নিজের প্রতিবন্ধী মেয়েকে কোনো সাধারণ স্কুলে ভর্তি করাতে না পারার বেদনা থেকে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ‘মাহমুদা প্রতিবন্ধী স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করেছেন শামসুন্নাহার কবির। ২০১৪ সালে উপজেলার বরইবাড়ী এলাকায় মাত্র পাঁচজন শিক্ষার্থী নিয়ে ভাড়া বাসায় যাত্রা শুরু করা এই প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে দক্ষিণ কালামপুর এলাকায় নিজস্ব জমিতে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষা, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে এক অনন্য ভূমিকা রাখছে। প্রতিবন্ধী শিশুদের স্বপ্ন পূরণের এই যাত্রায় সরকারি সহযোগিতা পেলে আলোকিত ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারবে ‘মাহমুদা আদর্শ প্রতিবন্ধী স্কুল’। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শামসুন্নাহার কবির তাঁর প্রতিবন্ধী মেয়েকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য কোনো স্কুল না থাকায় প্রথমে নিজ প্রতিবন্ধী মেয়েসহ মাত্র পাঁচজন শিক্ষার্থী নিয়ে উপজেলার পল্লী বিদ্যুৎ হরিণহাটি এলাকায় তাঁর বাসার বারান্দায় পড়াতে শুরু করেন। পরে ২০১৪ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি উপজেলার বরইবাড়ী এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় ‘মাহমুদা আদর্শ প্রতিবন্ধী স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করেন। পরে ২০১৮ সালে কালিয়াকৈর পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ কালামপুর আদর্শপাড়া এলাকায় ক্রয়কৃত ছয় শতাংশ জমির ওপর স্কুলটি স্থানান্তর করা হয়। গত ১২ বছর ধরে বিনা বেতনে চলছে এই স্কুলে শিক্ষার্থীদের পাঠদান। বর্তমানে এখানে পড়াশোনা করছে ১০০ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে প্রতিবন্ধী শিশু ৮০ জন আর ২০ জন দরিদ্র ও গরিব শিশু। এখানে মোট শিক্ষক রয়েছেন পাঁচজন। বর্তমানে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান চলছে। শিশুদের অক্ষর পরিচয়ের পাশাপাশি এখানে শিক্ষার্থীদের নাচ, গান, ছবি আঁকা, কুটিরশিল্প ও কম্পিউটার প্রশিক্ষণের মতো বৃত্তিমূলক শিক্ষা দেওয়া হয়। সরকারি অর্থায়নে স্কুলটিতে অফিসকক্ষ, ছাত্রছাত্রীদের বেঞ্চ-টেবিলসহ গভীর নলকূপ স্থাপন করে দেওয়া হয়েছে। তবে শিক্ষা উপকরণ আর পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় নিয়মিত পাঠদান কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। স্কুলটি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তাকে সভাপতি করে ১৩ সদস্যবিশিষ্ট কার্যকরী কমিটি গঠন করা হয়েছে। ২০২৩ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার আন্তর্জাতিক সহায়তা দল স্কুলটি পরিদর্শন করেন। দলটি স্কুলের শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষার্থীদের খোঁজখবর নেন। সম্প্রতি ‘ভালো কাজের ভালো মানুষ’-এর উদ্যোগে শামসুন্নাহারের এই অনন্য কাজের খবর পায় গাজীপুর জেলা প্রশাসন। পরে স্কুলটি পরিদর্শন করে এর উন্নয়নে সহযোগিতার আশ^াস দেন জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া। শামসুন্নাহার কবির গাজীপুরের কালিয়াকৈর পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের পল্লী বিদ্যুৎ হরিণহাটি এলাকার বাসিন্দা মো. কবীর হোসেনের স্ত্রী। স্বামীর কালিয়াকৈরে চাকরির কারণে তিনি পরিবারের সঙ্গে গাজীপুরের বসবাস করছেন। তাদের দুই ছেলে, দুই মেয়ে ছিল। ২০০০ সালে তাদের বড় ছেলে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। ২০০৯ সালে জন্মগ্রহণ করে ছোট মেয়ে মাহমুদা। দুই মেয়ের মধ্যে ছোট মেয়ে মাহমুদা বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। তিনি তাঁর প্রতিবন্ধী মেয়ের পাশাপাশি এলাকার অন্য প্রতিবন্ধী শিশুদের লেখাপড়ার কথা চিন্তা করে নিজেই একটি প্রতিবন্ধী স্কুল খোলার উদ্যোগ নেন। অভিভাবকরা বলেন, আমাদের সন্তানদের সাধারণ স্কুলে ভর্তি করিয়েছিলাম কিন্তু সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কোনোভাবেই পড়াশোনা করতে পারে না। সহপাঠীরা তাদের খেলায় নেয় না। ওদের ধরে মারতো, তারপর আমরা এই প্রতিবন্ধী স্কুলের সন্ধান পেলাম। এখানে ভর্তি করার পর থেকে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের যত্ন আর ভালোবাসায় ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠছে এই শিশুরা।
বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী নাদিয়া প্রতিদিন সকালে স্কুলে এসে সহপাঠীদের সঙ্গে খেলাধুলা করে, আর শিক্ষিকার দেওয়া পাঠ মনোযোগ দিয়ে শোনে। তার মতো এই স্কুলে অনেকে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী, কেউ শ্রবণপ্রতিবন্ধী, আবার কেউ শারীরিক প্রতিবন্ধী। স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক শামসুন্নাহার কবির বলেন, ‘সাধারণ স্কুলে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় না। আমার মেয়ে মাহমুদার জন্মের পরেই জানতে পারি তার হার্টে তিনটি ছিদ্র রয়েছে, ডাক্তার বলেছিলেন, সে ১৮ বছর বাঁচবে। পরে আর অপারেশন করাইনি। আমার প্রতিবন্ধী মেয়েকে অনেক স্কুলে ভর্তি করাতে চাই। অনেক অনুরোধের একপর্যায়ে একটি স্কুলে ভর্তি করে নেয়। কিন্তু সেখানে আমার মেয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে স্বাভাবিক আচরণ না করায় অনেক অভিভাবক বিভিন্ন ধরনের কথা বলেন। কাঁদতে কাঁদতে মেয়েকে নিয়ে সেখান থেকে চলে আসি। এরপর নিজেই একটি প্রতিবন্ধী স্কুল খোলার চিন্তা করি। সেই থেকে প্রথমে আমার প্রতিবন্ধী মেয়েসহ পাঁচজন প্রতিবন্ধী শিশুকে নিয়ে স্কুল চালু করেছিলাম। আমার ছোট্ট মেয়ের নামেই গড়ে তুলেছি ‘মাহমুদা আদর্শ প্রতিবন্ধী স্কুল’। আমি অনেক কষ্ট করে খেয়ে না খেয়ে ছয় শতাংশ জমি কিনে অর্ধেক বিল্ডিং ঘর নির্মাণ করি। এতে ছয়টি কক্ষ রয়েছে। এখন স্কুলটিতে ৮০ জন প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর পাশাপাশি লেখাপড়া করছে ২০ জন গরিব-অসহায় শিক্ষার্থী। এখানকার ৩৫ জন শিশুর সিআরপিতে চাকরি হয়েছে। তারা সেখানে ট্রেনিং নিয়ে বিভিন্ন চাকরি করছে, এটাই আমার গর্ব।’ কালিয়াকৈর উপজেলা সমাজসেবা অফিসার মিজানুর রহমান বলেন, ‘কালিয়াকৈর উপজেলা প্রশাসনের নজরে আসার পর বিদ্যালয়টিকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করা হচ্ছে। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের অধিকার বাস্তবায়নের জন্য স্কুলটিকে সবার নজরে আনা উচিত।’ কালিয়াকৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ এইচ এম ফখরুল হোসাইন বলেন, ‘বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু যাতে নির্বিঘ্নে এখানে ভর্তি হতে পারে এবং তাদের খেলার সামগ্রী, বই যেটা লাগে সেটার ব্যাপারে আমরা সবসময় সোচ্চার আছি ও ভবিষ্যতেও থাকব।’ গাজীপুর জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া বলেন, ‘আমাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে- সমাজের যারা ভালো কাজ করে তাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেওয়া। এ প্রকল্পের অংশ হিসেবে শামসুন্নাহারের মতো ভালো মানুষ এবং তার স্কুল খুঁজে পেয়েছি। তাকে জনগণের সামনে তুলে ধরছি, যাতে মানুষ অনুপ্রাণিত হয় ও ভালো কাজ করে।’