বাংলাদেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও জাতীয় ইতিহাসে ১ জুলাই এক গৌরবোজ্জ্বল দিন। ১৯২১ সালের এই দিনে প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, যে প্রতিষ্ঠান এক শতাব্দীরও বেশি সময় কেবল উচ্চশিক্ষার কেন্দ্র নয়, বরং বাঙালির মুক্তচিন্তা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং রাষ্ট্র গঠনের অন্যতম প্রধান প্রেরণার উৎস। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে যথার্থই ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ বলা হয়।
বঙ্গভঙ্গ রদের পর পূর্ববঙ্গে উচ্চশিক্ষা প্রসারের দাবি ক্রমেই জোরালো হয়ে ওঠে। নাথান কমিশনের সুপারিশ এবং The Dacca University Act, ১৯২০-এর মাধ্যমে ১৯২১ সালের ১ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়টির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। প্রথম উপাচার্য ছিলেন স্যার ফিলিপ জোসেফ হার্টগ। প্রতিষ্ঠাকালে তিনটি অনুষদ, বারোটি বিভাগ, তিনটি আবাসিক হল এবং প্রায় ৮৭৭ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যে অভিযাত্রা শুরু হয়েছিল, তা আজ বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা লাখ লাখ প্রাক্তন শিক্ষার্থীর এক গৌরবময় উত্তরাধিকারে পরিণত হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস মূলত একটি জাতির আত্মপ্রতিষ্ঠার ইতিহাস। ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা যে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তা বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা এনে দেওয়ার পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী মাতৃভাষার অধিকারের সংগ্রামেও অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আবার ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নৃশংস হামলার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। জগন্নাথ হল, ইকবাল হল (বর্তমান সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) এবং শিক্ষক আবাসনে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞে বহু শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারী শহীদ হন। তাঁদের আত্মত্যাগ স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরস্মরণীয়।
স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র পরিচালনা, বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন, কূটনীতি, বিজ্ঞান, চিকিৎসা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, সাংবাদিকতা, অর্থনীতিসহ প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ বহু আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব এই বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবকে বিশ্ব দরবারে উজ্জ্বল করেছেন। কার্জন হল, অপরাজেয় বাংলা, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, টিএসসি ও কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার কেবল স্থাপনা নয়; এগুলো জাতির ইতিহাস, সংগ্রাম ও সাংস্কৃতিক চেতনার জীবন্ত প্রতীক।
বর্তমান বিশ্ব চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের যুগে প্রবেশ করেছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ ও নতুন সম্ভাবনা উন্মোচিত হয়েছে। গবেষণার আন্তর্জাতিক মানোন্নয়ন, আধুনিক গবেষণাগার, সমৃদ্ধ ডিজিটাল গ্রন্থাগার, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, শিল্প-বিশ্ববিদ্যালয় সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক একাডেমিক অংশীদারত্ব জোরদার করে বিশ্ববিদ্যালয়টি বৈশ্বিক উচ্চশিক্ষায় আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে মুক্তচিন্তা, মানবিক মূল্যবোধ, অসাম্প্রদায়িকতা ও নৈতিক নেতৃত্বের চর্চা আরও বিকশিত করাও সময়ের দাবি।
একজন তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের আজীবন সদস্য হিসেবে বিশ্বাস করি, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত শক্তি শুধু তার ঐতিহ্যে নয়; বরং নতুন জ্ঞান সৃষ্টি, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের ধারাবাহিকতায়।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই মাহেন্দ্রক্ষণে আমাদের অঙ্গীকার হোক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে এমন এক বিশ্বমানের বিদ্যাপীঠে পরিণত করা, যেখানে জ্ঞান, মানবিকতা, গবেষণা ও দেশপ্রেম সমানভাবে বিকশিত হবে। প্রতিষ্ঠাতাদের স্বপ্ন, ভাষা আন্দোলনের চেতনা এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে ধারণ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আগামী শতাব্দীতেও বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে-এই প্রত্যাশাই হোক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের সর্বোৎকৃষ্ট শ্রদ্ধাঞ্জলি।
♦ লেখক : গবেষক, প্রাবন্ধিক ও গ্রন্থাগার বিশেষজ্ঞ