শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ২২ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ২১ জানুয়ারি, ২০২১ ২৩:৪৪

বঙ্গবন্ধুর সংসদ জীবনের শেষ দিনটি

বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম

বঙ্গবন্ধুর সংসদ জীবনের শেষ দিনটি

২৫ জানুয়ারি, ১৯৭৫ ছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সংসদ জীবনের সর্বশেষ দিন। বঙ্গবন্ধু ছিলেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা। ওই দিন জাতীয় সংসদে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী বিল পাসের মাধ্যমে দেশে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটে। নতুন ব্যবস্থায় বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপতি হন। দেশের অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে জাতীয় ঐক্য সৃষ্টির প্রয়াসে গঠিত হয় একক জাতীয় দল ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল)’। বঙ্গবন্ধু তাঁর এ পদক্ষেপ সম্পর্কে সংসদে প্রদত্ত শেষ ভাষণে বলেছিলেন, ‘চেষ্টা নতুন, আজ আমি বলতে চাই- This is second revolution, second revolution আমাদের। এই revolution-এর অর্থ দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো। এর অর্থ : অত্যাচার-অবিচার-নির্যাতন বন্ধ করতে হবে। জনাব স্পিকার সাহেব, আজকে আমাদের সংবিধানের কিছু অংশ সংশোধন করতে হলো। আপনার মনে আছে সংবিধান যখন পাস করা হয়, তখন আমি বলেছিলাম যে, এই দেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য যদি দরকার হয় এই সংবিধানের পরিবর্তন বা পরিবর্ধন করা হবে। আজকে Amended Constitution-এ যে নতুন ব্যবস্থা করতে যাচ্ছি, এটাও গণতন্ত্র। শোষিতের গণতন্ত্র। এখানে জনগণের ভোটাধিকার থাকবে। এখানে আমরা সমাজতন্ত্র করতে চাই। এখানে আমরা শোষিতের গণতন্ত্র রাখতে চাই। সাম্প্রদায়িকতার বীজ কোনো দিন বাংলার মাটিতে আসতে পারবে না, আমি allow করব না।’

শোষিতের গণতন্ত্র সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমি একদিন তো বলেছি এই হাউসে, স্পিকার সাহেব যে, আমরা শোষিতের গণতন্ত্র চাই। যারা রাতের অন্ধকারে পয়সা লুট করে, যারা বড় বড় অর্থশালী লোক, যারা বিদেশ থেকে ভোট কেনার জন্য পয়সা পায়, তাদের গণতন্ত্র নয়-শোষিতের গণতন্ত্র। এটা আজকের কথা নয়-বহুদিনের কথা আমাদের এবং সে জন্য আজকে আমাদের শাসনের পরিবর্তন করতে হয়েছে। আমাদের শোষণহীন সমাজ গড়তে হবে। এটায় আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।’ শোষিতের গণতন্ত্র কী এ প্রসঙ্গে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ৪ নভেম্বর, ১৯৭২ সংবিধান বিলের ওপর আলোচনা করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘মানুষের একটা ধারণা এবং আগেও আমরা দেখেছি যে, গণতন্ত্র যেসব দেশে চলছে দেখা যায় সেসব দেশে গণতন্ত্র পুঁজিপতিদের protection দেওয়ার জন্য কাজ করে এবং সেখানে শোষকদের রক্ষা করার জন্যই গণতন্ত্র ব্যবহার করা হয়। সে গণতন্ত্রে আমরা বিশ্বাস করি না। আমরা চাই শোষিতের গণতন্ত্র এবং সেই শোষিতের গণতন্ত্রের অর্থ হলো, আমার দেশে যে গণতন্ত্রের বিধিলিপি আছে, তাতে যেসব provision করা হয়েছে, যাতে এ দেশের দুঃখী মানুষ protection পায় তার জন্য বন্দোবস্ত আছে- ওই শোষকরা যাতে protection পায় তার ব্যবস্থা নেই। সে জন্য আমাদের গণতন্ত্রের সঙ্গে অন্যের পার্থক্য আছে।’ বঙ্গবন্ধুর চিন্তায় পশ্চিমা ধাঁচের শুধু সাধারণ মানুষের ভোটদানের অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টি ছিল না, তিনি বিশ্বাস করতেন ভোটের গণতন্ত্রের পাশাপাশি দেশের গরিব-দুঃখী-সর্বস্তরের মানুষের ভাত-কাপড়-বাসস্থান-চিকিৎসা নিশ্চিতভাবে পাওয়ার গণতন্ত্র, যা শোষিতের গণতন্ত্র।

সংবিধানের চতুর্থ সংশোধন সম্পর্কে আত্মোপলব্ধির জায়গা থেকে বঙ্গবন্ধু সংসদে আরও বলেছিলেন, ‘সংবিধানের এই সংশোধন কম দুঃখে করি নাই, স্পিকার সাহেব। যারা জীবনভর সংগ্রাম করেছে-এ কথা যেন কেউ মনে না করে যে জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে গেছে। যদি জনগণ যা চেয়েছে, এখানে সেই System করা হয়েছে। তাতে পার্লামেন্টের মেম্বারগণ জনগণের দ্বারা ভোটে নির্বাচিত হবেন। যিনি প্রেসিডেন্ট হবেন, তাঁকেও জনগণের ভোটে নির্বাচিত হতে হবে। জনগণের ভোটাধিকার আছে।’

সংসদের শেষ ভাষণে বঙ্গবন্ধু দেশ ও সমাজ গড়তে শিক্ষিত লোকের ভূমিকা ও দায়িত্ব স্মরণ করে দিয়ে বলেছিলেন, ‘জনাব স্পিকার, আজকে আমাদের কর্তব্য কতটুকু পালন করেছি-আমরা যারা এখানে লেখাপড়া শিখেছি? আজ দেশের মানুষ দুঃখী, না খেয়ে কষ্ট পায়। গায়ে কাপড় নাই, শিক্ষার আলো তারা পায় না, রাত্রে একটু হারিকেন জ্বালাতে পারে না-নানা অসুবিধার মধ্যে তারা চলছে। আজকে আত্মসমালোচনার দিন এসেছে-আমরা কতটুকু কর্তব্য পালন করেছি, আমরা কতটুকু তাদের দিয়েছি। শুধু আমাদের দাও! বাংলার দুঃখী জনগণ কী পেল, তোমরা কী ফেরত দিয়েছ? এটা আজ প্রশ্ন। আজ আত্মসমালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। দুঃখের বিষয় আজ আমরা বলি আমরা কী পেলাম। তোমরা কী পেয়েছ? তোমরা পেয়েছ শিক্ষার আলো-যে শিক্ষা পেয়েছ বাংলার জনগণের টাকায়। তুমি কী ফেরত দিয়েছ বাংলার দুঃখী মানুষকে- যে দুঃখী মানুষ না খেয়ে মরে যায় যে মানুষের কাপড় নাই, যে মানুষ বন্ধু খুঁজে পায় না, যার বস্ত্র নাই, শার্ট নাই, বুকের হাড়গুলো পর্যন্ত দেখা যায়, তাকে আজকে তোমরা কী দিয়েছ?’

বঙ্গবন্ধু নিজের অধিকার রক্ষার পাশাপাশি অন্যের অধিকার রক্ষা করার বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমরা দেখেছি যে, প্রত্যেক দেশে নিয়ম আছে- যদি আপনাকে অধিকার ভোগ করতে হয়, অন্যের অধিকারকেও রক্ষা করতে হয়। “ইফ ইউ হ্যাভ এ লিবার্টি ইউ হ্যাভ রেসপনসিবিলিটি”- এ কথা ভুললে চলবে না।’

দেশের শিক্ষিত লোকেরা দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ায় সেদিন সংসদে বঙ্গবন্ধু উদ্বেগ ও উষ্মা প্রকাশ করে বলেছিলেন- ‘আজকে করাপশনের কথা বলতে হয়। এ বাংলার মাটি থেকে করাপশন উৎখাত করতে হবে। করাপশন আমার বাংলার কৃষক করে না। করাপশন আমার বাংলার মজদুর করে না। করাপশন করি আমরা শিক্ষিত সমাজ। যারা আজকে ওদের টাকা দিয়ে লেখাপড়া করেছি। আজ যেখানে যাবেন, করাপশন দেখবেন-আমাদের রাস্তা খুঁড়তে যান-করাপশন। খাদ্য কিনতে যান-করাপশন, জিনিস কিনতে যান- করাপশন। বিদেশে গেলে টাকার উপর করাপশন। তারা কারা? আমরা যে ৫ পারসেন্ট শিক্ষিত সমাজ, আমরা হলাম দুনিয়ার সবচেয়ে করাপ্ট পিপল, আর আমরাই করি বক্তৃতা! আমরা লিখি খবরের কাগজে, আমরাই বড়াই করি। আজ আত্মসমালোচনার দিন এসেছে। এসব চলতে পারে না। মানুষকে একদিন মরতে হবে। কবরে যেতে হবে। কিছুই সে নিয়ে যাবে না। তবু মানুষ ভুলে যায়- কী করে এ অন্যায় কাজ করতে পারে! বাংলার গরিব ভালো, বাংলার কৃষক ভালো, বাংলার শ্রমিক ভালো। যদি খারাপ হয়ে থাকে তাহলে তারা বাংলার তথাকথিত শিক্ষিত সমাজ। তারাই যত গোলমালের মূল। যত অঘটনের মূল।’

বঙ্গবন্ধু ছাত্রসমাজকে লেখাপড়ার পাশাপাশি মানবিক গুণাবলি অর্জনের তাগিদ দিয়ে বলেছিলেন, ‘ছাত্রসমাজের লেখাপড়া করতে হবে। লেখাপড়া করে মানুষ হতে হবে। জনগণ টাকা দেয় ছাত্রগণকে মানুষ হবার জন্য। সে মানুষ হতে হবে-আমরা যেন পশু না হই। লেখাপড়া শিখে আমরা যেন মানুষ হই। কী পার্থক্য আছে জানোয়ারের সাথে আর আমাদের সাথে? যে জানোয়ার একটি মানুষের বাচ্চাকে কামড়াইয়া ধরে, খেয়ে ফেলে দেয়, আর একটি মানুষ বুদ্ধিবলে এখান থেকে পয়সা নিয়ে তাকে না খাইয়ে মারে? কী পার্থক্য আছে জানোয়ার আর মানুষের মধ্যে-যদি মনুষ্যত্ব আমি হারিয়ে ফেলি, তাহলে মানুষ কোথায়? প্রথমেই আমার মধ্যে মনুষ্যত্ব আনতে হবে, তবে আমি মানুষ হব। না-হলে মানুষ আমাকে কেন বলা হয়? Because আমার মধ্যে মনুষ্যত্ব আছে। যখন মনুষ্যত্ব হারিয়ে ফেলি তখন তো আমি মানুষ থাকি না। আমরা মনুষ্যত্ব হারিয়ে ফেলেছি।’

স্বাধীনতাবিরোধী যাদের বঙ্গবন্ধু সাধারণ ক্ষমা প্রদর্শন করেছিলেন তাদের বাংলাদেশবিরোধী তৎপরতা প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন- ‘আমরা যাদের ক্ষমা করেছিলাম তারা গ্রামে গ্রামে বসে আমাদের দুঃখ-দুর্দশা সম্বন্ধে আজকে কটাক্ষ করে। বন্ধ করে দেওয়া হবে সব। তাদের অধিকার দেওয়া হবে স্বাধীনতা নস্যাৎ করার জন্য? কোনো দেশে দেয় নাই, আমরা দিয়েছিলাম মাফ। মাফ যদি হজম করতে না পারা যায় তাহলে কেমন করে কঠোর হস্তে দমন করতে হয়-তাও আমি জানি। আজ আমাকে অত্যন্ত দুঃখের সাথে এ কথা বলতে হচ্ছে।’ বঙ্গবন্ধু মন্ত্রী-জনপ্রতিনিধি-সরকারি কর্মকর্তাদের নিজ নিজ মানসিকতা পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন-‘যারা তোমায় মাহিনা দেয়, তোমার সংসার চালায়, ট্যাক্স দেয় তার কাছে তুমি আবার পয়সা খাও! মেন্টালিটি চেইঞ্জ করতে হবে। সরকারি কর্মচারী, মন্ত্রী, প্রেসিডেন্ট-আমরা জনগণের সেবক, আমরা জনগণের মাস্টার নই। এই মেন্টালিটি আমাদের চেইঞ্জ করতে হবে। আর, যাদের পয়সায় আমাদের সংসার চলে, যাদের পয়সায় আমাদের রাষ্ট্র চলে, যাদের পয়সায় আজ আমাদের embassy চলে, যাদের পয়সায় আমরা গাড়ি চড়ি, যাদের পয়সায় আমরা পেট্রোল খরচ করি, আমরা কার্পেট ব্যবহার করি তাদের জন্য কী করলাম-সেটাই আজ বড় জিনিস।’

বঙ্গবন্ধু তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে অসংখ্যবার কারাগারে গিয়েছিলেন-বিচারের সম্মুখীন হয়েছিলেন। তিনি তাঁর অভিজ্ঞতা দিয়ে অনুধাবন করেছিলেন বিচারব্যবস্থার আমূল সংস্কার প্রয়োজন। সংসদের শেষ ভাষণে তিনি বললেন, ‘জাসটিস ডিলেড জাসটিস ডিনাইড। উই হ্যাভ টু মেইক এ কমপ্লিট চেইঞ্জ এবং সিস্টেমের মধ্যে পরিবর্তন করতে হবে, মানুষ যাতে সহজে বিচার পায় এবং সঙ্গে সঙ্গে বিচার পায়। ব্যাপক পরিবর্তন দরকার। কলোনিয়াল পাওয়ার এবং রুল দিয়ে দেশ চলতে পারে না। নতুন স্বাধীন দেশ, স্বাধীন মতবাদ, স্বাধীনভাবে দেশ শাসন করতে হবে। যেখানে জুডিশিয়াল সিস্টেমের অনেক পরিবর্তন দরকার।’

বঙ্গবন্ধু দেশের মানুষের সার্বিক মুক্তির লক্ষ্যে জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি তাই হাউস থেকে, জনাব স্পিকার, আপনার মাধ্যমে দেশবাসীকে, দলমত নির্বিশেষে সকলকে বলব, যাঁরা দেশকে ভালোবাসেন, চারটি principle-কে ভালোবাসেন-জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতা-এই চারটিকে, তাঁরা আসুন, কাজ করুন। দরজা খোলা আছে। সকলকেই আহ্বান জানাচ্ছি-যাঁরা এই মতে বিশ্বাস করেন। যাঁরা এই মতে বিশ্বাস করেন, তাঁদের প্রত্যেকেই আসুন, কাজ করুন, দেশকে রক্ষা করুন। দেশকে বাঁচান, মানুষকে বাঁচান, মানুষের দুঃখ দূর করুন। আর দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর, চোরাকারবারিদের উৎখাত করুন। আজকে আমরা যারা এখানে উপস্থিত আছি, যারা জনপ্রতিনিধি, জনগণের ভোটের মাধ্যমে যারা এখানে এসেছি, আমাদের কর্তব্য হচ্ছে : জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে, দলমত-নির্বিশেষে, বাংলার জনগণ যে যেখানে আছেন-আজকে থেকে আমরা প্রতিজ্ঞা করে নতুন জীবন শুরু করব। আমরা নুতন বিপ্লব শুরু করব। তাই আজকেও আমাদের নতুন জীবন সৃষ্টি করতে হবে। উদ্দীপনা সৃষ্টি করতে হবে। মানুষকে mobilize করতে হবে।’

বঙ্গবন্ধু সংসদ জীবনের ইতি টানতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘আজ আপনারা Constitution সংশোধন করে আমাকে প্রেসিডেন্ট করে দিয়েছেন। আমার তো ক্ষমতা কম ছিল না। প্রধানমন্ত্রী হিসাবে সমস্ত ক্ষমতা আপনারা আমাকে দিয়েছিলেন। এই সিটে আমি আর বসব না-এটা কম দুঃখ না আমার। আপনাদের সঙ্গে এই হাউসের মধ্যে থাকব না-এটা কম দুঃখ না আমার।’ বঙ্গবন্ধু সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন- ‘যদি সকলে মিলে আপনারা নতুন প্রাণ, নতুন মন নিয়ে খোদাকে হাজির নাজির করে নিজের আত্মসমালোচনা করে, আত্মসংশোধন করে, আত্মশুদ্ধি করে যদি ইনশাআল্লাহ কাজে অগ্রসর হন, বাংলায় জনগণকে আপনারা যা বলবেন তারা তাই করবে। ইন্শাআল্লাহ আমরা কামিয়াব হব।’

যুদ্ধবিধ্বস্ত, অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু দেশটিকে বঙ্গবন্ধু মাত্র সাড়ে তিন বছরের প্রচেষ্টায় যখন স্বাভাবিক স্থিতি ধারায় ফিরিয়ে এনে বাংলার গরিব-দুঃখী মানুষের সামগ্রিক মুক্তির লক্ষ্যে জাতীয় ঐক্যের সূচনা করে দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি ঘোষণা করলেন- ঠিক সে মুহূর্তে স্বাধীনতার পরাজিত শক্তি তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করে দেশকে আবারও পাকিস্তানি ধারায় ফিরিয়ে নেওয়ার তৎপরতায় লিপ্ত হয়।

হাল সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও মহল জাতীয় ঐক্যের কথা বলেন, আহ্বান জানান, রাষ্ট্র পরিচালনায় সব রাজনৈতিক দল পেশা-শ্রেণির মানুষের অংশগ্রহণ দাবি করেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু ১৯৭৫ সালে সংবিধান সংশোধন করে তো সে পদক্ষেপই গ্রহণ করেছিলেন। নতুন শাসনব্যবস্থায় আওয়ামী লীগ দল ছাড়াও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের কয়েকজনকে মন্ত্রিপরিষদে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। জাতীয় দল ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল)’ গঠন করেছিলেন স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব রাজনৈতিক দল ও শক্তির সমন্বয়ে। জাতীয় দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে ছিলেন আওয়ামী লীগ দলের বাইরে আতাউর রহমান খান, অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ, পীর হাবিবুর রহমান, সৈয়দ আলতাফ হোসেন, মোহাম্মদ ফরহাদ, বেগম মতিয়া চৌধুরী (তখন তিনি ন্যাপে ছিলেন), হাজী মোহাম্মদ দানেশ, মানিকছড়ির রাজা মং প্রু সান, ১৬ জন সচিব, তিন বাহিনীর প্রধান, বিডিআর প্রধান, পুলিশের মহাপরিদর্শক, তিন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, রক্ষীবাহিনীর প্রধান, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, পিজি হাসপাতালের পরিচালক ডা. নুরুল ইসলাম, সাংবাদিক ওবায়েদ-উল হক, আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, মিজানুর রহমান, বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির সভাপতি, বাংলাদেশ চিকিৎসক সমিতির সভাপতিসহ বিশিষ্ট অনেক ব্যক্তি। দুর্ভাগ্য এটাই যে, আজ যারা জাতীয় ঐক্যের কথা বলেন তারাই সেদিন বঙ্গবন্ধুর গৃহীত পদক্ষেপের বিরোধিতা-সমালোচনা করেছিলেন। জাতীয় সংসদে বঙ্গবন্ধুর শেষ ভাষণে উচ্চারিত উপলব্ধি-আহ্বানসমূহ যদি আমরা নিজ নিজ অবস্থানে থেকে আত্মস্থ, লালন ও চর্চা করতে পারি- তাহলে নিঃসন্দেহে আত্মগর্ব নিয়ে বলতে পারব আমরা বঙ্গবন্ধুর কাক্সিক্ষত সোনার মানুষ হয়েছি। সোনার মানুষ হিসেবে নিজেদের তৈরি করার অঙ্গীকার হোক বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে।

লেখক : বিচারপতি, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

হাই কোর্ট বিভাগ এবং সাবেক চেয়ারম্যান

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১, বাংলাদেশ।


আপনার মন্তব্য