হাড় কাঁপানো শীত, ঘন কুয়াশা আর নিস্তব্ধ রাত। চারদিক যখন ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন মানবিকতার আলো জ্বালাতে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন বসুন্ধরা শুভসংঘের তরুণ স্বেচ্ছাসেবকরা।
বৃহস্পতিবার দ্বীপজেলা ভোলায় গভীর রাতে শীতার্ত, অসহায় ও ছিন্নমূল মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে বসুন্ধরা শুভসংঘ। শীতবস্ত্র বিতরণ কার্যক্রমে কোনো মাইকিং বা আনুষ্ঠানিকতা ছিল না, ছিল না ভিড়, ছিল শুধু নিঃশব্দ ভালোবাসা।
শীতের তীব্রতায় যখন নদীঘেরা এই দ্বীপাঞ্চলের মানুষজন নিদারুণ কষ্টে দিন কাটাচ্ছে, তখন তাদের কষ্ট লাঘবে মানবিক উদ্যোগ নেয় বসুন্ধরা শুভসংঘ। গভীর রাতেও থেমে থাকেনি বসুন্ধরা শুভসংঘের কার্যক্রম। শহরের ফুটপাত, বাসস্ট্যান্ড, লঞ্চঘাট, খোলা আকাশের নিচে ঘুমিয়ে থাকা দিনমজুর, বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী ও পথশিশুদের খুঁজে খুঁজে শীতবস্ত্র পৌঁছে দেওয়া হয়।
এ সময় বসুন্ধরা শুভসংঘ ভোলা জেলা শাখার সভাপতি মো. শাফায়াত হোসেন সিয়াম এর নেতৃত্বে বসুন্ধরা শুভসংঘ ভোলা জেলা শাখার সহ-সভাপতি মীর আবিদ হোসেন রাফি, সাংগঠনিক সম্পাদক আশিকুর রহমান সহ বসুন্ধরা শুভসংঘের স্বেচ্ছাসেবকরা অংশগ্রহণ করেন।
বসুন্ধরা শুভসংঘ ভোলা জেলা শাখার সভাপতি মো. শাফায়াত হোসেন সিয়াম বলেন, 'সমাজের অবহেলিত ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোই আমাদের মূল লক্ষ্য। শীত, বন্যা, অগ্নিকাণ্ড বা যেকোনো দুর্যোগে মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার এই ধারা অব্যাহত থাকবে।
তিনি আরও বলেন, ‘মানুষের মুখে একটু হাসি ফোটাতে পারলেই আমাদের শ্রম সার্থক। শীতার্ত মানুষের কষ্ট লাঘব করাই ছিল আমাদের মূল উদ্দেশ্য। আমরা চাইনি কেউ লাইনে দাঁড়াক, তাই গভীর রাতে নিজেরাই শীতবস্ত্র মানুষের কাছে গিয়েছি, যেন তাদের আত্মসম্মান অক্ষুণ্ন থাকে।’
বসুন্ধরা শুভসংঘ ভোলা জেলা শাখার সহ-সভাপতি মীর আবিদ হোসেন রাফি বলেন, ‘এটি শুধু একটি কর্মসূচি নয়, এটি মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধের বহিঃপ্রকাশ। শীতের রাতে একটি কম্বল অনেকের কাছে বিলাসিতা নয়, বরং বেঁচে থাকার প্রয়োজন। সেই প্রয়োজনটুকু পূরণ করতেই বসুন্ধরা শুভসংঘের এই প্রয়াস।’
বসুন্ধরা শুভসংঘের পক্ষ থেকে শীতবস্ত্র (কম্বল) পেয়ে অনেকেই আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। ফুটপাতে থাকা এক বৃদ্ধা বলেন ‘সারাদিন কাজ করে যা পাই, তা দিয়ে খাবারই জোটে না। কম্বল কেনার কথা ভাবতেই পারি না।’
ফুটপাতে থাকা এক বৃদ্ধ বলেন, ‘এই বয়সে আর কারো কাছে কিছু চাইতে লজ্জা লাগে। কেউ খোঁজ নেয় না। আজ রাতে আমনেরা আইসা যখন কম্বল দিলেন, তখন মনে হইল আমরাও মানুষ।’
বসুন্ধরা শুভসংঘের স্বেচ্ছাসেবকরা জানান, ‘শীতবস্ত্র বিতরণকালে দেখা যায়, অনেক মানুষ শীতের কারণে ঠিকভাবে ঘুমাতেই পারছেন না। কারও গায়ে পাতলা কাপড়, কারও শরীরে নেই কোনো শীতবস্ত্র। কম্বল পেয়ে অনেকেই আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন। কারও চোখে আনন্দাশ্রু, কারও কণ্ঠে কৃতজ্ঞতার শব্দ।’
তারা আরও জানান, তারা কাউকে ডেকে নয়, বরং নিজেরাই মানুষের কাছে গিয়ে নিঃশব্দে কম্বল তুলে দিয়েছেন। যাতে ঘুমন্ত মানুষের ঘুম নষ্ট না হয়, আবার শীতের কষ্টও কিছুটা লাঘব হয়।
নদীঘেরা দ্বীপে শীতের কষ্ট আরও ভয়াবহ ভোলা জেলার চরাঞ্চল ও নদীঘেরা এলাকাগুলোতে শীতের প্রকোপ তুলনামূলক বেশি। খোলা হাওয়ার কারণে রাতে তাপমাত্রা দ্রুত নেমে যায়। এসব এলাকায় দরিদ্র মানুষের পক্ষে শীতবস্ত্র কেনা প্রায় অসম্ভব। সেই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই বসুন্ধরা শুভসংঘ ভোলা জেলায় এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।
স্থানীয়রা বলেন, ‘এ ধরনের মানবিক কার্যক্রম সমাজে ইতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে দেয়। বসুন্ধরা শুভসংঘের মানবিক উদ্যোগগুলো প্রমাণ করে-মানবিকতা এখনো বেঁচে আছে, আর যতদিন থাকবে এমন উদ্যোগ, ততদিন শীতও মানুষকে হারাতে পারবে না।’
স্থানীয়রা আরও বলেন, ‘বসুন্ধরা শুভসংঘের এমন কাজ শুধু সাহায্য নয়, এটি আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। বসুন্ধরা শুভসংঘের এই তরুণ স্বেচ্ছাসেবকদের দেখে আমাদেরও কিছু করার অনুপ্রেরণা মিলছে।’
শীতের এই কঠিন সময়ে বসুন্ধরা শুভসংঘের এমন মানবিক উদ্যোগ নিঃসন্দেহে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
বিডি-প্রতিদিন/তানিয়া