কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নে ব্রহ্মপুত্র নদ দিয়ে বিচ্ছিন্ন গোয়ালপুরী চর। ভারতের আসাম সীমান্তঘেঁষা এ চরে এক সময় প্রায় ৪০০ পরিবারের বসতি ছিল। কিন্তু নদীভাঙনে ইতোমধ্যে প্রায় দেড়শ পরিবার ওই এলাকা ছেড়ে চলে গেছে। এক সপ্তাহে অর্ধশতাধিক পরিবার গৃহহীন হয়েছে। বসতভিটা হারিয়ে তারা নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। আরও শতাধিক পরিবার হুমকির মুখে রয়েছে। সরেজমিন দেখা যায়, নদের তীরজুড়ে আতঙ্ক। কেউ ঘরের টিন খুলছেন, কেউ বাঁশ-কাঠ সরিয়ে নিচ্ছেন। আবার কেউ নদের পাড়ে নিরুপায় হয়ে বসে আছেন। কোথাও কোথাও ভাঙনের শব্দে মাটি কেঁপে উঠছে। মুহূর্তের মধ্যেই জমি, গাছপালা চলে যাচ্ছে নদীগর্ভে। ভিটেমাটি হারানো জসীমউদ্দীন বলেন, ‘বাপ-দাদার ভিটা ছিল এখানে। জীবনের সব সঞ্চয় দিয়ে ঘর তুলেছিলাম। কয়েক দিনের মধ্যে সব নদীতে চলে গেল। এখন অন্যের জমিতে অস্থায়ীভাবে আছি। বাচ্চারা বারবার জিজ্ঞেস করে, এখন আমরা কোথায় থাকব? তাদের কোনো উত্তর দিতে পারি না।’ স্থানীয় নূর হোসেন বলেন, ‘ঘর ভাঙার সময় স্ত্রী আর সন্তানদের কান্না দেখে নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি। চোখের সামনে সব শেষ হয়ে গেল। এখন খাবারের চিন্তা, থাকার চিন্তা- সব মিলিয়ে বড় কষ্টে আছি।’ পাষাণ মিয়া বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। যা ছিল সব নদী নিয়ে গেছে। এখন পরিবার নিয়ে খোলা আকাশের নিচে থাকতে হবে।’ মর্তুজ আলী বলেন, ‘আমাদের পূর্বপুরুষদের কবর ছিল এ চরে। সেই কবরস্থানও নদীতে চলে গেছে।’ লালচাঁদ মিয়া বলেন, ‘নদী শুধু ঘরবাড়ি নেয়নি। আমাদের স্বপ্নও কেড়ে নিয়েছে। এখন মনে হচ্ছে আমরা যেন নিজের দেশেই উদ্বাস্তু হয়ে গেছি।’
স্থানীয়রা জানান, ভাঙনে গ্রামের কবরস্থান নদীতে বিলীন হয়েছে। শেষ মুহূর্তে এলাকার একটি মসজিদ ভেঙে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। প্রতিদিন নতুন নতুন এলাকায় ফাটল দেখা দিচ্ছে। আতঙ্কে অনেকে আগে ভাগেই ঘর খুলে অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছেন। ওই এলাকার মেম্বর আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘এক সময় এ চরে প্রায় ৪০০ পরিবারের বসবাস ছিল। নদীভাঙনের কারণে দেড়শ পরিবার অন্যত্র চলে গেছে। সাত দিনে অর্ধশতাধিক পরিবার গৃহহীন হয়েছে। আরও প্রায় ১০০ পরিবার যেকোনো সময় ভিটেমাটি হারাতে পারে।’ কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, ‘কুড়িগ্রাম জেলার বিভিন্ন এলাকায় ৩৬টি পয়েন্টে নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে ২০টি পয়েন্টে ভাঙনরোধে কাজ চলছে। বাকি স্থানগুলো পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’