আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ১২৯ পিরোজপুর-৩ (মঠবাড়িয়া) আসনে রাজনৈতিক উত্তাপ দিন দিন বাড়ছে। এই আসনটিতে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান একটি ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা, যা ভোটারদের আগ্রহ ও কৌতূহলকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। কে থাকবেন এগিয়ে, এই প্রশ্ন এখন এলাকার সর্বত্র।
নির্বাচনী হিসাব অনুযায়ী, পিরোজপুর-৩ আসনে মোট ভোটার ২ লাখ ৪১ হাজার ৩৬১ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ২২ হাজার ৪৫ জন, নারী ভোটার ১ লাখ ১৯ হাজার ৩১৫ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ১ জন। বিপুল এই ভোটব্যাংক দখলে নিতে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা চালাচ্ছেন জোর প্রচারণা, বাড়াচ্ছেন গণসংযোগ এবং সাজাচ্ছেন নির্বাচনী কৌশল।
এই আসনে বিএনপি মনোনীত ‘ধানের শীষ’ প্রতীকের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো. রুহুল আমিন দুলাল। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, দলীয় সাংগঠনিক শক্তি এবং মাঠপর্যায়ের সক্রিয়তাকে পুঁজি করে তিনি শক্ত অবস্থান তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। দলীয় নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ ভোটারদের সমর্থন আদায়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন তিনি।
এদিকে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ‘হাতপাখা’ প্রতীক নিয়ে প্রার্থী হয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য ডা. রুস্তুম আলী ফরাজি। এর আগে এই আসন থেকে চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ায় তার রয়েছে ব্যক্তিগত পরিচিতি ও নিজস্ব ভোটব্যাংক।
অন্যদিকে, ১০ দলীয় জোট সমর্থিত বাংলাদেশ নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ‘শাপলা কলি’ প্রতীকের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন ড. শামীম হামিদী। নতুন রাজনৈতিক ধারা, সংস্কার ও সুশাসনের বার্তা দিয়ে তিনি বিশেষ করে তরুণ ও সচেতন ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন।
এছাড়া এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন আরও কয়েকজন প্রার্থী। জাতীয় পার্টি থেকে মো. মাশরেকুল আজম রবি ‘লাঙ্গল’ প্রতীক নিয়ে মাঠে রয়েছেন। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (বাংলাদেশ জাসদ) থেকে ‘মোটরগাড়ি’ প্রতীক নিয়ে প্রার্থী হয়েছেন করিম সিকদার। এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ‘ফুটবল’ প্রতীক নিয়ে ভোটে অংশ নিচ্ছেন তৌহিদুজ্জামান।
জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী হয়ে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী রুহুল আমিন দুলাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানিয়েছেন, ‘মঠবাড়িয়ার মানুষ আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দিতে ব্যাপকভাবে আগ্রহী। দীর্ঘ সময় পর ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে উৎসাহ ও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।’
দুলাল আরও বলেন, বিগত দিনের স্বৈরাচারী সরকারের দুঃসহ যন্ত্রণা থেকে মানুষ মুক্তি পেয়েছে মানুষ। এখন তারা একটি সঠিক ও বিবেচনাপূর্ণ ভোট তাদের পছন্দের প্রার্থীকে দিতে উদগ্রীব। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মঠবাড়িয়ার জনগণ অতীতেও বিএনপির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত ছিল। তিনি বলেন, ‘ইনশাআল্লাহ, আমার প্রত্যাশা থাকবে সাধারণ মানুষ ধানের শীষে ভোট দিয়ে বিএনপিকে জয়যুক্ত করবে।’
নির্বাচনী পরিবেশ ও সুষ্ঠু ভোট নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে বিএনপির এই প্রার্থী বলেন, ‘ইনশাআল্লাহ, আমি শতভাগ আশাবাদী যে মঠবাড়িয়ায় একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এখানে কোনো ধরনের গন্ডগোল বা বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা নেই। মঠবাড়িয়ার মানুষ শান্তিপ্রিয় এবং তারা শান্তিপূর্ণভাবেই ভোটাধিকার প্রয়োগ করবে।’
এ সময় তিনি মঠবাড়িয়ার প্রধান সমস্যাগুলোর কথাও তুলে ধরেন। দুলাল বলেন, ‘বিগত কয়েক বছরে উপজেলাটিতে মাদকের ভয়াবহ বিস্তার ঘটেছে, যা সমাজের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই মাদকমুক্ত মঠবাড়িয়া গড়ে তোলাই আমাদের অন্যতম অগ্রাধিকার। একই সঙ্গে সন্ত্রাসমুক্ত, শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ একটি মঠবাড়িয়া গঠন করাই আমাদের লক্ষ্য।’
ইসলামী আন্দোলনের ডা. রুস্তুম আলী ফরাজি অভিযোগ করে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, নির্বাচনী মাঠে এখনও স্বচ্ছ ও সমান সুযোগের পরিবেশ নেই। প্রতিপক্ষ আচরণবিধি লঙ্ঘন করছে, হুমকি ও ভয়ভীতি সৃষ্টি করছে।
তিনি জানান, এসব বিষয়ে তিনি মৌখিকভাবে ইউএনও এবং থানার ওসিকে অভিযোগ করেছেন। তারা সতর্ক করছে, কিন্তু তারপরও আইন অমান্য করা হচ্ছে। ভোটারদের জন্য স্বচ্ছ ও সুন্দর পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন।
নির্বাচনে নিজের অবস্থান নিয়ে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, তিনি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দল এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন এবং সবসময় ভালো ফল পেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমি জাতীয় পার্টি ও বিএনপি থেকে নির্বাচন করেছি, আবার দুইবার স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেও অংশ নিয়েছি। আমার অর্থ-সম্পদ বা দলীয় ক্ষমতায় ভরসা নেই এবং আমি সেটিতে বিশ্বাসও করি না।’
ডা. ফরাজি উল্লেখ করেন, অবহেলিত মঠবাড়িয়া অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা ও অবকাঠামো উন্নয়নে তার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। যোগাযোগ ও অবকাঠামো উন্নয়নে প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ ইতোমধ্যেই এগিয়ে নেওয়া হয়েছে।
১০ দলীয় জোট সমর্থিত বাংলাদেশ নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী ড. শামীম হামিদী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘৫ই আগস্টের পর যারা এনসিপি থেকে যুক্ত হয়েছেন, তারা সবাই নতুন। একসময় নাহিদ, আসিফরাও নতুন ছিলেন। তখন তারা যেমন নতুন ছিলেন, ঠিক তেমনই আমরা সারা বাংলাদেশের মানুষকে ৫ই আগস্টের ঘটনার আলোকে ভোটারদের কাছে আমাদের বার্তা পৌঁছে দিচ্ছি। আপনারা আমাদের ওপর ভরসা রাখুন, আমরা আগামীর সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে দেব।’
মঠবাড়িয়ার প্রধান সমস্যার বিষয়ে তিনি জানান, ‘মুখ্য সমস্যা হলো মাদক এবং এর পৃষ্ঠপোষকরা। এই সমস্যা সমাধান হলে ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করবে, শিক্ষিত হবে এবং পারিবারিক শান্তি ফিরে আসবে। এটি শুধু একজন এমপি হিসেবে করা সম্ভব নয়; কমিউনিটি লেভেল থেকে শুরু করে জাতীয় সংসদে আইন তৈরি করতে হবে যাতে সারা দেশ থেকে মাদক ও চোরাকারবারি দূর হয়।’
জোটবদ্ধ হওয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘আমাদের ১০ দলীয় জোটকে আমরা ‘ইসলামপন্থী ও বাংলাদেশপন্থী জোট’ বলছি। ৫ই আগস্টের আগে রাজপথে ৮০ ভাগ মানুষ ইসলামপ্রিয় ছিল। তাদের আকাঙ্ক্ষা এবং যারা বাংলাদেশকে ভালোবাসে তাদের আকাঙ্ক্ষা মিলিয়ে এই জোট গঠিত হয়েছে। ইনশাআল্লাহ, এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি টেকসই বাংলাদেশ গড়ে তুলবে।’’
প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের কথা উল্লেখ করে শামীম হামিদী বলেন,‘‘৫ই আগস্টের পর ‘হেভিওয়েট’ বলে কোনো শব্দ নেই। গত ১৭ বছর দিনের ভোট রাতে হয়েছে, ভোটবিহীন নির্বাচনে কেউ হেভিওয়েট হতে পারে না। তাই জয়ের ব্যাপারে ইনশাআল্লাহ আমি শতভাগ আশাবাদী।’’
বিডি প্রতিদিন/মুসা