আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অভিনেত্রী ববিতা অভিনয় থেকে দূরে আছেন প্রায় আট বছর। কেমন কাটছে এই কিংবদন্তি অভিনেত্রীর সময়। দেশীয় চলচ্চিত্রের বর্তমান অবস্থা নিয়ে তাঁর অনুভূতি কী? এসব বিষয়ে ববিতার বলা কথা তুলে ধরেছেন- আলাউদ্দীন মাজিদ
দীর্ঘদিন ধরে চলচ্চিত্র থেকে দূরে আছেন, অবসর সময়টা কেমন কাটছে?
অনেক মজার সময় কাটছে। সময়-সুযোগ পেলেই কানাডাপ্রবাসী আমার একমাত্র পুত্র অনীকের কাছে ছুটে যাই। একসঙ্গে উইকেন্ডে ঘুরে বেড়াই। ও তো জব ও পড়াশোনা করছে। তাই বলতে গেলে সপ্তাহের এক দিন ছাড়া ওকে পাওয়া সম্ভব নয়। ছুটির দিনে কানাডার দর্শনীয় স্থানগুলোতে আনন্দ করে আমরা ঘুরে বেড়াই। আমার মাছ ধরার খুব শখ। সময় পেলেই মাছ ধরতে যাই। আমি যখন কানাডায় থাকি না তখন জব শেষ করে বাসায় ফিরে রান্নাবান্না করে খেতে ওর খুব কষ্ট হয়। এখানে তো কাজের লোক পাওয়া যায় না। নিজের কাজ নিজেকেই করতে হয়। তাই আমি যখনই আসি ওর জন্য ওর পছন্দের সব খাবার রান্না করি। ও খুব তৃপ্তি নিয়ে তা খায়। এতে আমার খুব খুশি লাগে। অন্যদিকে আবার যুক্তরাষ্ট্রেও যাই। সেখানে আমার প্রবাসী দুই ভাই আছেন, তাদের সঙ্গে আনন্দঘন সময় কাটাই। এ ছাড়া বাসার দৈনন্দিন কাজকর্ম, নামাজ দোয়া, টিভি দেখা, বই পড়া এসব নিয়েই সময় কেটে যাচ্ছে।
আবার কখন কানাডায় অনীকের কাছে যাচ্ছেন?
আশা করি এ মাসের শেষ সপ্তাহেই যাব ইনশাল্লাহ।
অভিনয় বা নির্মাণে আবার ফেরার সম্ভাবনা কি আছে?
আমি তো বরাবরই বলে আসছি ভালো গল্প ও চরিত্রের অভাবে অভিনয় ছেড়েছি। এ দুটি যদি মনের মতো করে পাই তাহলে অভিনয়ে ফিরতে আমার কোনো আপত্তি নেই। আর নির্মাণের চিন্তা আপাতত বাদ দিয়েছি। কারণ সিনেমা হল আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে, দর্শক সিনেমা হলে যায় না। এতে বিনিয়োগ করা অর্থ ফেরত আসবে কোথা থেকে। লোকসান গুনে চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে যাব কেন।
চলচ্চিত্রের দুর্দশার মধ্যেও সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু ছবি কিন্তু দর্শক দেখেছে?
হ্যাঁ অনেক ভালো ছবি নির্মাণ হয়েছে এবং কিছু ছবি দর্শক দেখছে। এটি আমাদের চলচ্চিত্রশিল্পের জন্য সত্যিই আশার কথা। কারণ দীর্ঘদিন ধরে দর্শক সিনেমা হলে যায় না। মানসম্মত ছবি নির্মাণ হয় না। সিনেমা হলের পরিবেশও ভালো নয়। এ অবস্থায় চলতি বছরের গত ঈদ থেকে এখন পর্যন্ত মুক্তি পাওয়া কিছু ছবি দর্শক সাড়া জাগাতে পারছে। এটি দেশীয় চলচ্চিত্রের জন্য সত্যিই সুখের কথা। এ সফলতা ধরে রাখতে হবে। আর এ ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে দর্শক আসলে কী চায় সেদিকে নজর দিতে হবে।
চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে আপনার প্রত্যাশা কী?
আমি সব সময় ইতিবাচক। এ জগৎটাকে ভালোবাসি। আমি চাই, আরও ভালো ভালো ছবি হবে। আমার কথা, এমন ছবি বানান যেগুলো বক্তব্যপূর্ণ ও সুন্দর হবে, আবার সমাজের জন্য বার্তাও থাকে; ব্যবসায়িকভাবেও সাফল্য পাবে। ভালো গল্প, স্ক্রিপ্ট, ডায়ালগ-সবকিছু মিলিয়ে যেটা হবে সেটাই ভালো সিনেমা। মানে এরকম না যে, শুধু ধুমধাড়াক্কাই হবে। সব মিলিয়েই ভালো ছবি বানাতে হবে। আমজাদ হোসেন, জহির রায়হানদের ছবিগুলো যে ধরনের হতো- সেগুলোকে আমি বলব, ফুল প্যাকেজের মুভি। কিন্তু এখন অনেক সময় ছবি বানানো হলো, শুধু সিনেমা হলে অল্প কিছু দর্শক গেল। তাতে তো কিছু হবে না। সব ধরনের লোকজনকে দেখতে হবে সিনেমা।
চলচ্চিত্রের বর্তমান অবস্থা কেমন মনে হয়?
অনেকে অনেক কারণে হতাশার কথা বলেন। অনেক ব্যবসায়ী আমাদের ফিল্মে ঢুকে গেছেন। তারা শিল্পমান নয়, ব্যবসাটাকেই বেশি প্রাধান্য দেন। সেই দিক থেকে বিষয়টি হয়তো তারা বলছেন, দেখা যাক কী হয়। আগে পরিবার নিয়ে দর্শক সিনেমা হলে যেত, তখন হলের পরিবেশ অনেক সুন্দর ছিল। সিনেমা হলে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ছিল। সবার তো আর গাড়ি ছিল না; রিকশায়, হেঁটে যে যেভাবে পারত সিনেমা হলে যেত। কিন্তু এখন অনেকে হলে যায় না। কারণ বেশির ভাগ সিনেমা হলের পরিবেশ দর্শক উপযোগী নয়।
সিনেমা হলে না যাওয়ার কারণ কি শুধুই নিরাপত্তা?
না, আরও কারণ আছে। অনেকে এখন ভাবছে ঘরে বসেই তো আমরা টিভি চ্যানেল, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও ইউটিউবে বাংলাদেশ, বলিউড ও হলিউডের হিট ছবিগুলো দেখতে পাচ্ছি। তাহলে হলে যাব কেন?
তাহলে ড্রয়িংরুমই দর্শকদের হলবিমুখ করেছে?
তা তো অবশ্যই। আমরা যদিও বলি, হলে বসে সিনেমা দেখার আবেদন সব সময় আলাদা। কিন্তু আপনি যখন বিনোদনমূলক সিনেমা দেখতে যাবেন তখন সবকিছু ভেবেই মা-খালা-বোনকে নিয়ে সিনেমা দেখতে যাবেন। এখন তো পরিবারগুলো, বিশেষ করে নারীরা সিনেমা হলে যায় না। কারণ সার্বিকভাবে সিনেমা হলে যাওয়ার পরিবেশ নেই।
চলচ্চিত্রের মন্দাবস্থার পেছনে দায়ী কারা?
আসলে মুষ্টিমেয় কিছু লোকের হাতে সিনেমার ব্যবসাটা চলে গেছে। আমাদের শিল্পীরা ভালো অভিনয় করছেন; সব ঠিক আছে কিন্তু আপনি কী বানাচ্ছেন? ভালো গল্প তো নেই। আজকাল যেন মনে হয় ‘সেক্স’ ও ‘ভায়োলেন্সের’ দিকে ঝুঁকছে অনেকে। আমি তো অবাক হয়ে যাই, আমাদের মেয়েগুলো ভারতে গিয়ে ছবি করল, ওদের পোশাক দেখে ভয় লেগে গেছে। একি হচ্ছে! আামাদের সময়ে শাবানা আপা, কবরী আপা, সুচন্দা আপাদের কি সিনেমা চলেনি? আমরাও তো আধুনিক পোশাক পরেছি, কিন্তু শালীনতা বজায় ছিল। খোলামেলা পোশাক দেখে মা-খালারা বলেন, ‘সিনেমা হলে বাচ্চাদের নিয়ে যাব না’ এমন কথাও শুনেছি।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, যুগের সঙ্গে তাল মেলাতেই এমন উপস্থাপনা
হলিউড-বলিউডের পোশাকের সঙ্গে যদি আমি নিজেকে মেলাই তাহলে তো হবে না। তাই না? আমার আগে দেখতে হবে, আমি কোন দেশের মানুষ, আমাদের ধর্ম আর সংস্কৃতি কেমন। যেমন ভারতের ছবির পোশাকের ব্যাপারেই বলি, ওই সব পোশাক কিন্তু আমাদের জন্য নয়। তাই যুগের সঙ্গে এমন তাল মেলানোর কোনো অর্থ হয় না, যা করতে গিয়ে অধিকাংশ দর্শক পরিবার নিয়ে ওই ধরনের ছবি দেখতে সিনেমা হলে যেতে বিব্রতবোধ করে। তাই নিজ দেশের কৃষ্টিকালচারের দিকে নজর দিয়েই ছবি নির্মাণ করলে সেই ছবি দেখতে সপরিবারে দর্শক সিনেমা হলে যাবে।
সব শেষে জানতে চাইব, তারকাদের গোপন প্রেম-বিয়ে-সন্তান এবং নেতৃত্ব নিয়ে চলচ্চিত্র জগতে একটা অস্থিরতা চলছে, এ বিষয়ে আপনার পরামর্শ কী?
দেখুন তারকাদের গোপন প্রেম-বিয়ে-সন্তান এসব তাদের একান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার। এসব আগেও ছিল। কিন্তু আগে এসব নিয়ে মিডিয়া এত মাতামাতি করত না। এখন তো ইউটিউবাররা এবং কিছু অখ্যাত অনলাইন পোর্টাল ভিউ বাড়াতে মানে নিজেদের স্বার্থে তিলকে তাল বানিয়ে শোবিজ তারকাদের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করছে। এ ব্যাপারে সরকারসহ সবাইকে সচেতন হতে হবে। আর শোবিজ জগতের বাসিন্দাদের নিজেদের মানসম্মান বজায় রেখে কাজ করতে হবে। কারণ একজনের ভুলের জন্য পুরো চলচ্চিত্রশিল্প সবার চোখে ছোট হোক তা কেউ চায় না। আর সমিতির নেতৃত্ব নিয়ে বাড়াবাড়ি মোটেও পছন্দ করি না। কারণ সমিতি হলো সদস্যদের স্বার্থ রক্ষার সংগঠন। কাজের পরিবর্তে নেতৃত্ব নিয়ে বাড়াবাড়ি উচিত নয়। এতে এই শিল্পের উন্নতির পরিবর্তে অবনতিই অবধারিত। আমাদের সময়ে সমিতির চেয়ারে বসার জন্য এমন দ্বন্দ্ব-সংঘাত কখনো দেখা যায়নি। এসব করার সময়ও কারও ছিল না। কারণ কাজই ছিল সবার কাছে মুখ্য।