বিএনপি সরকার বাংলাদেশে একটি ইতিহাস তৈরি করতে যাচ্ছে ন্যায়পাল নিয়োগের মাধ্যমে। আগামী তিন বছরের মধ্যে সংবিধানের অধীনে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে একজন ন্যায়পাল নিয়োগের কর্মপরিকল্পনার কথা সরকারকে জানিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। মন্ত্রিপরিষদ ও প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠনের আগেও নির্বাচনি ইশতেহারে ন্যায়পালের কথা বলা ছিল।
সরকার গঠনের পর থেকে বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারের আলোকে একটি সংক্ষিপ্ত কর্মপরিকল্পনা করতে যুগ্মসচিব মনিরুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি আট সদস্যের কমিটি করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। যার সদস্যসচিব ছিলেন যুগ্মসচিব তানভীর আহমেদ। সব মন্ত্রণালয়ের জন্য পৃথক সংক্ষিপ্ত কর্মপরিকল্পনা করে সেই প্রস্তাব জমা দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিবের কাছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ তা পাঠিয়েছে সরকারের কাছে। মন্ত্রিপরিষদের সেই কর্মপরিকল্পনা নথি এসেছে বাংলাদেশ প্রতিদিনের হাতে। কর্মপরিকল্পনায় বলা হয়েছে, দুর্নীতি দমন সংক্রান্ত অনুচ্ছেদে আগামী তিন বছরের মধ্যে একজন ন্যায়পাল নিয়োগের কথা।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সংক্ষিপ্ত কর্মপরিকল্পনা বাস্তাবায়ন চিত্র নিয়ে জানতে চাইলে মুখ্য সচিব আবদুস সাত্তার বাংলাদেশ প্রতিদিনের কাছে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি। কর্মপরিকল্পনা করা কমিটির একাধিক সদস্য বলেন, আমরা প্রয়োজনীয় এবং জরুরি বিষয় তুলে ধরেছি, সিদ্ধান্ত নেবে সরকার। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রতিটি কর্মপরিকল্পনা তিন ধাপে ভাগ করেছে। এক বছরের মধ্যে স্বল্পমেয়াদি, এক থেকে তিন বছরের মধ্যে মধ্যমেয়াদি এবং তিন বছরের বেশি সময় লাগলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা হয়েছে। দুর্নীতি দমন সংক্রান্ত অনুচ্ছেদে আরও বলা হয়েছে, অর্থ পাচার রোধ ও ফ্যাসিস্ট আমলে পাচারকৃত অর্থ দেশে ফেরত আনা। তিন বছরের মধ্যে অর্থ পাচার ও দুর্নীতির অনুসন্ধান করে পূর্ণাঙ্গ শ্বেতপত্র প্রকাশ করা। মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা হিসেবে ব্যবসাবাণিজ্য হয়রানি ও জটিলতা নিরসনে সিঙ্গেল উইন্ডো ক্লিয়ারেন্স, ওয়ানস্টপ সার্ভিস এবং সম্পূর্ণ ডিজিটাল কর্মপ্রবাহ তৈরি করা। এদিকে, মধ্যমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা হিসেবে ন্যায়পালের কথা বলা হয়েছে। যা হবে বিএনপির সরকারের জন্য এক নতুন ইতিহাস। একই সঙ্গে দেশের ইতিহাসেও প্রথম। আইন মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সংবিধানের ৭৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে : (১) সংসদ আইনের দ্বারা ন্যায়পালের পদ-প্রতিষ্ঠার জন্য বিধান করিতে পারিবেন। (২) সংসদ আইনের দ্বারা ন্যায়পালকে কোনো মন্ত্রণালয়, সরকারি কর্মচারী বা সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষের যেকোনো কার্য সম্পর্কে তদন্ত পরিচালনার ক্ষমতাসহ যেরূপ ক্ষমতা কিংবা যেরূপ দায়িত্ব প্রদান করিবেন, ন্যায়পাল সেইরূপ ক্ষমতা প্রয়োগ ও দায়িত্ব পালন করিবেন। (৩) ন্যায়পাল তাহার দায়িত্বপালন সম্পর্কে বাৎসরিক রিপোর্ট প্রণয়ন করিবেন এবং এই অনুরূপ রিপোর্ট সংসদে উপস্থাপিত হইবে। যদিও ১৯৮০ সালে এ সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। কিন্তু সেটি কার্যকর হয়নি অদ্যাবধি। আইনটিতে ন্যায়পালের পূর্ণ স্বাধীনতা, কাজের প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কিছু দুর্বলতা রয়েছে বলেও মত আইনজ্ঞদের। ন্যায়পাল নিয়োগ হলে সরকারি কার্যক্রম আরও স্বচ্ছ ও দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন হবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার ও নাগরিকের অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা বন্ধ করতে ন্যায়পাল নিয়োগ জরুরি। সুপ্রিম কোর্টের কয়েকজন সিনিয়র আইনজীবীদের মতে, নির্বাহী বিভাগের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ঠিকমতো কাজ করছেন কি না সেটা তদারকি করা ন্যায়পালের কাজ, যা আমাদের দেশের অনেকেই এ খবরদারি পছন্দ করেন না। এ কারণেই এত বছরেও এটি হয়নি।