শিরোনাম
শুক্রবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০২৪ ০০:০০ টা

নির্বাচন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম

মেজর নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ (অব.) পিএইচডি

নির্বাচন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম

প্রাচীনকাল থেকেই আকর্ষণীয় প্রতিযোগিতা বোঝাতে বাঘে- মহিষের লড়াই, বাঘে-সিংহের লড়াই, শেয়ানে শেয়ানে লড়াই, হাড্ডাহাড্ডি লড়াই- এমন বেশকিছু প্রবাদ ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বাস্তবে বাঘে-সিংহের বা বাঘে-মহিষের লড়াই কেউ কখনো দেখেছেন বলে এখন আর শোনা যায় না। তবে বিশালদেহী দুই কুস্তিগীরের লড়াই, মুষ্টিযোদ্ধাদের লড়াই, জনপ্রিয় দুটি দলের মধ্যে ফুটবল বা ক্রিকেটের লড়াই দেখেই অভ্যস্ত এ যুগের মানুষ এমন কিছু প্রবাদ শুনেও অভ্যস্ত। এর বাইরে নির্বাচন এলে প্রাচীনকাল থেকে প্রচলিত সেই প্রবাদগুলোর ক্রমাগত ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। দুটি দল বা দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর লড়াই বোঝাতে গণমাধ্যমে এবং চায়ের আড্ডায় এমন প্রবাদের বারংবার উচ্চারণ জমিয়ে তোলে নির্বাচনি আমেজ। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, সেই আমেজের তেমন উপস্থিতির অভাব ছিল সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে। প্রতিদ্বন্দ্বীর অভাব কিংবা জীবনাচারের পরিবর্তন- যে কোনো কারণেই হোক এবার নির্বাচনের আগে, নির্বাচন চলাকালে কিংবা নির্বাচন-পরবর্তী সময়, সব ক্ষেত্রে অনেকের আকর্ষণের কেন্দ্রে ছিল ইউটিউব, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, কিংবা মেসেঞ্জারের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো।

পৃথিবীর কোনো দেশেই আজ আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে বাধা দেওয়ার ফলপ্রসূ তেমন কোনো পন্থা নেই। কালো, সাদা বা বিতর্কিত আইন- যাই থাকুক না কেন, উন্মুক্ত আকাশ কিংবা বিশ্বায়নের কারণে কোনো না কোনোভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে একজন বক্তার বক্তব্য, সৃষ্টিশীল মানুষের যে কোনো সৃষ্টি মুহূর্তেই বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ে। ফলে এবারের নির্বাচনের এক অন্যতম অনুষঙ্গ ছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। বিশেষত বিদেশের মাটিতে বসে সরকারবিরোধী বেশ কয়েকজন পরিচিত ও বিতর্কিত মুখ বিদেশি চাপ বিশেষত মার্কিনি কড়া নিয়মনীতি ও নিষেধাজ্ঞার কারণে সরকার পতন সময়ের ব্যাপার বলে প্রচার করতে থাকেন। কেউ কেউ আরেকটু বাড়িয়ে সময়সীমা নির্ধারণ করে দেন এবং এমনটাও প্রচার করেন যে, এই সময়ের মধ্যে সরকার পতন না হলে তারা আর কখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো বক্তব্য প্রদান করবেন না। বাস্তবে সেই সময়সীমা অতিক্রম করে নির্বাচন আয়োজন ও ক্ষমতাসীনদের পুনরায় ক্ষমতায় আরোহণের পরও তারা তাদের প্রচার-অপপ্রচার কিংবা ভবিষ্যদ্বাণী প্রদান অব্যাহত রেখেছেন। ফলে প্রচার বাড়িয়ে নিজের আর্থিক লাভের আশায় তারা এমনটা করছেন বলেও ভাবছেন অনেকে।

ক্ষমতাসীন দলের একাধারে সভাপতিমন্ডলীর সদস্য, দলীয় নমিনেশন বোর্ডের সদস্য এবং নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কো-চেয়ারম্যানকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচ্ছেতাইভাবে রঙ্গ করেছেন তারই দলের এক অঙ্গ-সংগঠনের প্রভাবশালী সদস্য। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বর্ষীয়ান ওই নেতাও একহাত নিয়েছিলেন প্রায় অর্ধেক বয়সী অঙ্গ সংগঠনের প্রভাবশালী সদস্যকে। বাস্তবতা হলো, এ নিয়ে পরপর তিনবার বর্ষীয়ান নেতা তার চিরচেনা সেই প্রতিদ্বন্দ্বীর কাছেই হারলেন। একইভাবে হেরেছেন রানা প্লাজা ধসের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে রাতারাতি দেবতা বনে যাওয়া এক চিকিৎসক। তার মালিকানাধীন বেসরকারি হাসপাতালে রানা প্লাজা ধসে হতাহত গার্মেন্ট শ্রমিকদের বিনা বাক্যে চিকিৎসা দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রশংসিত হন এ চিকিৎসক। একই সময়ে তৎকালীন স্থানীয় সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ভেসে বেড়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। পরবর্তীতে দলীয় প্রতীকে সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী হন সেই বহুল আলোচিত চিকিৎসক। আবারও দলীয় প্রতীক পেয়ে এবারের নির্বাচনে  বৈতরণী পার হতে পারেননি এ প্রতিমন্ত্রী, যার অবস্থান ছিল তৃতীয়। এ প্রতিমন্ত্রী ও তার পূর্বসূরি, যিনি বংশপরম্পরায় সংসদ সদস্য ছিলেন তিনিও নির্বাচন উপলক্ষে সদ্য পদত্যাগ করা একজন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের কাছে হেরেছেন। মূল গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারবিরোধী দলকে অনবরত আক্রমণ ও ব্যঙ্গ করা আরেক বাম ঘরানার দলীয়প্রধানও হেরেছেন নির্বাচনের আগে উপজেলা পরিষদ থেকে পদত্যাগ করা এক চেয়ারম্যানের কাছে। 

বিগত কয়েক বছরের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সর্বাধিক আলোচিত একটি বিষয় ছিল ঢাকাই চলচ্চিত্রের এক নায়িকার সঙ্গে ক্ষমতাসীন এক প্রতিমন্ত্রীর অশ্লীল টেলিফোন কথোপকথন। সেই ঘটনার জেরে দায়িত্ব ছাড়তে হয় আলোচিত ওই প্রতিমন্ত্রীকে। এবারের নির্বাচনে দেশের এক প্রান্ত থেকে সেই নায়িকা আর অন্য প্রান্ত থেকে বিতর্কিত সাবেক মন্ত্রী নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। অনেক প্রত্যাশা ও প্রচেষ্টা করে তাদের কেউ-ই নৌকা প্রতীক লাভ করতে পারেননি। তাই তারা লড়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরূপে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উভয়ের নির্বাচনি প্রচারণার বিভিন্ন দিক বারবার উঠে আসে এবং ব্যাপক প্রচার লাভ করে। ভোটের পর দেখা যায়, উভয়ই তৃতীয় অবস্থানে আছেন। আর জামানত হারিয়েছেন সেই নায়িকা, যদিও সামাজিক মাধ্যমে তিনি ছিলেন অন্যতম আকর্ষণ। চলচ্চিত্রের এক নায়ক ও বহুমাত্রিক গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব বাকের ভাই নামে খ্যাত এক অভিনেতা দলীয় প্রতীক পেয়েছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব থেকেও তারা জয়ের দেখা পেয়েছেন। একইভাবে জয়ী হয়েছেন দুই ক্রিকেট তারকা।

তবে চরম ভরাডুবি হয়েছে এক গায়ক ও দুই গায়িকার। তাদের মধ্যে এক গায়িকা সংসদ সদস্য অবস্থায় দলীয় প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেও হেরেছেন। আর কিংস পার্টির তকমা পাওয়া একটি দলের প্রতীকে নির্বাচন করা এক গায়িকা জামানত হারিয়েছেন। একইভাবে মাত্র ২৬৩ ভোট পেয়ে জামানত হারিয়েছেন গায়ক মহোদয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের গানের যত কদর, ভোটের ময়দানে তার ন্যূনতম প্রতিফলনও দেখা যায়নি।

নির্বাচনের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচিত ছিল কিংস পার্টি খেতাব পাওয়া ও হঠাৎ জন্ম ও আলোচনায় আসা দুটি দল। তাদের হাঁকডাকে অনেকেই নড়েচড়ে বসেছিলেন। আবার অনেকে অলক্ষ্যেই হেসেছেন। ভোটে দল দুটির সব প্রার্থীর করুণ পরাজয় এবং অধিকাংশ প্রার্থীর জামানত হারানোর ঘটনা প্রমাণ করেছে রাজনীতি সবার জন্য নয় এখন তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেবলই হাসি ও করুণার পাত্ররূপে প্রতিফলিত হচ্ছেন।

নির্বাচনের দিনই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশকিছু নির্বাচনি অনিয়ম ভাইরাল হয়ে যায়, যা দিনের পর দিন দেখে চলেছেন দেশ-বিদেশের সর্বস্তরের মানুষ, সমালোচক ও গবেষক। তবে তার চেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় হলো- দলীয় প্রতীক পেয়েও হেরে যাওয়া সাবেক প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও দলীয় নেতারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্বাচনে পরাজয়ের নেপথ্যে সরকারি বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা ও প্রশাসনকে দায়ী করছেন। কেউ কেউ দলীয় অন্য নেতাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস ও কালো টাকা ছড়িয়ে ভোট কেনার কথা বলে চলেছেন।  অথচ এমনটা হওয়ার আশঙ্কা থেকেই নির্বাচন প্রত্যাখ্যান এমনকি দলীয় সরকারবিহীন পরিবেশে ভোট আয়োজনের দাবি করেছিলেন সরকারবিরোধী বড় দল ও বেশকিছু ছোট ছোট দল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণ করা আজ কোনো বুদ্ধিদীপ্ত সমাধান নয়। সততা, সুশাসন ও স্বচ্ছতাই পারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সব বিরূপ প্রচারণার যথাযথ প্রতি-উত্তর দিতে এবং ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করতে।

 

লেখক : গবেষক, বিশ্লেষক ও কলামিস্ট

Email : [email protected]

সর্বশেষ খবর