বরেণ্য সব্যসাচী শিল্পী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব বাংলাদেশের পাপেট ম্যানখ্যাত মুস্তাফা মনোয়ার আর নেই। বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগে ৯১ বছর বয়সে তিনি মারা গেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। গতকাল সকালে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সকাল সাড়ে ৮টার দিকে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এই বরেণ্য ব্যক্তিত্বের জীবনচিত্র তুলে ধরেছেন- আলাউদ্দীন মাজিদ
তরুণদের প্রতি শিল্পী
তরুণদের নিয়ে আশাবাদী কণ্ঠে মুস্তাফা মনোয়ার বলেছিলেন, ‘আমরা দিনের আলোতে যা কিছু দেখি, তার চেয়েও বেশি দেখতে পাই রাতের অন্ধকারে। আমাদের তরুণদের জীবনে অনেক স্বপ্ন আছে। সেই স্বপ্নই দেশকে বাঁচিয়ে রাখবে, উন্নতির দিকে নিয়ে যাবে।’
যেভাবে মহাপ্রয়াণ
পরিবারের সদস্যরা জানান, বেশ কয়েক বছর ধরেই বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। পরে কিছুটা সুস্থ হলেও, সম্প্রতি নিউমোনিয়াজনিত সংক্রমণের পর তাঁর অবস্থার আবারও অবনতি ঘটে।
বিশাল কর্মযজ্ঞ
বাংলাদেশের ‘পাপেট ম্যান’ নামে পরিচিত মুস্তাফা মনোয়ার দেশের শিল্প-সংস্কৃতির অঙ্গনে এক অনন্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন। এই শিল্পী পাপেট্রি, চিত্রকলা, ভিজ্যুয়াল আর্ট, টেলিভিশন এবং শিশুতোষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে পথিকৃৎ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তাঁর সৃজনশীল কাজ দেশের কয়েক প্রজন্মের শিশুদের জীবনকে সমৃদ্ধ করেছে এবং বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে স্থায়ী প্রভাব রেখেছে। শিল্প ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৪ সালে তিনি দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদক লাভ করেন। এ ছাড়া ২০১৮ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি তাঁকে সুলতান স্বর্ণপদকে ভূষিত করে। শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার মত প্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষের অগ্রগামী পথপ্রদর্শক এই প্রতিভাবান শিল্পী চারুকলার জগতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব রাখতে সক্ষম হয়েছেন। পাপেটশিল্পী, চিত্রশিল্পী, পরিচালক, টিভি অনুষ্ঠানের প্রযোজক এবং চিত্রনাট্যকার হিসেবে বৈচিত্র্যময় দক্ষতার সঙ্গে তিনি সৃজনশীল শিল্পের নানা ক্ষেত্রে নিজেকে একজন অনন্য ও অতুলনীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। মুস্তাফা মনোয়ার কর্মজীবন শুরু করেন পূর্ব পাকিস্তান চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে। পরে তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের উপমহাপরিচালক, শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক, জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক, বাংলাদেশ টেলিভিশন ঢাকার জেনারেল ম্যানেজার ও এফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া জনবিভাগ উন্নয়ন কেন্দ্রের চেয়ারম্যান ও এডুকেশনাল পাপেট ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের প্রকল্প পরিচালকও ছিলেন তিনি। ১৯৬৪ সালে তিনি সদ্য চালু হওয়া পাকিস্তান টেলিভিশনে অনুষ্ঠান প্রযোজনার কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে বিটিভির কার্যক্রম শুরুর পর থেকেই শিশু-কিশোরদের জন্য নির্মিত অনুষ্ঠানের ওপর বিশেষ নজর দেওয়া হয় এবং এসব জনপ্রিয় অনুষ্ঠান প্রযোজনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন মুস্তাফা মনোয়ার। ১৯৭৬ সালে বিটিভির জাতীয় টেলিভিশন প্রতিযোগিতা ‘নতুন কুঁড়ি’ শুরুর পেছনেও তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। মুস্তাফা মনোয়ার পাপেট শিল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য লোককাহিনি সংরক্ষণ ও শিশুদের গল্পগুলো পুনরুজ্জীবিত করার জন্য ব্যাপক প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। তিনিই জনপ্রিয় ও কালজয়ী পাপেট চরিত্র পারুল, বাঘা ও মিনির নেপথ্যের সৃজনশীল শক্তি। এ চরিত্রগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শিশুদের আনন্দ দিয়ে যাচ্ছে। বিটিভির জন্য তিনি ‘রক্তকরবী’ এবং ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’-এর চিত্রনাট্য তৈরি এবং প্রযোজনা করেন। এ নাটকগুলো ব্যাপক সমাদৃত হয়েছে এবং যুক্তরাজ্যের গ্রানাডা টিভির ‘টিভি নাটকের বৈশ্বিক ইতিহাস’ অনুষ্ঠানে অন্তর্ভুক্তির জন্য মনোনীত হয়েছে।
প্রথম পাপেট শো
শৈশব থেকেই মুস্তাফা মনোয়ার বিশ্বাস করতেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর জন্য উপযুক্ত হাতিয়ার হলো শিল্প। এ বিশ্বাস তাঁর কাজেও প্রতিফলিত হতো। ১৯৫২ সালে নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় যোগ দেন রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে। জেলে যান ছবি আঁকার অপরাধে। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের লাল সূর্যের অন্যতম স্থপতি তিনি। জড়িত ছিলেন ‘মীনা’র সঙ্গে। নির্মাণ করেছেন শিশু-কিশোরদের প্রতিভা বিকাশে বাংলাদেশের সবচেয়ে মানসম্পন্ন ও জনপ্রিয় অনুষ্ঠান নতুন কুঁড়ি। বাংলাদেশের বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পালন করেছেন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। মুক্তিযুদ্ধের সময় শরণার্থী শিবিরে মুস্তাফা মনোয়ার হেঁটে যেতে যেতে খেয়াল করলেন শিশুদের ভয়ার্ত মলিন চেহারা। অত্যন্ত ব্যথিত হলেন তিনি। শিশুদের মলিন মুখে হাসি ফোটানোর জন্য সেখানে আয়োজন করলেন জীবনের প্রথম পাপেট শো। সেই থেকে শুরু। পশ্চিম বাংলার শরণার্থী শিবিরগুলোতে আশ্রয় নেওয়া মানুষের মনোবল বাড়ানোর জন্য তিনি তাঁর দক্ষতার পূর্ণ ব্যবহার করেন। আয়োজন করেন পাপেট প্রদর্শনীর। ‘আগাছা’, ‘রাক্ষস’ ও ‘একজন সাহসী কৃষক’সহ তাঁর বিখ্যাত পাপেট শোগুলো দর্শকদের গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল এবং অনেক শক্তিশালী বার্তা দিয়েছিল।
জন্ম ও যাপিত জীবন
১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর যশোরের শ্রীপুরে মুস্তাফা মনোয়ারের জন্ম। তাঁর বাবা কবি গোলাম মোস্তফার পৈতৃক নিবাস ছিল ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা উপজেলার মনোহরপুর গ্রামে। পাঁচ বছর বয়সে মুস্তাফা মনোয়ারের মা জমিলা খাতুন মারা যান। ছয় ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট তিনি। নারায়ণগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করে মুস্তাফা মনোয়ার কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজে বিজ্ঞানে ভর্তি হন। সেখানে তিনি পড়াশোনা না করে কলকাতা চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৫৯ সালে কলকাতা চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয় থেকে ফাইন আর্টসে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন। ১৯৬৫ সালে মেরী মনোয়ারের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। তাদের এক ছেলে সাদাত মনোয়ার ও এক মেয়ে নন্দিনী মনোয়ার।
সম্মাননা
শিল্পকলায় অবদানের জন্য ২০০৪ সালে একুশে পদক পাওয়া এ শিল্পী বর্ণিল কর্মজীবনে আরও অনেক পুরস্কার পেয়েছেন। ১৯৯০ সালে টিভি নাটকের জন্য টেনাশিনাস পদক, ১৯৯২ সালে চারুশিল্পে বিশেষ অবদানের জন্য বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদ পুরস্কার, ১৯৯৯ সালে শিশু শিল্পকলা কেন্দ্র কিডস কালচারাল ইনস্টিটিউট, চট্টগ্রাম কর্তৃক কিডস সম্মাননা পদক, ২০০২ সালে চিত্রশিল্প, নাট্য নির্দেশক এবং পাপেট নির্মাণে অবদানের জন্য শিশুকেন্দ্র থেকে বিশেষ সম্মাননা লাভসহ বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি।
বাংলা একাডেমির শোক
বরেণ্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও বাংলা একাডেমির সম্মানিত ফেলো চিত্রশিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের প্রয়াণে গভীর শোক প্রকাশ করেছে বাংলা একাডেমি। গতকাল একাডেমির মহাপরিচালক মোহাম্মদ আজম এক শোকবার্তায় এ সমবেদনা জ্ঞাপন করেন। শোকবার্তায় প্রয়াতের আত্মার শান্তি কামনা করা হয় এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানানো হয়। শোকবার্তায় বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক বলেন, মুস্তাফা মনোয়ার চিত্রকলায় যেমন নিজস্বতার স্বাক্ষর রেখেছেন, তেমনি পাপেট শিল্পের মাধ্যমে কয়েক প্রজন্মের শিশু-কিশোরদের মাঝে শিক্ষামূলক বিনোদনের আলো ছড়িয়েছেন।