Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২১ মে, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২০ মে, ২০১৯ ২২:০৪

সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকা

নিম্নমানের কাগজে পাঠ্যবই মুদ্রণ

নিজস্ব প্রতিবেদক

সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকা

বছরের প্রথম দিন সব শিক্ষার্থীর হাতে বিনামূল্যের পাঠ্যবই তুলে দেওয়া সরকারের অন্যতম অর্জন। কিন্তু নিম্নমানের কাগজে মুদ্রণ করা হচ্ছে বেশির ভাগ পাঠ্যবই। কাগজের জিএসএম, ব্রাস্টিং ফ্যাক্টর, ব্রাইটনেস অনেক কিছুই ঠিক থাকছে না। এতে সরকারের লক্ষ্য ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বছরের অর্ধেক সময় পার হতে না হতেই ছিঁড়ে যাচ্ছে পাঠ্যবই। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)-এর সনদবিহীন এসব কাগজ দিয়ে পাঠ্যবই ছাপিয়ে সরকার বছরে কোটি কোটি টাকার রাজস্বও হারাচ্ছে। ২০২০ শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক, ইবতেদায়ি, মাধ্যমিক, দাখিল ও ভোকেশনাল স্তরের জন্য ৩৫ কোটি ৪৫ লাখ ৯৫ হাজার ৭৭২টি বই ছাপছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। এসব বই আগামী বছরের প্রথম দিন ৪ কোটি ৩৭ লাখ শিক্ষার্থীর হাতে তুলে দেওয়া হবে।

জানা যায়, পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণের জন্য এনসিটিবি দরপত্রের মাধ্যমে কাগজ কিনে মুদ্রণকারীদের সরবরাহ করে। আবার কাগজসহ পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ, বাঁধাই ও সরবরাহের জন্য মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের কাছে দরপত্র আহ্বান করা হয়। বাস্তবে দেখা যায়, দুটি ক্ষেত্রেই সবসময় দরপত্রে বর্ণিত স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী মানসম্মত কাগজে বই ছাপানো হয় না। সূত্র জানান, প্রতি বছরই এনসিটিবির দরপত্রের বিপরীতে কিছু অসাধু প্রতিষ্ঠান ও বিএসটিআই মানসনদবিহীন নিম্নমানের মিল কাগজ সরবরাহ করছে। আর এ কাগজে বিদ্যমান বাজারদর ও এনসিটিবির প্রাক্কলিত দরের তুলনায় অনেক কম দর প্রদান করে মানহীন পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ করে চলছে কিছু প্রতিষ্ঠান। বিএসটিআই আইন-২০১৮ অনুসারে, লেখা ও ছাপার কাগজ পণ্যটি সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশ মান (বিডিএস ৪০৫:২০১২) অনুযায়ী ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মানসনদ গ্রহণপূর্বক বিক্রয়, বিতরণ ও বাজারজাত করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু সব কাগজ উৎপাদনকারী মিল ওই আইন মেনে ব্যবসা পরিচালনা করছে না। এ ব্যাপারে বার বার বিএসটিআই কর্তৃক এনসিটিবিকে সরকারি আইন মেনে চলার তাগিদ দেওয়া হলেও তারা মানছেন না। সর্বশেষ ২ এপ্রিল বিএসটিআই থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সচিব এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর পত্র দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয়, দেশে বতর্মানে ১০৬টি পেপার মিল থাকলেও মাত্র ১৮টি মিল বিএসটিআইর মানসনদ নিয়েছে; যারা নিয়মিত সরকারি রাজস্ব প্রদান করছে এবং মানসম্মত কাগজ ও কাগজ-জাতীয় পণ্য উৎপাদন করছে। প্রতি বছর এনসিটিবির ৩৫ কোটিরও বেশি বই মুদ্রণের জন্য প্রায় ৮০ হাজার মেট্রিক টন কাগজ প্রয়োজন হয়। টনপ্রতি ৮৪ হাজার টাকা প্রাক্কলিত দরে উক্ত কাগজের বিক্রয়মূল্য ৬৭২ কোটি টাকা। এ কাগজ থেকে বিএসটিআইর মার্কিং ফি পাওয়ার কথা থাকলেও তারা পাচ্ছে না। এতে প্রতি বছর সরকার কোটি কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে। এসব ব্যাপারে এনসিটিবি চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র সাহা বলেন, ‘কাগজের মান দেখার জন্য আমরা ইনস্পেকশন এজেন্ট নিয়োগ দিয়েছি। দরপত্রের স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী মান পরীক্ষা করে কাগজ ছাড় করে ইনস্পেকশন এজেন্ট। ফলে নিম্নমানের কাগজে বই ছাপার কোনো সুযোগ নেই।’ জানা যায়, মূলত সিন্ডিকেট করেই এনসিটিবির বইয়ের কাজ পায় বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান; যারা বিএসটিআইর মানসনদ ছাড়াই কাগজের মিলে উৎপাদিত নিম্নমানের কাগজ ব্যবহার করে। সিন্ডিকেটে জড়িয়ে পড়া এনসিটিবির কিছু কর্মকর্তাও সবকিছু জেনেশুনে না জানার ভান করেন। এতে সরবরাহকারী ও মুদ্রাকররা নিম্নমানের কাগজ ব্যবহার করেও পার পেয়ে যান। কিন্তু নিম্নমানের কাগজে বই ছাপানো হলে ছাপার মান খারাপ হয় এবং বই টেকসই হয় না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বইয়ে ছাপানো ছবি থেকে কালি উঠে যায়, ছবি বোঝা যায় না। এ ছাড়া নিম্নমানের কাগজে নানা ধরনের রোগজীবাণু থাকে, যা শিশুস্বাস্থ্য ও চোখের জন্য ক্ষতিকর। জানা যায়, এনসিটিবিতে মুদ্রণ কাজের তদারককারী প্রতিষ্ঠান থাকলেও সেখানেও নিয়মিতভাবে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি চলছে। এ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের একটি অংশের সহায়তায় মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠান সিন্ডিকেট করে রি-সাইকেল্ড কাগজ কিনে নিম্নমানের বই ছাপাচ্ছে। কয়েক বছর আগে বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতি এনসিটিবির গুদামে সরবরাহ করা কাগজ বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) গবেষণাগারে পাঠায়। সেখানে দেখা যায়, এনসিটিবি তার দরপত্রে যে টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশন উল্লেখ করেছিল সরবরাহ করা কাগজের মান তার চেয়ে নিম্ন। কাগজের ‘ব্রাস্টিং ফ্যাক্টর’ কমপক্ষে ১২ থাকার কথা থাকলেও পরীক্ষায় পাওয়া গেছে মাত্র ৮.৫৮, ‘ব্রাইটনেস’ কমপক্ষে ৮০ থাকার কথা অথচ আছে ৬৭.৭৮ এবং ‘জিএসএম’ ৬০-এর বেশি থাকার কথা থাকলেও আছে ৫৮.৮৯। আর কাগজ কতটা মজবুত, কত দিন টিকতে পারে সেজন্য কাগজের ‘ফেয়ার ফ্যাক্টর’ কত তা জানা জরুরি। অথচ স্পেসিফিকেশনে এ ধরনের কোনো চাহিদাই নেই। সাম্প্রতিক সময়েও পরীক্ষাকৃত বইয়ে জিএসএম ৬০-এর বদলে ৪৬.৫৬ ও ব্রাইটনেস ৮৫ শতাংশের বিপরীতে পাওয়া যায় ৬৬.৪৪ শতাংশ। সিএম সনদহীন কারখানার কাছ থেকে নিম্নমানের কাগজ না কিনে শুধু বিএসটিআই মানসনদপ্রাপ্ত কারখানা থেকে কাগজ সংগ্রহ করার জন্য বাংলাদেশ পেপার মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএমএ) পক্ষ থেকেও বার বার শিল্পমন্ত্রীসহ অর্থমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী, এনসিটিবি চেয়ারম্যান ও বিএসটিআই মহাপরিচালক বরাবর আবেদন জানানো হয়। আবেদনে বলা হয়, এনসিটিবি আইনের তোয়াক্কা না করে বিএসটিআই মান ছাড়াই কাগজ ক্রয় ও বই মুদ্রণ করে চলেছে। এতে একদিকে আইন অমান্য করা হচ্ছে। একইসঙ্গে মুদ্রিত বইয়ের গুণগতমান বজায় থাকছে না। শিক্ষার্থীরা মানসম্মত বই না পাওয়ায় বই উৎসবের মতো সফল অর্জন সঠিকভাবে মূল্যায়ন হচ্ছে না। একইসঙ্গে ভাবমূর্তিও নষ্ট হচ্ছে সরকারের এবং সিএম লাইসেন্স ফি বাবদ বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এমনকি দরপত্র আহ্বানের ক্ষেত্রে বিএসটিআই সনদ বাধ্যতামূলক করতে বিপিএমএ একাধিকবার এনসিটিবির কাছে আবেদন জানালেও এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি।


আপনার মন্তব্য