মাত্র ছয় মাসের ইসরায়েলি বন্দিদশা কীভাবে একটি মানুষের জীবনকে চিরতরে ধ্বংস করে দিতে পারে, তার জলজ্যান্ত উদাহরণ ফিলিস্তিনি সাংবাদিক মুজাহিদ বানি মুফলেহ। গত ২৮ জুন ২০২৫ তারিখে নাবলুসের বেইতা শহরের নিজ বাড়ি থেকে কোনো অভিযোগ বা বিচার ছাড়াই তাকে আটক করে ইসরায়েলি বাহিনী। দীর্ঘ ছয় মাস প্রশাসনিক আটকাদেশে থাকার পর গত ১২ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে যখন তিনি মুক্তি পান, তখন তার চেনা অবয়ব সম্পূর্ণ হারিয়ে গেছে। ২৫ কেজি ওজন হারিয়ে বসা চোখ আর ভেঙে পড়া শরীর নিয়ে যখন তিনি বাড়ি ফেরেন, তখন তাকে চেনা করাই দায় হয়ে পড়েছিল। ডায়াবেটিস ছাড়া আগে সম্পূর্ণ সুস্থ থাকা ৩৬ বছর বয়সী এই তিন সন্তানের জনক কারাবন্দী অবস্থায় নিয়মতান্ত্রিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, অনাহার এবং চরম চিকিৎসা অবহেলার শিকার হন।
মুক্তির মাত্র দুদিন পর মস্তিষ্কে মারাত্মক রক্তক্ষরণ ও স্ট্রোকের শিকার হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন মুজাহিদ। চিকিৎসকরা তার মাথার খুলির একটি অংশ কেটে ফেলে মস্তিষ্কের চাপ কমানোর জরুরি অস্ত্রোপচার করেন, যার পর দীর্ঘ দুই মাস তিনি কোমায় ছিলেন। বর্তমানে জেনিনের ইবনে সিনা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মুজাহিদের প্রতিটি বাক্য এখন ধীর আর দীর্ঘ যন্ত্রণাময় বিরতিতে ভরা। তিনি নিজেই জানিয়েছেন, নির্যাতনের তীব্রতায় তার শরীর ও কথা বলার ক্ষমতা ভেঙে পড়েছে, কিন্তু তার স্মৃতি এখনো বন্দিশালার সেই অন্ধকার দিনগুলোতে আটকে আছে। সাংবাদিক হিসেবে তিনি সবসময় স্বপ্ন দেখতেন কারাগারের ভেতরের নির্মমতার গল্পগুলো বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরবেন কিন্তু স্ট্রোকের কারণে আজ তিনি নিজেই একটি করুণ গল্পে পরিণত হয়েছেন।
হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে মুজাহিদ স্মরণ করেন তার সেলমেটদের কথা, যারা নির্যাতনের শিকার হয়ে কারাগারেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। তিনি জানান পঞ্চাশোর্ধ্ব সমীর আল-রিফাইয়ের কথা, যাকে আদালত থেকে ফেরার পর প্রচণ্ড নির্যাতন করা হয় এবং পরে সেলে পেপার স্প্রে ছিটানোর পর তিনি মারা যান। চোখের সামনে তিনি দেখেছেন ২০ বছর বয়সী তরুণ আহমদ তাজাজাহকে, যার মুখে নির্যাতনের সময় হিংস্র কুকুর লেলিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সামান্য অ্যান্টিবায়োটিকের অভাবে ক্ষত ইনফেকশন হয়ে এবং অনবরত বমি করে ছেলেটি একসময় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। বন্দিদশার এই ভয়াবহ দিনগুলোতে মুজাহিদ কেবল তার ছোট ছেলে আরবের কান্নারত মুখটি মনে করে বেঁচে থাকার শক্তি খুঁজতেন, যে দৃশ্যটি তাকে গ্রেফতারের সময় তার চোখের সামনে ঘটেছিল।
মুজাহিদের স্ত্রী নুহা আল-শুরফা জানান, মুজাহিদের ফিরে আসা তাদের পরিবারের জন্য এক নতুন জীবন পাওয়ার মতো হলেও তার পুরোপুরি সুস্থ হওয়া এখনো অনেক দূরের পথ। ফুসফুসের জটিলতার আশঙ্কায় গত পাঁচ মাস ধরে তিনি ঠিকমতো পানি পর্যন্ত পান করতে পারছেন না। কারাগারের দিনগুলো মুজাহিদকে জীবনের এক চরম বাস্তবতা শিখিয়েছে, যেখানে এক টুকরো রুটি বা এক ঢোক ঠাণ্ডা পানি পাওয়ার স্বপ্নই ছিল জীবনের সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা। সাংবাদিকতার পেশাগত জীবনে ফেরার লড়াইয়ে থাকা মুজাহিদ মনে করেন, বিছানা থেকে উঠতে পারা বা ব্যথামুক্ত একটি রাত পার করতে পারার মতো সাধারণ বিষয়গুলোই আসলে জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ। তিনি এখনো দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যে, শারীরিক অক্ষমতাকে জয় করে কারাগারের অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া সেই মানুষগুলোর কণ্ঠস্বর তিনি দুনিয়ার সামনে তুলে ধরবেনই।
বিডি প্রতিদিন/এনএইচ