‘মদ আর দুশ্চিন্তা ছাড়া জীবনে আর কিছুই নেই; তিন বছরের কঠোর পরিশ্রমে আমার চুল সাদা হয়ে গেছে।’ চীনের মহাপ্রাচীরের গায়ে খোদাই করা পঙ্ক্তিটি কোনো কবির কল্পনা নয়, বরং শত শত বছর আগে এটি নির্মাণে নিয়োজিত এক শ্রমিকের আর্তনাদ। সম্প্রতি বেইজিংয়ের জিয়ানকৌ অংশে মহাপ্রাচীরের সংস্কার ও প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজে উন্মোচিত হয়েছে এমন সব চাঞ্চল্যকর তথ্য ও নিদর্শন, যা এ স্থাপত্যকে একটি সামরিক স্থাপনা থেকে জীবন্ত ইতিহাসে রূপান্তরিত করেছে।
এক কামানে পূর্ব-পশ্চিমের মেলবন্ধন
এ খননকাজে সবচেয়ে বড় চমক-মিং রাজবংশ আমলের প্রাচীন কামান। আমেরিকান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সাময়িকী পপুলার মেকানিক্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩৫ ইঞ্চি লম্বা এবং ২৪৭ পাউন্ড ওজনের এ কামানে খোদাই করা আছে ‘ছোংঝেন বছর ৫’, যা ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ১৬৩২ খ্রিস্টাব্দ। মজার বিষয় হলো, এ কামানের গঠনশৈলী ইউরোপীয় ‘রেড-কোট’ কামানের সঙ্গে হুবহু মিল রয়েছে।
♦ সৈন্যদের দৈনন্দিন জীবন : প্রত্নতাত্ত্বিকরা তিনটি ওয়াচ টাওয়ার এবং এর আশপাশে তল্লাশি চালিয়ে সৈন্যদের জীবনের তথ্য খুঁজে পেয়েছেন। ১১৮ নম্বর ওয়াচ টাওয়ারে মিলেছে ইট দিয়ে তৈরি উত্তপ্ত বিছানা ও উনুন, যা হাড়কাঁপানো শীতে প্রাচীর পাহারা দেওয়া সৈন্যদের জিপার স্পষ্ট। এ ছাড়া ১১৭ নম্বর টাওয়ারে ১৫৭৩ খ্রিস্টাব্দের স্মৃতিস্তম্ভ বা ফলক পাওয়া গেছে, যা ওই নির্দিষ্ট অংশের সঠিক নির্মাণকাল নিশ্চিত করেছে। গবেষকরা সেখানে প্রচুর পরিমাণে শস্য এবং ঔষধি উদ্ভিদের অবশিষ্টাংশও পেয়েছেন, যা তৎকালীন খাদ্যাভ্যাস ও চিকিৎসাব্যবস্থার ইঙ্গিত দেয়।
নীলকান্তমণি ও প্রাচীন বাণিজ্য পথ
খননকাজে কেবল যুদ্ধের সরঞ্জামই নয়, পাওয়া গেছে ২৮টি মূল্যবান নীলকান্তমণি পাথরের শিল্পকর্ম। এগুলোর উৎস বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এগুলো হুবেই, হেনান ও শানসি প্রদেশের খনি থেকে এসেছিল। এটি প্রমাণ করে যে, মহাপ্রাচীর কেবল বহিঃশত্রু ঠেকানোর দেওয়াল ছিল না, বরং এটি ছিল উত্তর চীনজুড়ে বিস্তৃত এক বিশাল বাণিজ্য পথ।
তৎকালীন প্রকৌশলীরা এ প্রাচীরকে এত শক্তিশালী করতে কী ব্যবহার করেছিলেন তার রহস্যও উন্মোচিত হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, চুন-সুরকির মিশ্রণে উচ্চ-ম্যাগনেসিয়ামযুক্ত চুনের সঙ্গে উদ্ভিজ্জ আঁশ মেশানো হয়েছিল। এ আঠালো মিশ্রণই শত শত বছর ধরে প্রাচীরটিকে অটুট রেখেছে। ভবিষ্যতে আরও খননকাজে হয়তো বেরিয়ে আসবে এমন কোনো তথ্য, যা চীনের মহাপ্রাচীর সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে বদলে দেবে।