কঠিন হচ্ছিল। কোর্স ফি, হল ফি, শিক্ষা উপকরণ, নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ—সব মিলিয়ে টিকে থাকাই আমার কাছে ছিল প্রতিদিনের নতুন সংগ্রাম। যখন চারপাশে কোনো আশার আলো দেখছিলাম না, জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছিলাম, ঠিক তখনই আমার পাশে দাঁড়িয়েছে বসুন্ধরা শুভসংঘ। তারা নিঃশর্ত মানবিকতা নিয়ে আমার স্বপ্নের কথা খুবই গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেছে। শুধু আমাকে নয়, আমার ছোট বোনের পড়াশোনার বিষয়ে তারা সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। বসুন্ধরা শুভসংঘের এই সহায়তা আমাদের পরিবারের জন্য এক নতুন আশার দ্বার খুলে দিয়েছে। বসুন্ধরা গ্রুপের এই সহানুভূতিশীল উদ্যোগ আমাকে শুধু আর্থিক স্বস্তিই দেয়নি, দিয়েছে মানসিক শক্তি ও আত্মবিশ্বাস। আমার মনে হয়েছে, এই সমাজে এখনো মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়ায়। মানুষের স্বপ্নের মূল্য বোঝে। আমি বিশ্বাস করি, শিক্ষা শুধু ব্যক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যম নয়, এটি সমাজবদলের হাতিয়ারও। আমিও ভবিষ্যতে নিজেকে যোগ্য করে তুলে সমাজের অবহেলিত, দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে চাই। বসুন্ধরা গ্রুপ ও শুভসংঘ আমার সেই লক্ষ্যপথে চলার শক্তি জুগিয়েছে। বসুন্ধরা গ্রুপ ও শুভসংঘের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আমি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আপনাদের এই পাশে থাকা শুধু একজন শিক্ষার্থীকে নয়, একটি পরিবারকে, একটি স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখছে। কঠিন সময়ে যে প্রতিষ্ঠান মানুষের পাশে দাঁড়ায়, তারাই সত্যিকার অর্থে সমাজের আলোকবর্তিকা।

প্রসেনজিৎ বর্মন
প্রিন্টমেকিং ডিসিপ্লিন বিভাগ, চারুকলা, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়
ছোটবেলা থেকে অনেক ভালো ছবি আঁকতাম, কিন্তু কখনো সেভাবে শেখার সৌভাগ্য হয়নি। আমার বাবা একজন দরিদ্র কৃষক। তিনি স্বপ্ন দেখতেন ছেলেকে উচ্চশিক্ষিত করবেন। ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি আমাদের ভালো মানুষ করার জন্য বাবা অনেক পরিশ্রম করছেন। আমিও প্রবল ইচ্ছাশক্তি নিয়ে পড়াশোনা করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি। বাবা প্রতিনিয়তই খুব কষ্ট করে আমাকে কিছু খরচ দিতেন। বাকিটা আমি বসুন্ধরা শুভসংঘ থেকে পাওয়া বৃত্তি দিয়ে ম্যানেজ করতাম। ছয় মাস হলো বাবা মারা গেছেন। এমন অবস্থায় বসুন্ধরা শুভসংঘ যদি আমাকে বৃত্তি না দিত, কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার। চারুকলায় পড়তে বিভিন্ন আর্ট ম্যাটারিয়াল প্রতিদিনই কিনতে হয়। এগুলো সাবমিশনের জন্য অনেক টাকা প্রয়োজন। বসুন্ধরা শুভসংঘ থেকে প্রতি মাসে যে টাকা পাই, তা দিয়ে আমার এই প্রয়োজন মেটাই। আগে বাড়ি থেকে বাবা কিছু টাকা দিতেন। এখন তো আর সেটি সম্ভব নয়। একটি টিউশনি করছি। আমার মোটামুটি চলে যাচ্ছে। বাবা নেই, কিন্তু বাবার দেখা স্বপ্ন বুকে নিয়ে আমি এগিয়ে যাচ্ছি। বসুন্ধরা শুভসংঘ যেভাবে পাশে আছে, আশ করি বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে পারব। একজন ভালো মানুষ হয়ে বসুন্ধরা গ্রুপের মতো দেশ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করতে পারব। অনেক অনেক কৃতজ্ঞতা বসুন্ধরা শুভসংঘের প্রতি।

শায়লা নাজনীন
সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
প্রথমেই কৃতজ্ঞতা স্বীকার করতে চাই বসুন্ধরা গ্রুপের সঙ্গে জড়িত সবার প্রতি। বসুন্ধরা শুভসংঘের মাধ্যমে প্রতি মাসে নিয়মিত যে আর্থিক সহায়তা পাই, তা আমার শিক্ষাজীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এই সহায়তার মাধ্যমে আমার পড়াশোনাসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব হচ্ছে, যা আমার শিক্ষার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে বিশেষভাবে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। এই বৃত্তি সহায়তার কারণে মাসের শেষ দিকে আমার পরিবারের ওপর আর্থিক চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। বসুন্ধরা শুভসংঘের এই নিয়মিত সহায়তা শুধু আর্থিক সহযোগিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি আমার ভবিষ্যৎ গঠনে অনুপ্রেরণা ও সাহস জোগাচ্ছে। একটি সামাজিক ও মানবিক সংগঠন হিসেবে বসুন্ধরা শুভসংঘ অনেক দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করছে। বৃত্তির মাধ্যমে আমার মতো সমাজের পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়ে শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে অবদান রাখছে। বসুন্ধরা শুভসংঘের এই সহানুভূতিশীল উদ্যোগের জন্য আমি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। এই সহযোগিতা আমার শিক্ষাগত অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে এবং পারিবারিকভাবে স্বস্তি ফিরে পেতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

দিপালী রানী
ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগ, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
পড়াশোনার শুরু থেকেই আমাকে জীবনের অনেক কঠিন ও প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর থেকে আর্থিক সংকটে খুব কষ্ট পেয়েছি। টাকার অভাবে একসময় নিয়মিত খাবার জোগাড় করাই আমার জন্য বড় দুশ্চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। মেসের ভাড়া সময়মতো দিতে না পারায় প্রতিনিয়ত মানসিক চাপ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাতে হতো। এসব সমস্যার প্রভাব আমার পড়াশোনায় গভীরভাবে পড়েছিল। আর্থিক টানাপোড়েন ও মানসিক অস্থিরতার কারণে নিয়মিত ক্লাস করা সম্ভব হতো না। ফলে প্রথম সেমিস্টারে পরীক্ষাগুলো ঠিকমতো দিতে পারিনি এবং প্রত্যাশিত ফলাফল অর্জনে ব্যর্থ হই। আমার এই কঠিন সময়েই পাশে দাঁড়ায় বসুন্ধরা শুভসংঘ। তাদের সহযোগিতা আমার জীবনে এক নতুন আশার আলো নিয়ে আসে। তারা আমাকে আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি মানসিক শক্তি ও সাহস জুগিয়েছে। বসুন্ধরা গ্রুপের পক্ষ থেকে দেওয়া শিক্ষাবৃত্তি আমাকে নতুন করে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা দিয়েছে। এখন আমি নিয়মিত মেসের ভাড়া দিতে পারছি, সময়মতো খাওয়াদাওয়া করতে পারছি এবং কোনো দুশ্চিন্তা ছাড়াই মনোযোগ দিয়ে ক্লাসে অংশ নিতে পারছি। বসুন্ধরা শুভসংঘ আমাকে আশ্বস্ত করেছে, যত দিন পর্যন্ত আমি নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যাব, তত দিন পর্যন্ত তারা আমাকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করবে। এই নিশ্চয়তা আমার ভবিষ্যৎ পথচলাকে আরো দৃঢ় ও আত্মবিশ্বাসী করেছে। আমার জীবনের একটি সংকটময় সময়ে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়ে বসুন্ধরা গ্রুপ ও শুভসংঘ প্রমাণ করেছে, মানবিকতা ও সহানুভূতি সমাজে কতটা গুরুত্বপূর্ণ। তাদের এই সহায়তা না পেলে হয়তো আমার পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হতো না। আমি তাদের এই মহৎ উদ্যোগের জন্য আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। ভবিষ্যতে নিজেকে একজন যোগ্য, সৎ ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলে সমাজের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে চাই। শুভসংঘ থেকে পাওয়া এই অনুপ্রেরণা কাজে লাগাতে চাই দেশ ও মানুষের কল্যাণে।

নারদ অধিকারী
নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
২০২২ সালে আমি উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হই। এর পর থেকেই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করি। আমার পরিবার অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল। বাবার আয় খুবই সামান্য এবং এই আয় অনেকটাই অনিশ্চিত ও অস্থির। সংসারে মা-বাবা, ঠাকুরদা, ঠাকুর দিদি ছাড়াও আমার ছোট এক ভাই আছে। তার পড়াশোনার খরচ ও অন্যান্য দায়িত্ব সামলে বাবার মাসিক আয়ের বেশির ভাগই শেষ হয়ে যায়। পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনাও তখন কষ্ট হয়। এই পরিস্থিতিতে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আমি চাইতাম নিজের পড়াশোনার কারণে যেন পরিবারের ওপর অতিরিক্ত চাপ না পড়ে। শুরু থেকেই চেষ্টা করছিলাম নিজের খরচ নিজেই মেটানোর ব্যবস্থা করতে। অনেক পরিশ্রম ও চেষ্টা করে বহু বাধা-বিপত্তির পর আমি চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাই। এটি আমার জন্য একদিকে যেমন আনন্দের ছিল, অন্যদিকে ছিল চিন্তারও। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার খরচ খুব কম নয়। শুরুতে বাড়ি থেকে কিছু খরচ আসত, কিন্তু তাতে পরিবারে চাপ পড়ছিল। এটি দেখে আমি মানসিকভাবে খুবই অস্থির হয়ে পড়ি। ঠিক তখনই আমার বিভাগের উদয় হাসান স্যারের মাধ্যমে বসুন্ধরা শুভসংঘের কথা জানতে পারি। স্যারের পরামর্শে আমি সেখানে যোগাযোগ করি। ইমদাদুল হক মিলন স্যার আমার অবস্থা জেনে আমাকে এই বৃত্তির ব্যবস্থা করে দেন। বসুন্ধরা শুভসংঘের মাধ্যমে বসুন্ধরা গ্রুপের দেওয়া এই বৃত্তি আমার শিক্ষাজীবনে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। আমাদের বিভাগে নিয়মিতভাবে বিভিন্ন ইনস্ট্রুমেন্ট ব্যবহার করতে হয়। বিভিন্ন সফটওয়্যার বা অনলাইন কোর্স কিনতে হয়। এগুলো এখন আমি এই বৃত্তির সাহায্যে করতে পারছি। পড়াশোনার প্রয়োজনে খরচের চিন্তা আমাকে আর থামিয়ে রাখতে পারছে না। সবচেয়ে বড় কথা, আমার পরিবারের ওপর আগে যে অতিরিক্ত চাপ পড়ত, এই বৃত্তির কারণে তা কমে গেছে। আমি এখন মনোযোগের সঙ্গে পড়াশোনায় সময় দিতে পারছি এবং ভবিষ্যতের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে পারছি। আমি হৃদয়ের অন্তস্তল থেকে বসুন্ধরা গ্রুপ ও শুভসংঘ সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানাই। তাঁরা শুধু আর্থিকভাবে নয়, মানসিকভাবেও আমাকে অনেক ভরসা ও সাহস জুগিয়েছেন।

আবু হুরাইরা আতিক
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
আমার বাবা একজন দরিদ্র কৃষক ও মা গৃহিণী। আমরা সাত ভাই-বোন। বাবার সামান্য আয়ের ওপর নির্ভর করে আমাদের সংসারের সব ব্যয়। অনেক টানাপোড়েনের মধ্যেই আমরা চার ভাই-বোন পড়াশোনা করছি। পারিবারিক বিপর্যয়টা ঘটে ২০২০ সালে করোনার সময়ে। আমি তখন অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। আর্থিক সংকটে মানসিকভাবে একপ্রকার ভেঙে পড়ি। আমার পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। এমন সময় বসুন্ধরা শুভসংঘের শিক্ষাবৃত্তি আমার জীবনে আশীর্বাদ হয়ে আসে। বসুন্ধরা শুভসংঘের শিক্ষাবৃত্তি পেয়ে আমার আর্থিক সংকট কেটে যায়। তখন অর্থের জোগান নিয়ে আর ভাবতে হয়নি। বসুন্ধরা শুভসংঘের স্বপ্নদ্রষ্টা ও নন্দিত কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন স্যার মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করতে বলেন। যেকোনো সমস্যায় সহযোগিতার আশ্বাস দেন। এবার আমি পড়াশোনায় মনোযোগী হই এবং অনার্সের শেষ চার সেমিস্টারে এবং মাস্টার্সের দুই সেমিস্টারে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল লাভ করতে সক্ষম হই। এই কৃতিত্বের অংশীদার অবশ্যই বসুন্ধরা গ্রুপ ও শুভসংঘ। তাদের সহযোগিতা না পেলে আমি কোনোভাবেই ঘুরে দাঁড়াতে পারতাম না। কেবল আমি নই, আমার মতো আরো হাজারো স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর স্বপ্নপূরণের সারথি হয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে বসুন্ধরা গ্রুপ। বসুন্ধরা শুভসংঘ শিক্ষাবৃত্তির মাধ্যমে হাজার হাজার দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থী নিশ্চিন্তে পড়ছে। তাদের এই মানবিক কার্যক্রম চলমান থাকুক যুগের পর যুগ। উপকৃত হোক আমার মতো আর্থিক সংকটে পড়া হাজারো অদম্য মেধাবী শিক্ষার্থী। এখন আমি পুরোদমে চাকরির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। হয়তো শিগগিরই ভালো একটি চাকরি পাব। এমন মুহূর্তেও আমার পাশে আছে বসুন্ধরা শুভসংঘ। তাদের অনুপ্রেরণা নিয়ে আমি একসময় মানুষের পাশে দাঁড়াব, ইনশাআল্লাহ। দুঃসময়ে পাশে থাকার জন্য বসুন্ধরা শুভসংঘ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ।

সুজানা ইয়াসমিন মনি
ফার্মেসি বিভাগ, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
ব্রোকেন ফ্যামিলির মেয়ে হওয়ায় আমার পড়াশোনার খরচ বহন করা মায়ের একার পক্ষে ছিল অনেক টাফ। আমি টিউশনিসহ অনলাইনে বেশ কিছু কাজ শুরু করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আর্থিক টানাপোড়েন এবং আমার পড়ালেখার ক্ষতির দিক বিবেচনা করে কিছুই শুরু করতে পারছিলাম না। খরচের চাপে সৃজনশীল কর্মকাণ্ড এবং পড়ালেখার ফলাফল কোনোটিই ভালো করতে পারছিলাম না। উত্তরাঞ্চল থেকে সরাসরি দক্ষিণাঞ্চল, তা-ও আবার গোপালগঞ্জে এসে বসবাস করা আমার জন্য ছিল অনেক কঠিন। এর একটি বড় কারণ ছিল গোপালগঞ্জের পরিবেশ আর বিশুদ্ধ পানির সংকট। এখানে খাওয়ার পানিটাও কিনে খেতে হয়। সবকিছুর জন্য দরকার বাড়তি টাকা। মা একা কোত্থেকে এগুলো ম্যানেজ করবেন। সবকিছু মিলে আমি যখন একটি অসহ্যকর পরিস্থিতি পার করছিলাম, ঠিক তখনই বসুন্ধরা শুভসংঘের কথা জানতে পারি। মনে আছে, মা আর আমি বসুন্ধরা শুভসংঘের অফিসে গিয়েছিলাম। ইমদাদুল হক মিলন স্যার আমাদের সবকিছু শুনে বসুন্ধরা গ্রুপ থেকে প্রতি মাসে বৃত্তির ব্যবস্থা করে দিলেন। এই বৃত্তিটা আমার পড়াশোনা এবং দৈনন্দিন জীবনের অন্যান্য খরচকে সহজ করেছে। আমার সেকেন্ড ইয়ারের প্রথম সেমিস্টার ফিও দিয়েছি বসুন্ধরা শুভসংঘ থেকে প্রাপ্ত টাকা দিয়ে। এই টাকাটা না থাকলে সেই মুহূর্তে টাকা ম্যানেজ হতো কি না, সেটা আমার নিজের কাছেই সন্দেহ লাগে। বর্তমানে আমি তৃতীয় বর্ষ প্রথম সেমিস্টারে পড়ছি, আলহামদুলিল্লাহ। সর্বোপরি বসুন্ধরা শুভসংঘ থেকে প্রাপ্ত মাসিক শিক্ষাবৃত্তি আমার শিক্ষাজীবনকে আগের থেকে অনেক সহজ করেছে। এ জন্য বসুন্ধরা গ্রুপ ও শুভসংঘের কাছে আমি সব সময় কৃতজ্ঞ থাকব। আশা করি, বসুন্ধরা শুভসংঘ শিক্ষার্থীদের জন্য এই বৃত্তিটা সব সময় চালিয়ে যাবে। এই বৃত্তি আমার মতো হাজারো দরিদ্র শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনকে সহজ করে তুলছে।

অনিক চন্দ্র কর
মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়
নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান আমি। বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন চান্স পাই, সেই মুহূর্তটি আমার জন্য অনেক আনন্দের ছিল। এমন আনন্দের মধ্যেও চিন্তার বিষয় হয় বাইরে গিয়ে পড়ার খরচ। আমার পরিবারের পক্ষে এই খরচ বহন করা অনেক কষ্টসাধ্য ব্যাপার। নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক কিছু ছাড়াই কাটছিল আমার দিন। যতটুকু পারতাম খরচ বাঁচিয়ে চলার চেষ্টা করতাম। চলাটা অনেক কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছিল আমার জন্য। এমন সংকটপূর্ণ সময়ে আমি বসুন্ধরা শুভসংঘের দ্বারস্থ হই। আমি মিলন স্যার বরাবর সবকিছু জানিয়ে আবেদন করি। আগের থেকে প্রতি মাসে আরো কিছু টাকা বাড়িয়ে দেন স্যার। ওই সময়ে বসুন্ধরা শুভসংঘের দেওয়া শিক্ষাবৃত্তি আমার কাছে আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। আমার চিন্তা, কষ্ট লাঘব করেছে। আমি চিন্তামুক্তভাবে পড়াশোনা করতে পারছি এবং প্রয়োজনীয় সব চাহিদা মেটাতে পারছি। এমনকি আমার বাবার চিন্তাও লাঘব করেছে বসুন্ধরা গ্রুপ। এই শিক্ষাবৃত্তি একটি ভরসা, সাহস আর সম্মানের প্রতীক। আমার সব পিছুটান দূর করেছে বসুন্ধরা শুভসংঘ। আমার জন্য যে কতটা উপকার হয়েছে, তা আক্ষরিক ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। শুধু এতটুকুই জানি, প্রতিনিয়ত আমাকে সাহস জোগাচ্ছে বসুন্ধরা গ্রুপ ও শুভসংঘ। আমি সারা জীবন কৃতজ্ঞ থাকব তাদের প্রতি। তাদের সহায়তায় আমার মতো লাখো শিক্ষার্থী স্বপ্নপূরণের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। অন্তরের অন্তস্তল থেকে বসুন্ধরা গ্রুপকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি লাখো দরিদ্র মেধাবীর স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার জন্য।

রুনা লায়লা
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
ছোটবেলা থেকেই আমার অন্তরে তিল তিল করে গড়ে তোলা এক স্বপ্নের নাম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। জীবনের নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে ভর্তি পরীক্ষা শেষ করে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি করেছিলাম, ঠিক তখনই মনে হলো, আমার পড়াশোনার ইতি টানতে হবে। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে আমরা পাঁচ বোন ও এক ভাই। সব ভাই-বোনের পড়াশোনা আর ভরণ-পোষণ আমার বাবার জন্য কষ্ট হলেও কোনো রকমে সংসার চালিয়ে যেতে পারতেন। হঠাৎ বাবা অসুস্থ হয়ে যাওয়ায় আমাদের জীবন যেন থেমে গেছে। টাকার অভাবে আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করবেন না শুনে একজন শিক্ষক পাশে দাঁড়ান। তাঁর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি কনফার্ম করি। কিন্তু চূড়ান্ত ভর্তির জন্য অনেক টাকা প্রয়োজন, সেই ব্যবস্থা করতে পারছিলাম না। কিভাবে কিভাবে খবর চলে যায় বসুন্ধরা শুভসংঘের কাছে। ইমদাদুল হক মিলন স্যার আমার সব খবর নেন। তিনি বসুন্ধরা গ্রুপের সহায়তায় শুভসংঘের মাধ্যমে আমার পাশে দাঁড়ান। ভর্তির ব্যবস্থা করে দেন। বসুন্ধরা শুভসংঘ সেদিন থেকে আমার হাত এমনভাবে শক্ত করে ধরেছে, আমার পুরো ভরসা এখন দেশসেরা এই সামাজিক সংগঠনটি। সেদিন বসুন্ধরা শুভসংঘ আমাকে শুধু স্বপ্নের পথই দেখায়নি, আমার পুরো শিক্ষাজীবনে পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছে। আশা রাখি, স্বপ্ন ছোঁয়ার আগ পর্যন্ত বসুন্ধরা শুভসংঘ ছায়ার মতোই আমার পাশে থাকবে। আমার মতো মাঝপথে থমকে যাওয়া ও ভেঙে পড়া হাজারো শিক্ষার্থীর আশার আলো হয়ে আছে বসুন্ধরা শুভসংঘ। দরিদ্র শিক্ষার্থীর জন্য স্বস্তির নাম বসুন্ধরা শুভসংঘ, যারা স্বপ্ন দেখায় এবং স্বপ্নের পথের সঙ্গীও হয়। অনেক অনেক কৃতজ্ঞতা ও দোয়া বসুন্ধরা গ্রুপ এবং শুভসংঘের সবার জন্য।