শিরোনাম
প্রকাশ : ৯ আগস্ট, ২০২০ ১৮:২৮

বঙ্গবন্ধু হত্যার নেপথ্যের ষড়যন্ত্র উন্মোচিত হোক

ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন

বঙ্গবন্ধু হত্যার নেপথ্যের ষড়যন্ত্র উন্মোচিত হোক
ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন

উনিশ শো পঁচাত্তর সালে চৌদ্দই আগস্ট রাতে ঢাকার শাহবাগে তৎকালীন হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালে কিছু মানুষের সন্দেহজনক গতিবিধি দেখে ফজলুল হক মনিকে ফোন করেছিলেন পঞ্চগড়ের আওয়ামী লীগ নেতা সিরাজুল ইসলাম এমপি। ফজলুল হক মনি টেলিফোনে জানালে বঙ্গবন্ধু স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে তা উড়িয়ে দেন। তার কয়েক ঘণ্টা পরেই নিষ্ঠুর ঘাতকের দল পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। চৌদ্দই আগস্ট রাতের ঘটনাটি আমি সিরাজুল ইসলামের কাছ থেকে শুনেছিলাম। সেই থেকে ঘটনাটি আমার মাথায় গেঁথে আছে। 

গত তেসরা আগস্ট ‘বাংলা ইনসাইডার’ নিউজ পোর্টালে প্রকাশিত অধ্যাপক মোদাচ্ছের আলী স্যারের ‘১৫ আগস্ট: ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিশন হোক’ শীর্ষক লেখাটি পড়ে ভাবনাটি নতুন করে আবার মাথায় এলো। আমরা সবাই জানি, দেশে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হয়েছে। অধিকাংশ খুনির শাস্তিও হয়েছে। যে কয়েকজন সাজাপ্রাপ্ত খুনী এখনো বিদেশে পলাতক, তাদেরও দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে। এখন কথা হলো, বঙ্গবন্ধুকে কি সেনাবাহিনীর কয়েকজন বিপথগামী সদস্য মিলেই হত্যা করেছিল? 

নাকি বৃহত্তর একটি ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই নৃশংস এই হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়েছিল? হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণকারী খুনিদের বিচারের পাশাপাশি এই প্রশ্নের জবাব জানাটাও আমাদের জন্য জরুরি। এই প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিশনের দাবি জানিয়েছেন অধ্যাপক মোদাচ্ছের আলী। পরবর্তীতে তার এই দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে আরও কয়েকজন লিখেছেন। তবে গুরুত্ব বিবেচনায় এটি কেবলমাত্র কয়েকজন কলামিস্টেরই দাবি নয়, এটা আমাদের জাতীয় দাবি হওয়া উচিত।

সত্তর দশকের শুরুর দিকে বিশ্ব রাজনীতি মূলত দুইভাগে বিভক্ত ছিল। একদিকে ছিল পুঁজিবাদী আমেরিকার বলয়ভুক্ত দেশসমূহ, আরেকদিকে ছিল সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের অনুসারী দেশসমূহ। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে আমেরিকা আমাদের বিরোধিতা করেছিল। পাকিস্তানের স্বপক্ষে তারা সপ্তম নৌ-বহর পর্যন্ত পাঠিয়েছিল, যদিও সেটা পৌঁছাবার আগেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীতে সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত বাংলাদেশের প্রতি আমেরিকার দৃষ্টিভঙ্গিও বিশ্লেষণের দাবি রাখে। মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের কাছে পরাজিত হয়ে পাকিস্তান কী ভূমিকায় নেমেছিল? পরাজিত পাকিস্তানের এদেশীয় দোসরদের কার্যকলাপ কী রকম ছিল? 

মুক্তিযুদ্ধে আওয়ামী লীগ নেতা খন্দকার মুশতাকের ভূমিকা আসলে কী ছিল? মুশতাক কি বাংলাদেশের স্বাধীনতা চেয়েছিলেন? নাকি পাকিস্তানের পরাজয় নিশ্চিত জেনে যে কোনভাবে বাংলাদেশকে পাকিস্তানের অংশ হিসেবে রাখার জন্য শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা করেছিলেন? শুনেছি, মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে বিভিন্ন ক্যাম্পে গিয়ে আওয়ামী লীগ নেতাদের কাছ থেকে মুশতাক প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলেন। কুমিল্লার বার্ডে সে সময়ের আমলা মাহবুবুল আলম চাষীরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার লক্ষ্যে যে সভা করেছিলেন সেখানে কারা কারা ছিলেন, সেটাও আমাদের সবার জানতে হবে। হত্যার ষড়যন্ত্রে মাহবুবুল আলম চাষীর সাথে খন্দকার মুশতাকের যোগসাজসের কথাও সর্বজনবিদিত। হত্যার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করার পর সেনাবাহিনীর তৎকালীন উপ-প্রধান জিয়াউর রহমানের সাথে খুনি গং ফারুক-রশীদদের সভার বিষয়টি সম্পর্কে জানা গুরুত্বপূর্ণ। সে সময়ের সেনা প্রধানসহ অন্যান্য সেনা কর্মকর্তার ভূমিকাও বিশ্লেষণ করতে হবে। এরকম আরও অনেক প্রশ্ন আছে। এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করার জন্য একটা ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং মিশন গঠন করা হোক। 

বিচ্ছিন্ন ভাবে বিভিন্ন গ্রন্থে, নথিপত্রে এসংক্রান্ত অনেক তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যায়। এসব একখানে করে যৌক্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করতে হবে। দেশ ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেই বর্তমান সরকারের উচিত অচিরেই এই কমিশনটা গঠন করা। কমিশনের জন্য যোগ্য লোকদের খুঁজে বের করে দায়িত্ব দিতে হবে। সময় খুব দ্রুত চলে যাচ্ছে, বদলে গেছে পৃথিবীর রাজনীতির অনেক হিসাব-নিকাশ। সময়ের বিচারেও তাই দেরি করবার মত সময় আমাদের হাতে খুব একটা নাই। 

বঙ্গবন্ধু হত্যার নেপথ্যের বৃহত্তর কাহিনীর উদঘাটন হলে বাংলাদেশের রাজনীতির অনেক অস্পষ্ট অধ্যায়ের অবসান হবে, মুখোশ উন্মোচিত হবে অনেক অশুভ শক্তির। আমাদের আগামীর সুষ্ঠু পথচলার স্বার্থেও বৃহত্তর এই সত্যের উন্মোচন প্রয়োজন। আমি মনে করি, খুনিদের বিচারের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের প্রাথমিক পর্বটি সম্পন্ন হয়েছে। এখন দ্বিতীয় ও গুরুত্বপূর্ণ পর্বটির জন্য অপেক্ষা। 

বঙ্গবন্ধু হত্যার নেপথ্যের জাতীয়-আন্তর্জাতিক কুশীলবদের চিহ্নিত করার জন্য একটা ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিশন গঠিত হোক - মুজিববর্ষে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার কাছে এটি আমাদের সবার দাবি।

লেখক : বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা, বর্তমানে অস্ট্রেলিয়া আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক।

বিডি প্রতিদিন/আরাফাত


আপনার মন্তব্য