Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শনিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : সোমবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:১১
ঈদ মোবারক
ঈদ মোবারক

একেক দেশে একেকভাবে পালিত হয় কোরবানির ঈদ। তবে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে এ ধারা একই রকম পরিলক্ষিত হয়।

ঈদের নামাজের পরপরই মুসলমানরা তাদের পশু নিয়ে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে যান। হোক সেটা রাস্তা অথবা কোনো খেলার মাঠ। ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও মালদ্বীপে একই চিত্র লক্ষ্য করা যায়। অনেকটা বাংলাদেশের আদলে উদযাপিত হয় ঈদুল আজহা। এ ছাড়া ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও পালিত হয় ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ। সেখানকার মুসলমানরা কোরবানি দেন গরু কিংবা ভেড়া। তবে সেটা আমাদের দেশের মতো রাস্তা বা মাঠে প্রকাশ্যে নয়। নির্ধারিত একটি জায়গায় একত্রিত হয়ে কোরবানি দেন তারা। যুক্তরাজ্যের মুসলমানরাও এই ঈদ পালন করে থাকেন। তবে সেখানকার ঈদ বাংলাদেশ বা উপমহাদেশের অন্যান্য দেশের মতো তেমন আড়ম্বরপূর্ণ হয় নয়। অনেকটাই আনুষ্ঠানিকতা পালন মাত্র।

 

কুরব থেকে কোরবানি

কোরবানি মানে উৎসর্গ। এ উৎসর্গের মূল্যায়ন আর্থিক ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় না, বরং হয় একমাত্র আল্লাহভীরুতার ওপর। কোরবানি কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই হতে হবে। কোরবানি শব্দটি এসেছে ‘কুরব’ থেকে, যার অর্থ নৈকট্য, সান্নিধ্য ও নিকটবর্তী হওয়া। কোরবানির মাধ্যমে কোনো কিছু আল্লাহর নামে উৎসর্গ করে তার নিকটবর্তী হওয়া। কোরবানি করার জন্য নির্দেশ রয়েছে সূরা কাওসারে।

আমাদের দেশে কোরবানির ঈদের পরিচিতি ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ নামে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এর আরও অনেক নাম আছে। মরক্কো, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, মিসর এবং লিবিয়ায় কোরবানির ঈদকে বলা হয় ঈদুল কিবির। আফ্রিকার অনেক এলাকায় এটির পরিচয় তাবাসকি বা তোবাসকি নামে। নাইজেরিয়া এবং পূর্ব আফ্রিকায় পরিচিত বাব্বার সালাহ নামে। সোমালিয়া, কেনিয়া এবং ইথিওপিয়ায় বলা হয় সিডওয়েনি। ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং পাকিস্তানে ঈদুল আজহাকে বলা হয় বকরি ঈদ। এসব দেশে বেশির ভাগই ছাগল কোরবানি করা হয়।

একমাত্র ইন্দোনেশিয়াতেই বলা হয় ঈদুল আজহা। তুরস্কে বলা হয় কোরবান বেরামি বা ত্যাগের উৎসব। অন্যদিকে বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভিনা, আলবেনিয়া এবং বুলগেরিয়ায় বলা হয় কোরবান বাজরাম। কাজাখস্তানে বলা হয় কোরবান এইত। কুর্দিশরা বলে সেজনা কোরবানে। আফগানিস্তানে আছে কয়েকটি নাম। দারি ভাষার লোকেরা বলে ঈদ-ই-কোরবান। পোশতু ভাষার লোকেরা বলে লয় আখতার বা কোরবানি আখতার। আফ্রিকারই আরেকটি দেশ দক্ষিণ আফ্রিকায় একে বলা হয় ‘বকরি ঈদ’। অনেকটা ভারত আর পাকিস্তানের মতোই। ইন্দোনেশিয়ায় এর নাম ‘ঈদুল আদহা’ হলেও মালয়েশিয়ায় বলা হয় ‘আইদিল আদহা’। আবার মালয়েশিয়ায় একে ‘হারি রায়া কোরবান’ নামেও ডাকা হয়ে থাকে। এর অর্থ হচ্ছে ত্যাগ স্বীকারের উৎসব।   এদিকে কুর্দিরা বলে ‘সেজনা কুরবান’। আর আফগানিস্তানের লোকেরা বলে ‘ঈদ-ই- কোরবান’। কোরবানির ঈদ একেক দেশে একেকভাবে পালিত হয়। তবে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে এ ধারা একই রকম। ঈদের নামাজের পরপরই মুসলমানরা তাদের পশু নিয়ে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে যান। হোক সেটা রাস্তা অথবা কোনো খেলার মাঠ। ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও মালদ্বীপে এই চিত্র লক্ষ্য করা যায়। অনেকটা বাংলাদেশের আদলে উদযাপিত হয় ঈদুল আজহা।

 

ছুটি ছাড়াই অস্ট্রেলিয়ার ঈদ

ঈদুল আজহার দিন অস্ট্রেলিয়ায় সরকারি ছুটি থাকে না। তবে ইসলামিক স্কুল, সামাজিক ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো এ দিনটিতে বন্ধ থাকে। অস্ট্রেলিয়ার মুসলিম সম্প্রদায়ের বসবাস প্রধানত সাবারবান শহরকে কেন্দ্র করে। এখানে আলাদা কোরবানির পশু কিনে লালন-পালন করার সুযোগ না থাকায় কয়েকটি পরিবার মিলে একজনকে পশু কেনার এবং যত্ন করার দায়িত্ব দেওয়া হয়।

ঈদের দিন সকালে মুসলমানরা মসজিদে নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষে বাড়ি ফিরে তারা কোরবানি করেন। মুসলমানরা কোরবানির গোশত এবং চামড়ার টাকা গরিবদের দান করেন। মুসলমান ছাড়াও অন্য ধর্মাবলম্বীদেরও কোরবানির গোশত উপহার হিসেবে দান করা হয়। অস্ট্রেলিয়ার মুসলমানরা এ দিন ‘বাকলাঙা’ এবং ‘লোকুম’ নামের দুটি তার্কিশ ডিম রান্না করে।

এখানে কোরবানির অর্ডার নেওয়া হয়

যুক্তরাজ্যে মুসলমান আছেন প্রায় ৩০ লাখ। যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫ ভাগ। অধিকাংশ মুসলমানই ইংল্যান্ড ও ওয়ালেসে বসবাস করেন। যুক্তরাজ্যের মুসলমানরা ততটা ধর্মভীরু নন। যারা কেবল মসজিদ ও তাবলিগ জামাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত তারাই দৃঢ়ভাবে ইসলাম পালন করে থাকেন। দুই ঈদে মুসলমানরা ট্রাফালগার স্কয়ারে মিলিত হন এবং ঈদ উদযাপন করেন। তবে সেখানকার ঈদ বাংলাদেশ বা উপমহাদেশের অন্যান্য দেশের মতো তেমন আড়ম্বরপূর্ণ হয় না। যুক্তরাজ্যে প্রকাশ্য পশু জবাই করা নিষিদ্ধ হলেও নির্ধারিত এলাকায় সরকার নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান থেকে কোরবানি দেওয়া যায়। স্থানীয়ভাবে অনেক এশিয়ান বা বাংলাদেশি গ্রোসারি ঈদের সময় কোরবানির জন্য আগ্রহীদের নাম সংগ্রহ করে থাকে। ঈদের প্রায় এক মাস আগে থেকে দোকানে দোকানে সাইনবোর্ড ঝোলানো থাকে : ‘এখানে কোরবানির অর্ডার নেওয়া হচ্ছে’। এর অর্থ হচ্ছে এখানে নাম লিখিয়ে প্রতি নামের বিপরীতে অর্থ দিয়ে যেতে হবে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কোরবানির পর গরু বা ভেড়ার গোশত ঈদের পরের দিন প্রাহকদের কাছে সরবরাহ করে তারা।

যুক্তরাষ্ট্রে কোরবানি

বর্তমানে নিউইয়র্কে প্রায় ৮০ হাজার বাংলাদেশি বসবাস করেন; যাদের বেশিরভাগই মুসলিম। ত্যাগের মহিমায় উজ্জীবিত হয়ে ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপন করে থাকেন তারা। সবচেয়ে বৃহত্তম ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয় সেখানকার অন্যতম বাংলাদেশিপ্রধান এলাকা জ্যামাইকায়।

শহরের ম্যানহাটন, জ্যাকসন হাইটস, উডসাইড ও ব্রুকলিন এলাকায় বাংলাদেশিদের পরিচালিত জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টার (জেএমসি) হাইস্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত হয় এ জামাতটি। প্রতি বছরই এতে প্রায় ১৫ হাজার নারী-পুরুষ অংশ নেন। এ ছাড়াও মুসল্লিদের উপচেপড়া ভিড়ে কোনো কোনো মসজিদে পাঁচটি ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। অন্যান্য দেশ, বিশেষত পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়ার মুসলমানরা যেসব মসজিদ পরিচালনা করেন সেসব মসজিদেও একাধিক ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয়।

ইন্দোনেশিয়া

আয়তনের দিক দিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মুসলিম দেশ। মেয়েদের  কাপড়চোপড় চলাফেরা ইউরোপিয়ানদের মতো হলেও এখানকার বেশির ভাগ মানুষই নামাজ পড়ে। এরা ধর্মভীরু কিন্তু এদের মধ্যে কোনো রকম ধর্মীয় গোঁড়ামি কাজ করে না। রোজার ঈদ খুব আনন্দের সঙ্গে পালন করলেও কোরবানিটা এরা কোনোরকম করে কাটিয়ে দেয়। ইন্দোনেশিয়ায় সাধারণত যারা হজ করেছে কেবল তারাই কোরবানি দেয় এবং শুধু তাদের ওপরই নাকি কোরবানি ফরজ।

গরু বা ছাগল কিনে হাজীরা এলাকার মসজিদে দিয়ে দেয়। এ রকম করে দেখা যায় একটা মসজিদে ১/২টা গরু এবং ৮/১০টা ছাগল জমা হয়। প্রত্যেক এলাকায় একটা করে মসজিদ থাকে। মসজিদের যে ইমাম তার কাছে হিসাব থাকে ওই এলাকায় কতগুলো ঘর আছে। পুরো মাংসকে যতগুলো ঘর ঠিক ততগুলো ভাগে ভাগ করা হয় সমানভাবে। এরপর সবার বাসায় ছোট ছোট প্যাকেটে করে দিয়ে আসা হয়। যাদের অবস্থা ভালো তারা ফিরিয়ে দিয়ে বলে আমি মাংস কিনতে পারি, আমারটা গরিব কাউকে দিয়ে দাও। এর বাইরেও কেউ কেউ কোরবানি দিলে সেটাতেও কোনো মানা নেই।

চীনে অন্যরকম ঈদ

চীনের জনসংখ্যার শতকরা ১২ জন মুসলমান। এ হিসাবে ১৩৬ কোটি মানুষের চীনে আছেন সাড়ে ১৬ কোটি মুসলমান। হুই, উইঘুর, কাজাক, উজবেক, তাজিক তাতার, খালখাস, সালার, ডংঝিয়াং ও বাওয়ান ইত্যাদি সংখ্যালঘু গোষ্ঠীতে বিভক্ত তারা বিভিন্ন এলাকায় বসবাস করছেন। হুই, উইঘুর, কাজাক ও সালার জনগোষ্ঠী চান্দ্র বছরের পঞ্জিকা দেখে ঈদ উদযাপন করেন। নিংঝিয়া প্রদেশের হুই মুসলমানরা ঈদুল ফিতরকে বড় ঈদ মনে করে থাকেন এবং গানসু ও চিংহাইয়ের হুই মুসলিমরা এটিকে মনে করেন বছরের শুরু। আবার ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহাকে বিভিন্ন প্রদেশে বিভিন্ন নামে আখ্যায়িত করা হয়। চীনের মুসলমানরা যেখানেই কাজ করুন না কেন দুটি ঈদেই তারা বাড়িতে আসেন এবং সবাই একত্রে মিলে ঈদ উদযাপন করেন। ঈদুল আজহার মতো ঈদুল ফিতরও তারা তিন দিনব্যাপী উদযাপন করেন। নারী-পুরুষ সবাই নতুন জামা-কাপড় পরিধান করেন। রঙিন কাগজ, বাণীসংবলিত ব্যানার ও পোস্টার ব্যবহার করে মসজিদ সাজানো হয়। কোথাও কোথাও আলোকসজ্জাও করা হয়। ঈদের নামাজের আগে মসজিদে সাইরেন বা ঘণ্টা বাজানো হয়। ঈদুল আজহায় তারা সাধারণত কয়েকজন মিলে একটি পশু কোরবানি করেন।

ত্যাগের মহিমা ফিনল্যান্ডে

ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে ফিনল্যান্ডজুড়ে মুসলমানরা উদযাপন করেন বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহা। নতুন পোশাক পরে কনকনে শীতের মাঝেও ফিনল্যান্ডে প্রবাসী বাংলাদেশিরা সমবেত হন ঈদের জামাতে। রাজধানী হেলসিঙ্কিতে অনুষ্ঠিত হয় ঈদের জামাত। সালাতুল ঈদ শেষে দেশ, জাতি ও মুসলিম উম্মাহর শান্তি এবং সমৃদ্ধি কামনায় করা হয় দীর্ঘ মোনাজাত। বরাবরের মতো এবারও বাঙালিদের ঈদ উৎসবে সেখানে দেশি-বিদেশি রকমারি খাবার, বাংলাদেশিদের মতো একে অপরের বাড়িতে দাওয়াত খাওয়া, মাতৃভূমি বাংলাদেশে টেলিফোন করে পরিবারের ও আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় এবং খোঁজখবর নেওয়াসহ নানা আয়োজনে মশগুল থাকবেন তারা।

জার্মানি

৬০ ও ৭০ দশকের পর থেকে জার্মানিতে ইসলাম ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। ২০১০ সালের হিসাব অনুযায়ী জার্মানিতে মুসলমান আছেন ৪৩ লাখ (মোট জনসংখ্যার ৫.৪ ভাগ) এবং তাদের মধ্যে জার্মান নাগরিক হলেন ১৯ লাখ (মোট জনসংখ্যার ২.৪ ভাগ)। জার্মানির মুসলমানদের শতকরা ৬৩ ভাগ তুর্কি বংশোদ্ভূত। জার্মান মুসলমানদের জন্য দুঃখজনক ব্যাপার হলো তারা দুই ঈদসহ কোনো ধর্মীয় উৎসবেই সরকারি ছুটি পান না। যেসব মুসলমান সরকারি চাকরিজীবী তাদের খ্রিস্টান সহকর্মীদের ধর্মীয় উৎসবে ছুটি দেওয়া হলেও মুসলমানরা তা পান না। ওখানে কেবল খ্রিস্টানদেরই ধর্মীয় উৎসবে জাতীয় ছুটির দিন ঘোষণা করা হয়। জার্মানিস সেন্টার কাউন্সিল অব মুসলিমের সভাপতি আইমান মাজইয়াক বিভিন্ন গণমাধ্যমে সরকারের কাছে মুসলমানদের ধর্মীয় উৎসবেও ছুটি ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন।

জার্মানিতে তাই মুসলমানদের ঈদে ততটা সমারোহ হয় না। অধিকাংশ মুসলমান বার্লিনে বা শহরাঞ্চলে থাকেন বলে ওখানেই ঈদের নামাজ আদায় করেন।

 

দক্ষিণ আফ্রিকা

বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপন করেন দক্ষিণ আফ্রিকার ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা। প্রতি বছরই দেশটির রাজধানীতে ঈদের জামাতগুলোতে চোখে পড়ে লাখো মুসল্লির ঢল। নামাজ শেষে তারা নির্দিষ্ট স্থানে পশু কোরবানি করেন। ধনী-গরিব, মালিক-শ্রমিক ভেদাভেদ ভুলে সবাই মশগুল হন একে অপরকে দাওয়াত দিতে ও দাওয়াত নিতে। দিন শেষে বাঙালিসহ অধিকাংশ প্রবাসীই দেশে পরিবার ও স্বজনদের সঙ্গে ঈদের কুশল এবং শুভেচ্ছা বিনিময় করেন ফোন, ফেসবুক ও টুইটারসহ সামাজিক বিভিন্ন সাইটের মাধ্যমে।

সুইডেন

পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে সুইডেনে বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় মসজিদের উদ্যোগে ওসা জিমনেশিয়ামে বৃহত্তম ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। জামাতে প্রবাসী অনেক বাঙালি অংশগ্রহণ করেন। বাংলাদেশের রেওয়াজ অনুযায়ী সেখানেও নামাজের আগে কোরবানির তাত্পর্যের ওপর সংক্ষিপ্ত আলোচনা হয়। নামাজ শেষে বাংলাদেশ ও মুসলিম উম্মাহর সুখ-সমৃদ্ধি কামনায় করা হয় বিশেষ মোনাজাত।

এর বাইরেও বিভিন্ন দেশে নানা আয়োজনে ঈদুল আজহা পালিত হয়। মালয়েশিয়ায় কোরবানিতে ভেড়াই প্রধান পশু। তবে গরু, ছাগলেরও বিপুল উপস্থিতি দেখা যায়। মালয়েশিয়ানরা সাধারণত সমাজবদ্ধভাবে কোরবানি করতে পছন্দ করেন। স্থানীয় মসজিদে সেখানকার সব পশু একসঙ্গে করে সব গোশত একসঙ্গেই বণ্টন করা হয়। মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার ঐতিহ্যে বেশ সামঞ্জস্য রয়েছে।

ইউরোপ, আমেরিকার দেশগুলোতে স্বীকৃত কসাইখানায় কোরবানি দিতে হয়। এসব দেশে মুসলমানদের মধ্যে মসজিদভিত্তিক কর্মসূচির প্রতি বিশেষ আগ্রহ দেখা যায়। সাধারণত মসজিদের মাধ্যমেই কোরবানি এবং গোশত বিতরণের কাজ সম্পন্ন হয়।

আরব দেশগুলোতে দুম্বা, উট ও ভেড়া কোরবানি দিতে দেখা যায় বেশি। হজের কারণে সৌদি আরবে বিপুলসংখ্যক পশু কোরবানি দেওয়া হয়। তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান, কিরগিজস্তানের মতো মধ্য এশিয়ার দেশগুলোতে প্রধানত ভেড়া কোরবানি দেওয়া হয়। কিরগিজস্তানে কোরবানির ঈদকে ‘কোরবান বৈরাম’ও বলা হয়।

তবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মুসলমান জনগোষ্ঠী যেভাবেই ঈদুল আজহাকে উদযাপন করুক না কেন, যে রীতিতেই কোরবানি দেওয়া হোক না কেন, তাদের একটাই উদ্দেশ্য আর তা হলো মহান আল্লাহর প্রতি যথার্থ আনুগত্য প্রদর্শন। আল্লাহর সন্তুষ্টি ও মানবকল্যাণে সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ করার জন্য এই ধর্মীয় আদেশ পালন। এ ধর্মীয় উৎসব আত্মবিশ্লেষণ ও আত্মশুদ্ধিসহ পশুত্ব কোরবানির উৎসব। ঈদুল আজহা চিত্তবৈভব প্রদর্শনের উৎসব নয়। ঈদুল আজহা ত্যাগের, আত্মসমর্পণের এবং আত্মোপলব্ধির মহান স্মারক।

 

নানা দেশে নানা নাম

 

আমাদের দেশে পবিত্র কোরবানির ঈদের পরিচিতি ‘ঈদুল আজহা’ বা কোরবানির ঈদ নামে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এর আরও অনেক নাম আছে।

মরক্কো, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, মিসর এবং লিবিয়ায় কোরবানির ঈদকে বলা হয় ‘ঈদুল কিবির’।

আফ্রিকার অনেক এলাকায় এটির পরিচয় ‘তাবাসকি’ বা ‘তোবাসকি’ নামে। নাইজেরিয়া এবং পূর্ব আফ্রিকায় পরিচিত ‘বাব্বার সালাহ’ নামে। সোমালিয়া, কেনিয়া এবং ইথিওপিয়ায় বলা হয় ‘সিডওয়েনি’। ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং পাকিস্তানে ঈদুল আজহাকে বলা হয় ‘বকরি ঈদ’। এসব দেশে বেশিরভাগই ছাগল কোরবানি করা হয়। আমাদের দেশে পবিত্র কোরবানির ঈদের পরিচিতি ‘ঈদুল আজহা’ বা কোরবানির ঈদ নামে।

 

 

কোরবানির পশু নির্বাচন

কোরবানির পশু নির্বাচনের কিছু রীতি ও নিয়ম আছে। প্রচলিত নীতি এবং আলেম ওলামাদের মতে সেই নিয়মের হরেফের হলে কোরবানি কবুল হয় না। চলুন চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক কোরবানির পশু নির্বাচনের কিছু দিক। গরু, ছাগল, উট ও দুম্বা এই কয় প্রকার গৃহপালিত পশু দ্বারা কোরবানি করা জায়েজ। এগুলো ব্যতীত অন্য পশু যত মূল্যবানই হোক, তা দিয়ে কোরবানি জায়েজ হবে না। ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা কমপক্ষে পূর্ণ এক বছর বয়সের হতে হবে। অপ্রাপ্ত বয়স্ক প্রাণী দিয়ে কোরবানি হবে না। বয়স যদি কিছু কমও হয় কিন্তু এমন মোটাতাজা যে, এক বছর বয়সীদের মধ্যে ছেড়ে দিলেও তাদের চেয়ে ছোট মনে হয় না, তাহলে তার দ্বারা কোরবানি জায়েজ আছে। বকরি কোনো অবস্থায় এক বছরের কম হলে চলবে না। গরু ও মহিষের বয়স কমপক্ষে দুই বছর হতে হবে। উটের বয়স কমপক্ষে পাঁচ বছর হতে হবে। কোরবানির পশু ভালো এবং হৃষ্টপুষ্ট হওয়াই উত্তম। যে প্রাণী লেংড়া অর্থাৎ যা তিন পায়ে চলতে পারে— এক পা মাটিতে রাখতে পারে না বা রাখতে পারলেও ভর করতে পারে না এমন পশু দ্বারা কোরবানি হবে না। যে পশুর একটিও দাঁত নেই তার দ্বারা কোরবানি হবে না। যে পশুর কান জন্ম থেকে নেই সে পশু দ্বারা কোরবানি জায়েজ নয়। যে পশুর শিং মূল থেকে ভেঙে যায় তা দ্বারা কোরবানি বৈধ নয়। তবে শিং উঠেইনি বা কিছু পরিমাণ ভেঙে গেছে এমন পশু দ্বারা কোরবানি জায়েজ আছে। যে পশুর উভয় চোখ অন্ধ বা একটি চোখের দৃষ্টিশক্তি এক-তৃতীয়াংশ বা তার বেশি নষ্ট তা দ্বারা কোরবানি জায়েজ নেই। যে পশুর একটি কান বা লেজের এক-তৃতীয়াংশ কিংবা তারচেয়ে বেশি কেটে গেছে তা দ্বারা কোরবানি সঙ্গত নয়। অতিশয় কৃশকায় ও দুর্বল পশু দ্বারা কোরবানি বৈধ নয়। ভালো পশু ক্রয় করার পর এমন দোষ-ত্রুটি দেখা দিয়েছে যার কারণে কোরবানি দুরস্ত হয় না— এরূপ হলে সেটিই কোরবানি দেওয়া দুরস্ত হবে। গর্ভবতী পশু কোরবানি করা জায়েজ। যদি পেটের বাচ্চা জীবিত পাওয়া যায় তাহলে সে বাচ্চাও জবাই করে দিতে হবে। তবে প্রসবের নিকটবর্তী হলে সেরূপ পশু কোরবানি দেওয়া মাকরুহ। বন্ধ্যা পশু কোরবানি করা জায়েজ আছে।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow